জন্মদিন আসে বারেবারে—
মনে করাবারে
এ জীবন নিত্যই নূতন
প্রতি প্রাতে আলোকিত
পুলকিত
দিনের মতন।’
(‘স্ফূলিঙ্গ’, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ১৩৫২ সালের ২৫ বৈশাখ প্রথম প্রকাশিত)
মিজানুর হক খান:
আজ হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী বাঙ্গালী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অগ্রজ কন্যা বাংলাদেশের সফলতম প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি মানবতার কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার জন্মদিন। ২০২৪ ও ২০২৫ সালের অস্থির সময় কাটিয়ে, এই বছর নেত্রীর জন্মদিন এমন একটি সময়ে ফিরে আসলো, যখন আমরা সকলে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি সেই মাহেন্দ্রক্ষনের – কখন নেত্রী দেশে ফিরবেন? কখন তাঁর সাথে আমরা যারা বঙ্গবন্ধুর সৈনিক, যারা স্বাধীনতাকামী ও অসাম্প্রদায়িক প্রবাসী, তারা ফিরে যাবো বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলায়?
এই চরম অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার মাঝে বাংলাদেশের আপামর জনতা আজ আবারো সেই ১৯৮১ সালের মতোই শেখ হাসিনার ফেরার প্রতীক্ষায় প্রহর গুনছে। দেশের উন্নয়নের চাকা সচল রাখতে এবং মেগা প্রজেক্টগুলো সফলভাবে সমাপ্ত করতে তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্বের কোনো বিকল্প নেই। মানুষ বিশ্বাস করে, একমাত্র শেখ হাসিনাই পারেন বিশৃঙ্খলা কাটিয়ে দেশে শান্তি ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে আজ সারা দেশ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে সেই দিনটির জন্য, যখন গণতন্ত্রের মানসকন্যা আবারও বাংলাদেশের মাটিতে পা রেখে জাতিকে মুক্তি দেবেন।আমাদের মনে রাখতে হবে – নেত্রী ফিরে আসবেন আমাদের ‘পাশে থেকে মুক্তি-সংগ্রামে অংশ নিতে’।
নেত্রীর দেশে ফেরার ঘটনায় ইতোমধ্যে শুধু বাংলাদেশেই নয়, সারা বিশ্ব জুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিদিন মিছিল হচ্ছে, পুলিশ তাদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে, জামিনে বের হয়ে এসে আবার মিছিলে যাচ্ছে। জননেত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ়তায় বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে গনজোয়ারের সৃষ্টি হয়েছে। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের ভিড়ে দেশের কারাহারগুলোতে আর তিলমাত্র জায়গা নেই, তবু গনজাগরণ আজ থেমে নেই। এই আন্দোলনে নেতুত্ব দিচ্ছে আজ ছাত্র-যুবারা। তারা ‘এখন যৌবন যার, মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়’ মন্ত্রে দীক্ষিত। নেত্রীর ডাকে ‘মিছিলের সকল হাত, কন্ঠ’ আজ এক হয়ে গিয়েছে। সব কন্ঠ এক হয়ে বলছে, ‘শেখ হাসিনা আসবে, বাংলাদেশ হাসবে’। কখনো সেই কন্ঠ সমস্বরে বলছে, ‘ঝড়-বৃষ্টি-আধাঁর রাতে, আমরা আছি তোমার সাথে’। বার্লিনে বসে যখন এই শ্লোগান শুনি, তখন