আঁধার পেরিয়ে প্রত্যাবর্তনের প্রত্যয়: একটি নতুন বাংলাদেশের অপেক্ষায় ১৫ আগস্ট”
মিজানুর হক খান, সভাপতি, জার্মান আওয়ামী লীগ
বছর ঘুরে আবার ১৫ আগস্ট ফিরে এসেছে। বাংলাদেশের ইতিহাসের পাতায় এক গভীর ক্ষত এবং বেদনাবিধুর স্মৃতির দিন। ১৯৭৫ সালের এই কালরাত্রিতে আমরা হারিয়েছি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ তাঁর পরিবারের নৃশংসভাবে নিহত সকল সদস্যকে। ইতিহাসের এই নৃশংসতম হত্যাকাণ্ডে শহীদ হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, পুত্র শেখ কামাল, শেখ জামাল, শিশু রাসেলসহ অনেকেই। আজকের এই শোকের দিনে আমরা তাঁদের স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই ।
২০২৪ সালের ১৫ আগস্ট আমরা জাতীয়ভাবে পালন করতে পারিনি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং এর সকল অংগ সংগঠনগুলির নেতা-কর্মীসহ আপামর জনগন যারাই ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িতে গিয়েছিলো, তারাই মব সন্ত্রাসের লাঞ্ছনা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে। ২০২৫ সালের ১৫ আগস্টও একইভাবে স্কুলের ছাত্র , রিকশা চালক ও সাধারণ নারী যারাই ৩২ নম্বরের ধ্বংসস্তুপে পুস্পস্তবক অর্পন করতে গিয়েছিলেন, তাদেরকে বি.এন.পি- জামাত- এনসিপি- ইনকিলাব চক্র তাদেরকে প্রথমে নির্যাতন করেছে, পরে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে। এর কোনোটারই বিচার এখনো হয়নি।
আমরা এখনো ভুলে যাইনি ৩২ ভাঙ্গার স্মৃতি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ৩২ নম্বরের বাড়িটি ভাঙ্গা শুরু হয়, যার শেষ হয় ২০২৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি এক্সকেভটেরের মাধ্যমে অবশিষ্ট অংশটুকু ধূলায় মিশিয়ে দেয়ার মাধ্যমে। এই ধ্বংসযজ্ঞ চলেছে অবৈধ ও অগণতান্ত্রিক ইউনুস সরকার ও তার দোসরদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে। এই জঙ্গী তৌহিদী জনতাকে উসকানি দিয়েছিলো প্রবাসী কিছু কনটেন্ট ক্রিয়েটর। এদের সবার বিচার বাংলার মাটিতে হবেই।
অন্য যেকোনো ১৫ আগস্ট, আর ২০২৬ সালের ১৫ আগস্ট এক নয়। আঁধার কালো অমাবস্যার শেষে পূর্ণিমার চাঁদ উঁকি দিতে শুরু করেছে। বাংলাদেশের সফলতম প্রধানমন্ত্রী, বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা গত ৫ আগস্ট নয়া দিল্লীস্থ দক্ষিণ এশিয়ার বৈদেশিক সংবাদদাতা ক্লাবে এক ভার্চুয়াল ভাষণে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর মাসে সকল বাঁধা ও মৃত্যুভয় উপেক্ষা করে বাংলাদেশে ফিরে যাবার দৃঢ় প্রত্যয় ঘোষণা করেছেন। সাথে সাথে নেতা-কর্মীদের মন থেকে সকল কালো মেঘ দূর হয়ে গিয়ে সূর্য হাসতে শুরু করেছে। সারা বাংলাদেশের নেতা-কর্মীরা, এমনকি প্রবাসী নেতা-কর্মীরাও কোমর বেঁধে প্রস্তুতি নিয়েছে তাদের প্রানপ্রিয় নেত্রীকে বরণ করে নেয়ার জন্য। নিন্দুকেরা প্রশ্ন তুলেছে – তিনি কেন বাংলাদেশে বর্তমান পরিস্থিতিতে ফিরে যাবেন? এইসব নিন্দুকেরা নিজেরাও জানে বিএনপি – জামাত – এনসিপির সরকার দেশটিতে আইনের শাসন বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছেন, কোনো নাগরিকের সামান্যতম নিরাপত্তা দিতে এই সরকার ব্যর্থ। তারেক রহমানের সরকার ফিরিয়ে নিয়ে এসেছে লোডশেডিংয়ের কালো রাত্রি। চাঁদাবাজ-আর ধর্ষকদের ভয়ে আবালবৃদ্ধবণিতা কেউ আজ নিরাপদ নয়। মার্কিনিদের সাথে গোলামির চুক্তি স্বাক্ষর করেও দেশ আজ দেউলিয়া হবার পথে। কোনো বিদেশী বিনিয়োগকারী আর বিনিয়োগ করতে চায় না এই বাংলাদেশে। তেল-গ্যাস-বিদ্যুতের অভাবে একের পর এক কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, শ্রমিকেরা বাধ্য হচ্ছে বিভিন্ন অনৈতিক কাজের সাথে জড়িত হতে। ভালো ভাবে বলতে গেলে বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা ও বিচার ব্যবস্থা ইউনুস গং সমূলে বিনষ্ট করেছে, আর বর্তমান জঙ্গীচালিত সরকার সেই কংকাল নিজেদের পিঠে বহন করে নিয়ে যাচ্ছে।
ফিরে আসা যাক মূল প্রশ্নে। বঙ্গবন্ধু তনয়া জননেত্রী শেখ হাসিনা এর উত্তর তাঁর ৫ আগস্ট-এর বক্তব্যে দিয়ে গিয়েছেন। তিনি বলেছেন,
“গত দুই বছর ধরে আমি আমার প্রিয় বাংলাদেশের দুর্ভোগ প্রত্যক্ষ করেছি। আমি সেই মায়েদের সঙ্গে কথা বলেছি যাঁরা তাঁদের সন্তান হারিয়েছেন, সেই শ্রমিকদের সঙ্গে যাঁরা কাজ হারিয়েছেন, সেই পরিবারগুলোর সঙ্গে যাঁরা নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে হিমশিম খাচ্ছে, সেই নারীদের সঙ্গে যাঁরা অপমান ও ভয়ের মধ্যে বসবাস করছেন, এবং সেই তরুণদের সঙ্গে যাঁরা নিজের দেশে আর ভবিষ্যৎ দেখতে পান না। আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীদের আত্মগোপনে বাধ্য করা হয়েছে। ভয় ঢুকে পড়েছে ঘরে ঘরে, কর্মস্থলে, ক্যাম্পাসে। এটি সেই বাংলাদেশ নয় যার জন্য ১৯৭১ সালে ৩০ লক্ষ মানুষ প্রাণ দিয়েছিলেন।”
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও বাংলাদেশের সর্বকালে শ্রেষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী এই প্রসঙ্গে আরো বলেন যে,
“৫ আগস্ট এর পরও ষড়যন্ত্র থামেনি। ৫ আগস্টের পর সহিংসতা রাজনৈতিক নিপীড়নের এক অভিযানের রূপ নেয়। ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগ কর্মী সবুজ আলীর হত্যার মধ্য দিয়ে ১৬ জুলাই শুরু হওয়া হত্যাকাণ্ড এখনো থামেনি। আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীদের হত্যা করা হচ্ছে, গুম করা হচ্ছে, গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, ঘরছাড়া করা হচ্ছে এবং মিথ্যা মামলার নিচে চাপা দেওয়া হচ্ছে। অন্তত দশ হাজার মানুষ নিহত বা গুম হয়েছেন। গত দুই বছরে প্রায় ছয় লক্ষ ৫০ হাজার মানুষকে গ্রেফতার করা হয়েছে। প্রায় সাড়ে তিন হাজার মামলা দায়ের করা হয়েছে, যেখানে প্রায় সাড়ে চার লক্ষ নেতা কর্মী ও সমর্থককে নাম সহ আসামী করা হয়েছে। ১০ লক্ষেরও বেশি মানুষকে অজ্ঞাতনামা আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ছাত্রলীগ, যুবলীগ সহ অন্যান্য সহযোগী সংগঠনের নারী কর্মীরা হেফাজতের নির্যাতন, অপমান ও নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন। নির্যাতন, চিকিৎসা অস্বীকার, খাদ্য বঞ্চনা, অবহেলা এবং মৌলিক অধিকার প্রত্যাখানের নথিভুক্ত বিবরণের মধ্যে অনেক নেতা কর্মীও কারাগারে মারা গেছেন।
এই নিপীড়ন শুধু আওয়ামী লীগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্য, বিচারক, আইনজীবী, বুদ্ধিজীবী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, সাংবাদিক, পেশাজীবী, শ্রমিক, কৃষক ও সাধারণ নাগরিকরা আক্রান্ত, গ্রেপ্তার বা হত্যা মামলায় অভিযুক্ত হয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী কেউই নিরাপদ নয়। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রতীক ও স্মৃতিস্তম্ভ ধ্বংস করা হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের জুতার মালা পরিয়ে অপমান করা হয়েছে। ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক বাসভবনে হামলা চালিয়ে ধাপে ধাপে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।”
