জ্বালানি সংকটে বিদ্যুৎ সরবরাহে ভয়াবহ বিপর্যয়

মধ্যরাতে লোডশেডিং ৩৫৯৫ মেগাওয়াট

সময়ের চিত্র ডেস্ক:

গ্যাস, কয়লা ও জ্বালানি তেলের সংকটের পাশাপাশি কয়েকটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইউনিট বন্ধ থাকায় দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে উঠেছে। তীব্র গরমের মধ্যে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে জনজীবন, শিল্প উৎপাদন ও কৃষির সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির (পিজিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, রবিবার গভীর রাতে লোডশেডিং ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছে। রাত ২টায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৮০৯ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ করা হয় ১৩ হাজার ২১৪ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি দাঁড়ায় ৩ হাজার ৫৯৫ মেগাওয়াটে।

পরদিন সোমবার দুপুর ১টায়ও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। ওই সময় ১৬ হাজার ২৪২ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ১৩ হাজার ৩৩৮ মেগাওয়াট। অর্থাৎ ২ হাজার ৯০৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ঘাটতি ছিল, যা মোট চাহিদার প্রায় ১৮ শতাংশ।

ঘণ্টায় ঘণ্টায় বাড়ছে-কমছে লোডশেডিং

পিজিসিবির হিসাব বলছে, সোমবার রাত ১টায় লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার ৪২৭ মেগাওয়াট। রাত ২টায় তা বেড়ে ৩ হাজার ৫৯৫ মেগাওয়াটে ওঠে। ভোরের দিকে কিছুটা কমলেও সকাল ৬টায় ঘাটতি ছিল ২ হাজার ২৫৫ মেগাওয়াট।

সকাল ৯টায় লোডশেডিং নেমে আসে ১ হাজার ৯৬৭ মেগাওয়াটে এবং সকাল ১১টায় দাঁড়ায় ১ হাজার ৪৪৫ মেগাওয়াটে। কিন্তু দুপুর ১২টার দিকে পরিস্থিতির আবার অবনতি হয়। মাত্র এক ঘণ্টায় লোডশেডিং বেড়ে ৩ হাজার ১০১ মেগাওয়াটে পৌঁছে।

রাত ১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত হিসাব করলে প্রতি ঘণ্টায় গড়ে প্রায় ২ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ ঘাটতি ছিল। ফলে বিতরণ কোম্পানিগুলোও অনেক এলাকায় নির্দিষ্ট সূচি অনুযায়ী লোডশেডিং পরিচালনা করতে পারছে না।

এক দিনেই ঘাটতি ৭ কোটি ইউনিটের বেশি

রবিবারও সারাদিন বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল ব্যাপক। পিজিসিবির জাতীয় লোড ডেসপাচ সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, বিকেল ৩টায় উৎপাদন ছিল ১৩ হাজার ৫১৪ মেগাওয়াট। তখন লোডশেডিং করা হয় ৩ হাজার ৬৯২ মেগাওয়াট।

সন্ধ্যার দিকে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন বাড়ানো হলে পরিস্থিতি কিছুটা সামলে ওঠে। রাত ৯টায় উৎপাদন সর্বোচ্চ ১৫ হাজার ৮২৯ মেগাওয়াটে পৌঁছালেও ওই সময় চাহিদা ছিল ১৮ হাজার ৩৩০ মেগাওয়াট। ফলে ২ হাজার ৩৯৩ মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হয়।

দিন শেষে উৎপাদন দাঁড়ায় ৩৪ কোটি ৪৫ লাখ ইউনিট। বিপরীতে মোট চাহিদা ছিল প্রায় ৪১ কোটি ৬০ লাখ ইউনিট। ফলে এক দিনে ৭ কোটি ১৫ লাখ ইউনিটের বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হয়নি। ঘাটতির পরিমাণ ছিল মোট চাহিদার প্রায় ১৭ শতাংশ।

গ্যাসের ঘাটতিই বড় বাধা

বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্যতম প্রধান জ্বালানি গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি জটিল হয়েছে। দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা ১২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও গ্যাস সংকটে এসব কেন্দ্র থেকে অনেক কম বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে।

পেট্রোবাংলার হিসাবে, দেশে প্রতিদিন প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন হয়। রবিবার সন্ধ্যায় জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ ছিল ২৩২ কোটি ২০ লাখ ঘনফুট। অর্থাৎ ঘাটতি প্রায় ১৪৮ কোটি ঘনফুট বা ৩৯ শতাংশ।

মহেশখালীর এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় গ্যাস সংকট আরও তীব্র হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতে। গ্যাসের অভাবে ঘোড়াশাল, সিদ্ধিরগঞ্জ, মেঘনাঘাট ও আশুগঞ্জের একাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পুরোপুরি বা আংশিকভাবে বন্ধ রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন এলএনজি কার্গো এলে সেপ্টেম্বরের প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহে গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বাড়তে পারে। তবে একটি কার্গো দিয়ে বর্তমান বড় ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ করা সম্ভব নয়।

কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রেও উৎপাদন কম

দেশের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মোট উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৮ হাজার ৪২৩ মেগাওয়াট। কিন্তু জ্বালানি সংকট ও বিভিন্ন ইউনিট বন্ধ থাকায় উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট।

