‘আব্বু আমাকে নাও’—আগুনের মধ্যেই শেষ আর্তনাদ

তালাবদ্ধ ঘরে আগুন, পুড়ে মারা গেল ৭ বছরের শিশু

লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি :

ভয়াবহ এক নৃশংসতার সাক্ষী হলো লক্ষ্মীপুরের একটি গ্রাম। গভীর রাতে ঘরের দরজায় তালা লাগিয়ে পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় একটি পরিবারকে পুড়িয়ে মারার উদ্দেশ্যে। সেই আগুনে প্রাণ হারিয়েছে মাত্র সাত বছর বয়সী শিশু আয়শা আক্তার।

শনিবার ভোরে লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার ভবানীগঞ্জ ইউনিয়নের চরমনসা গ্রামের সুতারগোপ্তা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, পোড়া একটি ঘরের সামনে মানুষের ভিড়। চারদিকে ছড়িয়ে আছে শোক আর ক্ষোভ।

স্থানীয়রা জানান, শুক্রবার দিবাগত রাত আনুমানিক দুইটার দিকে ঘরের ভেতরে থাকা অবস্থায় আগুন লাগে। আগুন ও ধোঁয়ার তীব্রতায় ঘুম ভেঙে যায় পরিবারের সদস্যদের। কিন্তু বের হওয়ার সব পথ তখন বন্ধ—দুই দরজায় লাগানো ছিল তালা।

ঘরের ভেতর আটকে পড়ে ছোট্ট আয়শা। আগুনে জ্বলতে জ্বলতে সে চিৎকার করছিল,

‘আব্বু আমাকে নাও, আমাকে নাও।’

চোখের সামনে সন্তানের এমন আর্তনাদ শুনেও কাছে যেতে পারেননি বাবা-মা।

আয়শার মা নাজমা বেগম বলেন, আগুন লাগার পর বড় দুই মেয়েকে কোনোমতে টিনের ফাঁক দিয়ে বের করা সম্ভব হয়। কিন্তু ছোট মেয়েটিকে আর উদ্ধার করা যায়নি। তিনি বলেন,

“আমার চোখের সামনেই মেয়েটা পুড়ে গেল। আমি কিছুই করতে পারলাম না।”

এই ঘটনায় গুরুতর দগ্ধ হয়েছেন আয়শার দুই বোন—১৭ বছর বয়সী বীথি আক্তার ও ১৪ বছর বয়সী স্মৃতি আক্তার। তাঁদের উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে পাঠানো হয়েছে।

আহত বাবা বেলাল হোসেন লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তিনি স্থানীয়ভাবে একজন ব্যবসায়ী এবং ভবানীগঞ্জ ইউনিয়নের বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর সহসাংগঠনিক সম্পাদক।

বেলাল হোসেন জানান, দুর্বৃত্তরা পরিকল্পিতভাবে দরজায় তালা লাগিয়ে বাইরে থেকে পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় আর ঘরে ঢোকা সম্ভব হয়নি।

প্রতিবেশীরা জানান, আগুন এতটাই ভয়াবহ ছিল যে কেউ কাছে যেতে পারেননি। মুহূর্তেই ঘরটি আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায়।

জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হাছিবুর রহমান বলেন,

“এটি পরিকল্পিত সন্ত্রাসী হামলা। জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।”

এ বিষয়ে লক্ষ্মীপুর সদর মডেল থানা-এর ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. ওয়াহিদ পারভেজ বলেন,

“ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মান্তিক। এটি পরিকল্পিত নাশকতা কি না—সব দিক বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত চলছে।”

শনিবার বিকেলে পারিবারিক কবরস্থানে শিশু আয়শার দাফন সম্পন্ন হয়। হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়ে মেয়ের জানাজায় অংশ নেন শোকার্ত বাবা বেলাল হোসেন। তিনি বলেন,

“আমার মেয়েকে যারা পুড়িয়ে মারল, তাদের বিচার চাই। অন্তত আমার সন্তানের হত্যার ন্যায়বিচার হোক।”

এই বিভাগের আরো খবর