সময়ের চিত্র ডেস্ক :
আজ ১৬ ডিসেম্বর—মহান বিজয় দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পর স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। বিশ্বের মানচিত্রে যুক্ত হয় একটি নতুন রাষ্ট্র—বাংলাদেশ।
দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এবং প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস পৃথক বাণীতে জাতির প্রতি শুভেচ্ছা ও প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তার বাণীতে বলেন, স্বাধীনতার প্রকৃত সুফল জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে হবে। ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং ঐক্যের চর্চা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
অন্যদিকে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, এবারের বিজয় দিবস যেন জাতীয় জীবনে নতুন করে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার উপলক্ষ হয়। মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে জনগণের ক্ষমতায়ন এবং গণতান্ত্রিক উত্তরণের যে নতুন যাত্রা শুরু হয়েছে, তা রক্ষার শপথ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
ঐতিহাসিকভাবে মুক্তিযুদ্ধের বীজ রোপিত হয়েছিল ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। সেই ধারাবাহিক সংগ্রামের চূড়ান্ত রূপ নেয় ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে। নয় মাসের সেই যুদ্ধে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশের মানুষ আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অসম সাহসে লড়াই করে। প্রায় ৩০ লাখ শহিদের আত্মত্যাগ ও অসংখ্য মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত হয় বিজয়।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মম গণহত্যার মধ্য দিয়ে শুরু হয় সশস্ত্র প্রতিরোধ। সেই রাতেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে জাতিকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানান। সীমিত প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র নিয়ে বাঙালি যোদ্ধারা জীবন বাজি রেখে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। অবশেষে ১৬ ডিসেম্বর আসে চূড়ান্ত বিজয়।
স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে বিশিষ্টজনেরা নানা মত প্রকাশ করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর মতে, মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী রাজনৈতিক প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থতার কারণে জাতীয়তাবাদের চ্যালেঞ্জ এখনো বিদ্যমান।
অর্থনীতিবিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সংগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। জনগণের প্রকৃত মুক্তির জন্য বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা ও সক্রিয় নাগরিক অংশগ্রহণ অপরিহার্য।
তবে সব আলোচনা ও বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে আজ জাতি গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছে মুক্তিযুদ্ধে শহিদ হওয়া বীর সন্তানদের। সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে ভোর থেকেই ফুলে ফুলে ভরে উঠছে শ্রদ্ধার বেদি।
দিবসটি উপলক্ষে আজ সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। সব সরকারি-বেসরকারি ভবনে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় আলোকসজ্জা করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা।
জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদপত্রগুলো বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করেছে। মসজিদ, মন্দির, গির্জা ও অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে দেশের শান্তি ও অগ্রগতি কামনায় বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হয়েছে।
রাজধানীসহ সারা দেশে বিজয়ের গান, পতাকা মিছিল ও সাংস্কৃতিক আয়োজনে মুখর হয়ে উঠেছে জনপদ। রাষ্ট্রপতি ও প্রধান উপদেষ্টা সকালে জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। এরপর বীর মুক্তিযোদ্ধা, শহিদ পরিবার, বিদেশি কূটনীতিক, রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠনগুলো শ্রদ্ধা জানাবে।
বিজয় দিবস উপলক্ষে বিএনপি, জাসদ, এনসিপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং শ্রমজীবী, পেশাজীবী ও সাংস্কৃতিক সংগঠন নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। শিল্পকলা একাডেমি, বাংলা একাডেমি, জাতীয় জাদুঘর, শিশু একাডেমি ও ছায়ানটসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দিনব্যাপী অনুষ্ঠান আয়োজন করেছে।
মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে জাতি আজ আবারও প্রত্যয় ব্যক্ত করছে—স্বাধীনতার চেতনায় ঐক্যবদ্ধ হয়ে একটি গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার।