এমরানা আহমেদ:
অকাল মৃত্যু ডেকে আনছে প্যাকেটজাত খাবার। প্যাকেটজাত খাবারে তিনটি উপাদান বেশি ব্যবহারের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে মানুষের মধ্যে অসংক্রামক রোগের মহামারি দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস এবং ক্যান্সারের মতো কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়ে অকালে ঝড়ছে বহু প্রাণ। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, প্যাকেটজাত খাবারের প্রধান ঝুঁকিগুলো হলো প্যাকেটজাত খাবারে স্বাদ বৃদ্ধি ও সংরক্ষণের জন্য প্রচুর লবণ ব্যবহার করা হয়, যা রক্তচাপ বাড়িয়ে হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি তৈরি করে। চিনির আধিক্য; কোমল পানীয়, মিষ্টি নাস্তা ও সিরিয়ালে মাত্রাতিরিক্ত চিনি থাকে, যা স্থূলতা এবং বিপাকীয় রোগের কারণ। অস্বাস্থ্যকর ফ্যাট ও ট্রান্স ফ্যাট; প্রক্রিয়াজাত খাবারে ব্যবহৃত খারাপ ফ্যাট শরীরে কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। পুষ্টির অভাব; প্যাকেটজাত খাবারে আঁশ ও প্রয়োজনীয় ভিটামিনের পরিমাণ খুবই কম থাকে। ক্ষতিকর রাসায়নিক; প্লাস্টিকের মোড়কে থাকা বিসফেনল বা অন্যান্য প্রিজারভেটিভ হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। এসব বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে প্যাকেটজাত পণ্যের মোড়কে খাদ্য ও পুষ্টি উপাদান এবং অতিরিক্ত চিনি, লবণ এবং ট্রান্সফ্যাট থাকার কথা উল্লেখ করে লেবেল দেওয়ার বাধ্যবাধকতার আইন প্রয়োগের প্রয়োজনীতার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, যাতে জনগণ এসব বিষয়ে সচেতন হতে পারেন এবং অস্বাস্থ্যকর খাবার পরিবহার করে স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য গ্রহণ করতে পারে।
২০২৫ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের ৯৭ শতাংশ মানুষ সপ্তাহে অন্তত একবার এসব খাবার খান। শিশুরা সপ্তাহে ২১বার প্যাকেটজাত খাবার খায়। এসব খাবারে কোন উপাদান কি পরিমাণ আছে তার উল্লেখ নাই। অথচ বাজারে থাকা পণ্যের ৬৩ শতাংশেই রয়েছে অতিরিক্ত লবণ (সোডিয়াম), যা স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২৪টি ব্র্যান্ডের ৯ ধরনের প্রক্রিয়াজাত খাদ্য পরীক্ষা করে দেখা গেছে-প্রতি ১০০ গ্রাম লজেন্সে চিনি রয়েছে ৪৩ গ্রাম, যেখানে নির্ধারিত সীমা ২৫ গ্রাম। একইভাবে, ১০০ গ্রাম ডাল ভাজায় লবণ পাওয়া গেছে ৬.১ গ্রাম, যা সর্বোচ্চ সীমা ৫ গ্রাম ছাড়িয়েছে। বিস্কুট ও মিল্ক চকলেটে ট্রান্স ফ্যাট ও স্যাচুরেটেড ফ্যাটের উপস্থিতিও উদ্বেগজনক।
সব খাবারেই দ্বিগুণের বেশি লবণ: গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বহুল প্রচলিত চানাচুর, নুডলস, ইনস্ট্যান্ট স্যুপ ও ঝালমুড়ির কোনোটিতেই নির্ধারিত মাত্রার লবণ পাওয়া যায়নি, বরং এগুলোতে দ্বিগুণের বেশি লবণ রয়েছে। একইভাবে বাজারে বিক্রি হওয়া আচার ও চাটনির ৮৩ শতাংশে, চিপসের ৬৩ শতাংশে এবং ডাল-বুট ভাজার ৬০ শতাংশে দ্বিগুণ লবণ রয়েছে। তবে চিপস, ডাল-বুটের একটিতেও নির্ধারিত মাত্রার লবণ নেই।