পায়রা ও মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি করে ইউনিট বন্ধ থাকায় অন্তত ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা ব্যবহার করা যাচ্ছে না। রামপাল ও পটুয়াখালীর আরএনপিএল কেন্দ্রেও কয়লার মজুত কম থাকায় পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন হচ্ছে না। বড়পুকুরিয়ার একটি ইউনিটও রক্ষণাবেক্ষণের কারণে বন্ধ রয়েছে।

এদিকে ভারতের ঝাড়খণ্ডে আদানি পাওয়ারের ১ হাজার ৪৭০ মেগাওয়াট কেন্দ্র থেকেও পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। রবিবার সেখানে থেকে প্রায় ১ হাজার ১১১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ এসেছে। পাশাপাশি বন্যার কারণে নেপাল থেকে ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানিও বন্ধ রয়েছে।

তেলচালিত কেন্দ্র বাড়িয়েও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত ফল

গ্যাস ও কয়লার ঘাটতি মোকাবিলায় তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। গত এক সপ্তাহে এসব কেন্দ্রের জন্য বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) অন্তত ২০ হাজার টন ফার্নেস অয়েল সরবরাহ করেছে, যা নির্ধারিত সরবরাহের প্রায় দ্বিগুণ।

দেশে ফার্নেস অয়েলচালিত কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা ৫ হাজার ৬০০ মেগাওয়াটের বেশি। তবে জ্বালানি সংকটে ২৮টি কেন্দ্র পুরোপুরি বা আংশিকভাবে বন্ধ রয়েছে। দিনের বড় অংশে এসব কেন্দ্র থেকে ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে।

তবে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ বেশি হওয়ায় দীর্ঘ সময় এভাবে সংকট মোকাবিলা করা কঠিন। পিজিসিবির তথ্য অনুযায়ী, রবিবার বিদ্যুতের গড় উৎপাদন ব্যয় ছিল প্রতি ইউনিট ৭ টাকা ৭৪ পয়সা। তেলভিত্তিক উৎপাদন বাড়লে ব্যয় আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

রাজধানীর অভিজাত এলাকাতেও লোডশেডিং

বিদ্যুৎ ঘাটতির প্রভাব এখন রাজধানীর তুলনামূলক গুরুত্বপূর্ণ ও অভিজাত এলাকাগুলোতেও পড়েছে। গুলশান, বনানী, বারিধারা, বসুন্ধরা, ধানমন্ডি, বেইলি রোড ও উত্তরার বিভিন্ন এলাকায় দিনে কয়েক দফা বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

মিরপুর, মোহাম্মদপুর, মগবাজার, বাড্ডা, রামপুরা, পুরান ঢাকা, শ্যামলী ও যাত্রাবাড়ীর অনেক এলাকায় দিনে পাঁচ থেকে ছয়বার পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হচ্ছে বলে জানিয়েছেন গ্রাহকেরা। কখনো আধা ঘণ্টা, আবার কখনো এক ঘণ্টার বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকছে না।

বিদ্যুৎ না থাকায় বাসাবাড়ির পানির পাম্প, ফ্রিজ, ফ্যান ও বৈদ্যুতিক চুলা চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। গ্যাসের নিম্নচাপের কারণে যারা বৈদ্যুতিক চুলায় রান্না করছিলেন, তারাও এখন সমস্যায় পড়েছেন। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা এবং অনলাইনে কাজও ব্যাহত হচ্ছে।

শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের ক্ষোভ

বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটে সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছে বস্ত্র, ডায়িং, সিরামিক, ইস্পাতসহ বিভিন্ন জ্বালানিনির্ভর শিল্প। নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার কয়েকটি ডায়িং কারখানায় গ্যাস সংকটে উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে। নরসিংদীর মাধবদীতেও বহু কারখানা সীমিত পরিসরে চলছে।

উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় চাকরি ও বেতন নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে শ্রমিকদের মধ্যে। রবিবার মাধবদীতে বিভিন্ন কারখানার প্রায় ৫ হাজার শ্রমিক পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কার্যালয় ঘেরাও করেন। একই সঙ্গে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক অবরোধ করায় সেখানে যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটে।

দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা কম

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বিদ্যুৎ সংকটের পেছনে একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়া, কয়লার মজুত সংকট, ফার্নেস অয়েলের সীমিত সরবরাহ এবং বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়েকটি ইউনিট বন্ধ থাকা—সব মিলিয়েই পরিস্থিতি জটিল হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সেপ্টেম্বরের শুরুতে এলএনজি সরবরাহ বাড়লে কিছুটা স্বস্তি মিলতে পারে। তবে পায়রা ও মাতারবাড়ীর বন্ধ ইউনিট দ্রুত চালু করা, কয়লা ও তেলের পর্যাপ্ত মজুত নিশ্চিত করা এবং গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো না গেলে লোডশেডিং দ্রুত সহনীয় পর্যায়ে নামানো কঠিন হবে।

এর সঙ্গে তীব্র গরম অব্যাহত থাকলে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ে সংকট আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

 

এই বিভাগের আরো খবর