এই একই সভায় বঙ্গবন্ধুর দৌহিত্র ও জননেত্রী শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় আশংকা প্রকাশ করে বলেন যে, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। তিনি ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোকে উদ্দেশ্য করে বলেন যে, বাংলাদেশে ইউনুস ও তারেক রহমানের সরকার যেভাবে জঙ্গী লালন-পালন করছেন, তাতে অদূর ভবিষ্যতে দেখা যাবে এসব দেশে হামলাকারী জঙ্গীদের উত্থান ও প্রশিক্ষণ বাংলাদেশের ভূখন্ডেই হয়েছে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ the Analytical Support and Sanctions Monitoring Team-এর ৩৮তম রিপোর্টে বাংলাদেশের ভূখন্ড ব্যবহার করে Al-Qaida in the Indian Sub-Continent বা AQIS-এর প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে বলে আশংকা প্রকাশ করে হয়েছে। সজীব ওয়াজেদ জয় পশ্চিমা দেশগুলো এবং তাদের মিডিয়গুলো কেন ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত এবং এর পরবর্তীতে ধারাবাহিকভাবে ঘটে যাওয়া মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোর বিচার না হওয়ার পরেও নীরবতা পালন করছে তাতে বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন যে, নীরবতার কারণে এসব ঘটনার দায় তাদের উপরেও বর্তাবে। আর্ন্তজাতিক মিডিয়াকে তিনি নিরপেক্ষভাবে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট-এর ঘটনাগুলো রিপোর্ট করতে বলেন এবং ৫ আগস্ট-এর পর থেকে অদ্যাবধি নিহত ও নির্যাতিত নেতা-কর্মীদের ঘটনাগুলো সঠিকভাবে তুলে ধরার আহ্বান জানান।
জননেত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ের এই বক্তব্যের পর সারা দেশের নেতা-কর্মীরা যেমন উজ্জিবীত হয়েছেন, তেমনি প্রবাসী নেতা-কর্মীরাও দলবেঁধে বাংলাদেশে যাবার প্রস্তুতি গ্রহন করছেন। অকুতোভয় নেত্রীর বক্তব্য ও সাংবাদিকদের সাথে প্রদত্ত প্রশ্র-উত্তর পর্ব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রবাসী বিশেষ করে ইউরোপের নেতা-কর্মীদের এই মূহূর্তে বেশ কিছু কাজ করতে হবে। এই কাজগুলোর মূল লক্ষ্য হবে – আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধ করে যে অসাংবিধানিক ও অবৈধ প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে, তা বাতিল করার জন্য একত্রে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহন করা, এবং ইউনুস আমলে যেসব মানবাধিকার লংঘন ও অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, তা প্রামাণ্য দলিলসহ বিশ্ববাসীর কছে তুলে ধরা।
আমাদের খুব দ্রুত ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU), ইউরোপীয় পার্লামেন্ট এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর কাছে বর্তমান অবৈধ সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘন, বিচারবহির্ভূত হত্যা, এবং রাজনৈতিক নিপীড়নের প্রামাণ্য দলিলসমূহ নিয়মিতভাবে উপস্থাপন করতে হবে। বাংলাদেশে ধর্মীয় উগ্রবাদ, জঙ্গিবাদ এবং নিষিদ্ধ উগ্রপন্থী সংগঠনগুলোর পুনরুত্থান কীভাবে ইউরোপ ও দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলছে, তা ইউরোপীয় নীতিনির্ধারক ও গণমাধ্যমের সামনে জোরালোভাবে তুলে ধরতে হবে। একইসাথে, বাংলাদেশে রাজনৈতিক কারণে যেসব নেতাকর্মী, সাংবাদিক ও অ্যাক্টিভিস্ট মিথ্যা মামলার শিকার হয়েছেন এবং কারাবন্দী রয়েছেন, তাদের পক্ষে আন্তর্জাতিক আইনি সহায়তা ও সোচ্চার ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে। এই মূহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ,ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা আওয়ামী লীগের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের সকল বিভেদ ভুলে এক প্ল্যাটফর্মে এসে জননেত্রী শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন আন্দোলনকে সফল করা এবং প্রবাসে দলীয় সাংগঠনিক ভিত্তি আরও সুদৃঢ় করা।
১৫ আগস্ট জননেত্রী শেখ হাসিনার সকল নির্দেশনা পালন করার অনুপ্রেরণা, আর ধানমন্ডি ৩২ আমাদের উদ্দীপনার বাতিঘর। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শকে সামনে রেখে ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্ত আর ৪ লক্ষাধিক বীরঙ্গনার সম্ভ্রমের বিনিময়ে পাওয়া সোনার বাংলাকে আমাদের পুনরুদ্ধার করতে হবে।
জয় বাংলা।
জয় বঙ্গবন্ধু।