উপকূলে ন্যানোপ্রযুক্তির সফল প্রয়োগে জেগে উঠছে অনাবাদি জমি

সময়ের চিত্র ডেস্ক :

নোয়াখালীর উপকূলীয় জনপদের বিস্তীর্ণ মাঠে বছরের পর বছর লবণের সাদা আস্তরণ জমে থাকে। বর্ষায় পানি, শুষ্ক মৌসুমে লবণাক্ততা—এই দ্বৈত চাপে বহু জমি হয়ে পড়ে স্বল্পফলনশীল কিংবা অনাবাদি। কৃষকের পরিশ্রম থাকে, কিন্তু মাটির সাড়া মেলে না। এমন বাস্তবতায় লবণাক্ত জমিতে সয়াবিন উৎপাদনে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে দেশীয় উদ্ভাবিত সেলেনিয়াম, সিলিকন ও জিংকসমৃদ্ধ ন্যানোপার্টিকেল প্রযুক্তি।

 

সম্প্রতি নোয়াখালী সদর উপজেলার দক্ষিণ শুল্লকিয়া গ্রামের একটি সয়াবিন ক্ষেত পরিদর্শনকালে আয়োজিত কৃষক অবহিতকরণ সভায় এই গবেষণার অগ্রগতি তুলে ধরেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ও প্রকল্পের প্রিন্সিপাল ইনভেস্টিগেটর ড. মীর্জা হাছানুজ্জামান। তিনি জানান, ক্ষুদ্র ন্যানোপার্টিকেল পানিতে মিশিয়ে সয়াবিন গাছে স্প্রে করলে লবণাক্ততার নেতিবাচক প্রভাব অনেকাংশে কমানো সম্ভব। সাধারণত অতিরিক্ত লবণাক্ত মাটিতে গাছের শিকড় পর্যাপ্ত পানি ও পুষ্টি গ্রহণে ব্যর্থ হয়, ফলে বৃদ্ধি ব্যাহত হয় এবং ফলন কমে যায়। কিন্তু ন্যানো উপাদানসমৃদ্ধ এই স্প্রে উদ্ভিদের শারীরবৃত্তীয় কার্যক্রম সক্রিয় করে, কোষের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সক্ষমতা বাড়ায় এবং পুষ্টি গ্রহণের দক্ষতা উন্নত করে। এর ফলস্বরূপ গাছ সবলভাবে বেড়ে ওঠে এবং পরীক্ষামূলক প্লটে স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় তিনগুণ পর্যন্ত ফলন বৃদ্ধির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

 

দুই বছরব্যাপী এ গবেষণা প্রথমে গবেষণাগারে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে পরিচালিত হয়। সেখানে ইতিবাচক ফলাফল পাওয়ার পর তা মাঠপর্যায়ে প্রয়োগ করা হয় নোয়াখালীর লবণাক্ত জমিতে। নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, মাটির বিশ্লেষণ এবং ফলনের তুলনামূলক তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যায় যে প্রযুক্তিটি কেবল পরীক্ষাগারেই নয়, বাস্তব কৃষিজমিতেও কার্যকর। গবেষণা কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন প্রকল্পের কো-ইনভেস্টিগেটর ও সহকারী অধ্যাপক ড. মো. মাহবুব আলম, এগ্রিকালচার বোটানি বিভাগের অধ্যাপক ড. কামরুন্নাহার এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আমীর ফয়সালসহ একাধিক গবেষক ও ফেলো।

 

মাঠপর্যায়ে কৃষকদের অভিজ্ঞতাও আশাব্যঞ্জক। যেসব জমিতে আগে চারা দুর্বল হয়ে পড়ত, সেসব জমিতে এবার গাছের বৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে ভালো হয়েছে এবং শুঁটির সংখ্যা বেড়েছে। কৃষকদের মতে, ফলনের এই পরিবর্তন তাদের মধ্যে নতুন করে চাষাবাদের আগ্রহ তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সয়াবিন একটি উচ্চ পুষ্টিমানসম্পন্ন ডালশস্য হওয়ায় এর উৎপাদন বৃদ্ধি পেলে দেশের ভোজ্যতেল ও প্রোটিনের চাহিদা পূরণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

 

গবেষণাটিতে অর্থায়ন করেছে সাউথইস্ট ব্যাংক পিএলসি এবং বাস্তবায়ন করেছে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিতত্ত্ব বিভাগ। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন প্রযুক্তিটির কার্যকর সম্প্রসারণ। এ ক্ষেত্রে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে এটি কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া গেলে উপকূলীয় অঞ্চলের অনাবাদি জমি উৎপাদনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।

 

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধির যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা ভবিষ্যৎ কৃষির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। সেই প্রেক্ষাপটে ন্যানোপ্রযুক্তিনির্ভর এই উদ্ভাবন কেবল একটি গবেষণা সাফল্য নয়; এটি উপকূলীয় কৃষিকে টেকসই করার সম্ভাবনাময় এক দিগন্ত। সঠিক নীতিগত সহায়তা ও সম্প্রসারণ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে লবণে ক্ষতবিক্ষত মাটিতেও ফলবে সোনালি সম্ভাবনার ফসল।

এই বিভাগের আরো খবর