মনের অজান্তেই আমি বলে উঠি, ‘বাংলাদেশে কি কোনো নেত্রী আছে?, কোন সে নেত্রী ? শেখ হাসিনা, শেখ হাসিনা’ । আর অজান্তেই দু’চোখ ভিজে ওঠে, ভাবি কবে আমরা এই অগণতান্ত্রিক ও অসাংবিধানিক শাসন ব্যবস্থা থেকে মুক্তি পাবো? পরক্ষনেই উচ্ছসিত হয়ে উঠি এই ভেবে যে, এ’বছর ডিসেম্বরেই আমরা সবাই দেশে যাবো এবং বাংলাদেশকে এই ফ্যাসিস্ট – সুদখোরদের হাত থেকে নেত্রীর নেতৃত্বে দেশকে মুক্ত করবো।
এই মূহূর্তে মার্কিন যুক্তরাস্ট্রে চলছে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন। এর পাশাপাশি আজকে মার্কিন যুক্তরাস্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের একজন প্রতিনিধির বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, জননেত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন এবং আওয়ামী লীগের রাজনীতির উপর থেকে অন্যায় ও অবৈধ নিষেধাজ্ঞা সরিয়ে নেয়ার বিষয়ে কোনো প্রত্যক্ষ আপত্তি দেশটির নেই। দেশটি চায় ভারত ও বাংলাদেশ যেন যৌথভাবে বাংলাদেশ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহন করে। যার অর্থ হচ্ছে- মার্কিন যুক্তরাস্ট্র ভারতের লেন্স দিয়েই বাংলাদেশকে দেখতে চায়। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশসমূহ কিংবা অন্যান্য পশ্চিমা দেশগুলোও যে মার্কিন নীতিই অনুসরণ করবেন, তা সহজেই অনুমেয়। সম্প্রতি নয়া দিল্লীতে সমাপ্ত ব্রিকস সম্মেলন শেষে দৈনিক মানবজমিনসহ বেশ কয়েকটি পত্রিকা ও অনলাইন পত্রিক খবর প্রকাশ করে যে, রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি পুতিন ও ব্রাজিলের রাষ্ট্রপতি লুলাসহ বেশ কয়েকজন সরকারপ্রধান বাংলাদেশের সফলতম প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে কথা বলেন এবং জননেত্রীর প্রত্যাবর্তনের বিষয়ে তাঁদের সমর্থন জ্ঞাপন করেন।
জননেত্রী শেখ হাসিনা এমন একসময় দেশে ফিরছেন যখন বাংলাদেশ যুক্তরাস্ট্রের সাথে গত ১০ ফেব্রুয়ারি একটি রিসিপ্রোকাল চুক্তি স্বাক্ষর করে। চুক্তিটি আদতে একটি গোলামী চুক্তি। কি আছে এই চুক্তিতে? সংক্ষেপে বলতে গেলে, বাংলাদেশ কোনো বৈদেশিক বানিজ্যিক চুক্তির মাধ্যমে কোনো কিছু ক্রয় করতে চাইলে প্রথমে যুক্তরাস্ট্রকে সুযোগ দিতে হবে। তারা যদি সেই পণ্য বা সুবিধা নাও দিতে পারে, তারা বলে দেবে কাদের কাছ থেকে কিনতে হবে। এ যেন পাকিস্তানের শাসন আমলের মত, একমাত্র পার্থক্য যুক্তরাস্ট্র শুধু প্রত্যক্ষভাবে ক্ষমতায় থাকছে না। যুক্তরাস্ট্র যে বাংলাদেশকে একটি নব্য উপনিবেশ হিসেবে বিবেচনা করছে, এর প্রমান আপনি পাবেন বতর্মান অবিসাংবিধানিক ও অগণতান্ত্রিক প্রধানমন্ত্রীর যুক্তরাস্ট্র ভ্রমন থেকে। ট্রাম্প তার সাথে দ্বিপাক্ষিক কোনো বৈঠক করেননি। যদিও অবৈধ প্রধানমন্ত্রী ও তার পাপেট বাহিনী বাংলাদেশ থেকে যাবার আগে বলেছিলো তারা মূলত ট্রাম্পের সাথে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার জন্যই যাচ্ছেন। কিন্তু দেখা কি করতে পারলেন?
