১৬ মাসে সারাদেশে ১১৩ মাজারে হামলা, ঢাকা বিভাগেই সর্বাধিক

সময়ের চিত্র ডেস্ক:

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পরবর্তী ১৬ মাসে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মাজার, দরগাহ ও সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় ধারাবাহিক হামলার ঘটনা ঘটেছে। বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এ সময়ের মধ্যে অন্তত ১১৩টি মাজারে হামলা, ভাঙচুর বা অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি হামলা হয়েছে ঢাকা বিভাগে।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান রাসা সেন্টার জানিয়েছে, সারাদেশের চিত্র বিশ্লেষণে এই সংখ্যা উঠে এসেছে। অন্যদিকে গবেষণা সংস্থা মাকাম ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগের ঘটনাগুলো আলাদাভাবে পর্যালোচনা করে জানায়, শুধু এই দুই বিভাগেই ৬৪টি মাজার, দরগাহ ও খানকায় হামলার প্রমাণ পাওয়া গেছে। ঢাকা বিভাগের ৯টি জেলায় ৩৭টি এবং চট্টগ্রাম বিভাগের ৫টি জেলায় ২৭টি হামলার ঘটনা ঘটেছে।

এর আগে গত ১৮ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানায়, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট থেকে পরবর্তী সাড়ে পাঁচ মাসে ৪০টি মাজার ও সুফি সমাধিস্থলে ৪৪টি হামলার ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় ভাঙচুর, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ এবং ভক্তদের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে। পুলিশের তথ্যমতে, এসব ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং ২৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যদিও অনেক মামলা এখনও তদন্তাধীন।

গোয়ালন্দের ভয়াবহ ঘটনা :

মাজারে হামলার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ও নৃশংস ঘটনা ঘটে গত বছরের ৫ সেপ্টেম্বর রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে। সেখানে নুরুল হক ওরফে নুরাল পাগলার কবর ‘শরিয়ত পরিপন্থি’ দাবি করে দরবার ও বাড়িতে হামলা চালানো হয়। হামলাকারীরা কবর থেকে মরদেহ তুলে পুড়িয়ে দেয়। এতে অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হন। ঘটনার পর থেকে দরবারের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে এবং পরিবার ও অনুসারীরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।

মতাদর্শগত বিরোধই প্রধান কারণ:

মাকামের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অধিকাংশ হামলার পেছনে রয়েছে ধর্মীয় মতাদর্শগত বিরোধ। অনেক ক্ষেত্রে মাজারকে ‘শিরক’ বা ‘বেদাত’ আখ্যা দিয়ে হামলার পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। ঢাকা বিভাগের ৮০ শতাংশ এবং চট্টগ্রাম বিভাগের প্রায় ৯০ শতাংশ ঘটনায় প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

ঢাকা বিভাগের হামলাগুলোর মধ্যে নরসিংদীতে সর্বাধিক ১১টি, ঢাকায় ৯টি এবং নারায়ণগঞ্জে ৫টি ঘটনার প্রমাণ মিলেছে। এসব ঘটনায় নারীসহ অন্তত ১৮০ জন আহত এবং দুজন নিহত হয়েছেন। অনেক ঘটনায় মামলা বা তদন্তের অগ্রগতি না থাকায় হামলাকারীরা উৎসাহ পাচ্ছে বলে গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম বিভাগে সবচেয়ে বেশি হামলা হয়েছে কুমিল্লায়—১৭টি। এ ছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারেও হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার অধিকাংশই সংঘটিত হয়েছে কথিত ‘তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে।

প্রশাসনের অবস্থান:

পুলিশ সদরদপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন জানিয়েছেন, হামলার প্রতিটি ঘটনাকে অপরাধ হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে এবং মামলা ও গ্রেপ্তার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মত:

কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার বলেন, ভিন্ন মতকে দমন করার প্রবণতা ফ্যাসিবাদের লক্ষণ। তাঁর মতে, এ দেশের ইসলামী ঐতিহ্য পীর-আউলিয়াদের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে, আর এই বৈচিত্র্যই ইসলামের শক্তি। তিনি মনে করেন, সরকার প্রয়োজনীয় কঠোরতা দেখাতে ব্যর্থ হওয়ায় এসব হামলা থামেনি।

অর্থনীতিবিদ ও শিক্ষক আনু মুহাম্মদ বলেন, এসব হামলা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং দীর্ঘদিনের পরিকল্পিত সহিংসতার অংশ। প্রশাসনিক দুর্বলতা ও জবাবদিহির অভাবই সহিংসতা অব্যাহত রাখছে।

আইনি উদ্যোগ:

রাসা সেন্টার ইতোমধ্যে মাজারে হামলার ঘটনায় হাইকোর্টে রিট দায়ের করেছে, যেখানে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫১০ কোটি টাকা উল্লেখ করা হয়েছে। এ সপ্তাহে রিটের শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে।

ধর্মীয় সংগঠনের প্রতিক্রিয়া:

হেফাজতে ইসলামের নায়েবে আমির মহিউদ্দিন রাব্বানী বলেন, তারা মাজার-দরবারকে শরিয়তসম্মত মনে না করলেও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার বিরোধিতা করেন। তাঁর মতে, হামলা ও ভাঙচুরকে ইসলাম সমর্থন করে না।

এই বিভাগের আরো খবর