গবেষণায় বলা হয়েছে, মূলত বাংলাদেশে সরকারিভাবে প্রক্রিয়াজাত খাবারে লবণের সর্বোচ্চ কোনো সীমা নির্ধারণ করা নেই। যার ফলে কোম্পানিগুলো তাদের পণ্যে ইচ্ছেমতো লবণ যোগ করে। যদিও মোড়কাবদ্ধ খাদ্য লেবেলিং প্রবিধানমালা ২০১৭ অনুসারে, প্রক্রিয়াজাত খাবারে বিদ্যমান লবণের পরিমাণ মোড়কের লেবেলে উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু গবেষণায় প্রায় অর্ধেক বা ৪৪ শতাংশ খাবারের মোড়কে উল্লিখিত পরিমাণের চেয়ে বেশি লবণ পাওয়া গেছে। লবণের পরিমাণের সঠিক তথ্য পাওয়া গেছে ২৭ শতাংশ মোড়কে ও ৯ শতাংশ মোড়কে লবণের কোনো তথ্যই পাওয়া যায়নি।
গবেষণায় প্রতিবেদন বলছে, বাজারের প্রক্রিয়াজাত প্যাকেট খাবারের মধ্যে শিশুরা সবচেয়ে বেশি খায় বিস্কুট, ৮৭ শতাংশ এবং কম খায় ঝালমুড়ি, ২৩ শতাংশ। এ ছাড়া ৮১ শতাংশ চকলেট, ৭৮ শতাংশ চিপস, ৬৮ শতাংশ নুডলস, ৬৫ শতাংশ চানাচুর, ৬০ শতাংশ কেক, ৪৩ শতাংশ বাদাম-বুট, ৩৯ শতাংশ ব্রেড, ৩৬ শতাংশ আচার-চাটনি, ৩১ শতাংশ সস, ৩০ শতাংশ সফট ড্রিঙ্কস ও ২৫ শতাংশ ফ্রুট ডিঙ্কস খায় শিশুরা।
বাজারে বিক্রি হওয়া এসব খাবারের মধ্যে সবচেয়ে বেশি খাওয়া হয় বিস্কুট, যা মোট খাবারের ৭৮ শতাংশ ও কম ফ্রুট ড্রিঙ্কস, ১০ শতাংশ। এ ছাড়া চানাচুর ৫৩ শতাংশ, নুডলস ৫২ শতাংশ, চকলেট ৪৬ শতাংশ, চিপস ৪৫ শতাংশ, কেক ৪২ শতাংশ, ব্রেড ৩১ শতাংশ, সফট ড্রিঙ্কস ২৯ শতাংশ, বুট-বাদাম ২৮ শতাংশ, সস ২৬ শতাংশ, আচার-চাটনি ২৪ শতাংশ ও ঝালমুড়ি ২৩ শতাংশ খাওয়া হয়।
বেশি খায় শিশুরা ও মেট্রোপলিটনে: বাজারে বিক্রি হওয়া প্রক্রিয়াজাত প্যাকেট খাবার বেশি খায় শিশুরা, ২১ শতাংশ। এরপর কিশোর-কিশোরীরা খায় ১৬ শতাংশ ও পূর্ণ বয়স্করা ১১ শতাংশ। বেশি খায় পুরুষ ১৫ শতাংশ ও নারী ১৪ শতাংশ। মেট্রোপলিটন এরিয়ায় খায় ১৭ শতাংশ, শহরাঞ্চলে ১৫ শতাংশ ও গ্রামে ১১ শতাংশ মানুষ।
গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটরের (জিএইচএআই) বাংলাদেশ কান্ট্রি লিড মুহাম্মাদ রূহুল কুদ্দুস,প্যাকেটজাত খাদ্যের সম্মুখভাগে সহজবোধ্য সতর্কতামূলক লেবেল বা ‘ফ্রন্ট অব প্যাক লেবেলিং (এফওপিএল)’ চালু করা হলে খাদ্যজনিত অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব।বাধ্যতামূলক এফওপিএল চালু হলে পণ্যের সম্মুখভাগে ‘অতিরিক্ত’ সতর্কবার্তা দেখে ভোক্তারা সহজেই বুঝতে পারবেন, কোন খাদ্যে ক্ষতিকর উপাদান বেশি রয়েছে। এতে সচেতনভাবে স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য বেছে নেওয়া সহজ হবে। একই সঙ্গে উৎপাদকেরাও পণ্যের গুণগত মান উন্নত করতে উৎসাহিত হবেন। তিনি জানান, বিশ্বে ইতিমধ্যে ৪৪টি দেশ এফওপিএল চালু করেছে, যার মধ্যে ১০টি দেশে এটি বাধ্যতামূলক। এসব দেশে ভোক্তাদের খাদ্য নির্বাচনে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে এবং অস্বাস্থ্যকর খাদ্য গ্রহণ কমেছে।