এই সামান্য সাক্ষাতের আশায় কি বাংলাদেশের মানুষের মুখের গ্রাস কেড়ে নিয়ে একের পর এক বোয়িং বিমান কিনে চলেছে? কিসের আশায়? কার জন্য? ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিকে সুদি ইউনুস যেভাবে তোষণ করেছে, সেই একইভাবে বর্তমান পরাধীন সরকারও এই নীতিকে বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে বেশী গুরুত্ব দিয়ে যাচ্ছে। অথচ দেশে মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নেই, খাদ্য নেই, নেই তেল-বিদ্যুত্ কিংবা শিশুদের জীবন রক্ষাকারী ঔষধ, রাজনৈতিক অধিকার নেই, কথা বলার বা সমাবেশ করার অধিকার নেই, বিচারের অধিকার নেই – শুধু নেই আর নেই।
এরই মাঝে মার্কিন প্রভুদের তুষ্ট করতে, গত ২৫ সেপ্টেম্বর একটি ‘সিভিল নিউক্লিয়ার সহযোগিতা’ সংক্রান্ত একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ সরকার। এই সমঝোতা স্মারকে জ্বালানী নিরাপত্তার পাশাপাশি, রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। উল্লেখ করা প্রয়োজন, জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ইতিমধ্যে রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুত্ কেন্দ্র নির্মাণ শেষ হয়েছে, এখন অর্থাভাবে বর্তমান সরকার কেন্দ্রটিতে বিদ্যুত্ উত্পাদনে যেতে পারছে না। এরই মধ্যে এই সমঝোতা স্মারক ! এই চুক্তি কি তাহলে বাংলাদেশকে রাশিয়া – যুক্তরাস্ট্রের আরেকটি ছায়া যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করতে যাচ্ছে?
অন্যদিকে ২০০৮ সালে দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে, তিলে তিলে সফলতম প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে একটি উন্নয়নশীল ও স্বনির্ভর দেশ হিসেবে গড়ে তুলেছেন, দেশকে তিনি ‘স্মার্ট বাংলাদেশ ২০৪০’ রুপকল্প উপহার দিয়েছিলেন। স্বাস্থ্যখাত থেকে পদ্মাসেতু, কর্ণফুলী টানেল কিংবা আর্ন্তজাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল নির্মান, বিধবা ভাতা থেকে বিদ্যুত্ স্বনির্ভরতা কিংবা মেট্রোরেল – সবক্ষেত্রে তাঁর টেকসই পলিসি গ্রহন করার কারণেই বাংলাদেশ ও শেখ হাসিনা বিশ্ব দরবারে উন্নয়নের মডেল হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিলো। অথচ আজ দেশের কি অবস্থা? পাঠকদের শুধু মনে করিয়ে দিতে চাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নীতিমালার কারণেই দেশে শিশু মৃত্যু ও মাতৃমৃত্যুর হার শূণ্যের কোঠায় নেমেে এসেছিলো। আজ সুদখোর ইউনুসের হঠকারী সিদ্ধান্তের কারণে হাম মহামারীর রুপ ধারণ করেছে। কিশোর গ্যাং ও জঙ্গী-সন্ত্রাসীদের উত্থানের কারণে এবং মাদ্রাসাগুলোতে শিশুদের যৌন নিপীড়নের কারণে শিশুদের জীবন ও শৈশব আজ বিপন্ন।
সারা দেশ তাকিয়ে আছে নেত্রী আপনার আরেকটি প্রত্যাবর্তনের জন্য। ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে কোটি জনতা। অবৈধভাবে আটক নেতা-কর্মীরা দিন গুনছে জননেত্রী আপনার জন্য, প্রহর গুনছে নির্যাতিত-নিপীড়িত জনগোষ্ঠী আপনার অপেক্ষায়। পিতা হারা-সন্তানহারা পরিবারগুলো পথ চেয়ে আছে আপনার! বাংলার শিশির মাখা দূব্বা ঘাস বঙ্গবন্ধু কন্যা আপনার পায়ের স্পর্শ পাবার অপেক্ষায়, টুঙ্গীপাড়ার সেই বাইঘার নদীর জল আপনার হাতের ছোঁয়া পেতে আজো বয়ে চলেছে।
আজ আপনার জন্মদিনে মাতৃতুল্য প্রিয় নেত্রী, আবারো রবীন্দ্রনাথকে ধার করে শ্রদ্ধার্ঘ নিবেদন করতে চাই –
“আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি
তুমি এই অপরূপ রূপে বাহির হলে জননী!
ওগো মা, তোমায় দেখে দেখে আঁখি না ফেরে!
তোমার দুয়ার আজি খুলে গেছে সোনার মন্দিরে॥”
জননেত্রী আপনার দীর্ঘায়ূ কামনা করছি, আমাদের জন্য দোয়া করবেন।
জয় বাংলা
জয় বঙ্গবন্ধু
জয়তু: শেখ হাসিনা
লেখক:
মিজানুর হক খান
সভাপতি, জার্মান আওয়ামী লীগ
২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, নয়া দিল্লী, ভারত।