প্যাকেটজাত খাবার নিয়ে শঙ্কার কথা জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। সংস্থাটির পক্ষ থেকে অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসকে অকাল মৃত্যু ও বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের অন্যতম ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করে বলা হচ্ছে, বিশ্ব জুড়ে ৮০০ মিলিয়ন লোক অসংক্রামক রোগে ভূগছে। এর অন্যতম কারণ অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভাস। সংস্থাটির মতে, প্যাকেটজাত ও অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারে অতিরিক্ত লবণ, চিনি এবং ট্রান্স ফ্যাট থাকে। নিয়মিত এসব খাবার গ্রহণ করলে হৃদরোগ, টাইপ-২ ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলতা এবং ক্যান্সারের মতো অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। এসব স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থা প্যাকেটজাত খাবারের সামনের অংশে স্পষ্ট সতর্কবার্তা চালুর পরামর্শ দিয়ে থাকে।
বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থার তথ্যানুযায়ী, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের কারণে বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় এক কোটি ১০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। বাংলাদেশেও অসংক্রামক রোগে মৃত্যুর হার উদ্বেগজনক-প্রতি বছর প্রায় ২ লাখ ৭৭ হাজার মানুষ হৃদরোগে মারা যান। মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশই এসব অসংক্রামক রোগে, যার অন্যতম কারণ অনিরাপদ খাদ্যাভ্যাস।
প্যাকেটজাত পণ্যেও থাকতে হবে স্বাস্থ্য সতর্কতা
বাজারে প্যাকেটজাত যেসব খাদ্যপণ্য আছে সেগুলোকেও স্বাস্থ্যঝুঁকির সতর্কতার আওতায় আনা হচ্ছে। প্যাকেটের সামনের দিকে বড় একটা অংশজুড়ে লেখা থাকতে হবে স্বাস্থ্য সতর্কতার বার্তা। এসব পণ্যে অতিরিক্ত মাত্রায় যেসব উপকরণ থাকে, যা স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ক্ষতিকর সেগুলো লেখা থাকতে হবে। সাধারণত প্যাকেটপণ্যে অতিরিক্ত মাত্রার চিনি, লবণ এবং চর্বি যুক্ত থাকে। তাই প্যাকেটের গায়ে সামনের দিকে লিখতে হবে- ‘অতিরিক্ত মাত্রায় চিনি, লবণ ও চর্বিযুক্ত খাদ্য স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।’
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শোয়েব বলেন, ইতিমধ্যে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ প্রতিষ্ঠান নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ‘নিরাপদ খাদ্য (মোড়কাবদ্ধ খাদ্য লেবেলিং) প্রবিধানমালা-২০২৬ প্রণয়ন করেছে। এ ছাড়া অংশিজনের মতামতও চাওয়া হয়েছে এবং ইতিমধ্যে ৬৪টি দেশি-বিদেশি সংস্থা তাদের মতামত দিয়েছে এ ব্যাপারে। এখন তাদের মতামত যাচাই-বাছাই চলছে। যাচাই শেষে প্রয়োজনীয় মতামতগুলো প্রবিধানে সন্নিবেশ করা হবে। ‘খসড়া প্রবিধানমালাটি বর্তমানে খাদ্য মন্ত্রণালয়ে রয়েছে। খাদ্য মন্ত্রণালয় যাচাই-বাছাই করে চূড়ান্ত আইনের জন্য এটি আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। আইন মন্ত্রণালয় আইন চূড়ান্ত করে দিলে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ প্রজ্ঞাপন জারি করবে। প্রজ্ঞাপন জারির ৬ মাস পর এই নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩-এর আওতায় এই বিধিমালা কার্যকর হবে। অথাৎ এই আইন কার্যকর হওয়ার পর থেকে বিড়ি-সিগারেটের মতো তামাকজাত পণ্যের মোড়কের গায়ে যেভাবে স্বাস্থ্য সতর্কতা লেখা থাকে, সেভাবে প্যাকেটজাত পণ্যের গায়েও স্বাস্থ্য সতর্কতা লেখা বাধ্যতা মূলক হবে।