সময়ের চিত্র রিপোর্ট:
কক্সবাজারে সরকারি খোলা বাজারে খাদ্যশস্য বিক্রয় (ওএমএস) কর্মসূচিতে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও কালোবাজারির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, দরিদ্র মানুষের জন্য ভর্তুকিমূল্যে বরাদ্দকৃত চাল ও আটা ওএমএস নীতিমালা উপেক্ষা করে প্রকাশ্যেই কালোবাজারে বিক্রি করা হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, কক্সবাজারের কিছু অসাধু ডিলার খাদ্য বিভাগের অসাধু কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে গড়ে তুলেছেন কালোবাজারি সিন্ডিকেট। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী নিম্নআয়ের মানুষ প্রতি কেজি চাল ৩০ টাকা এবং আটা ২৪ টাকায় কেনার সুযোগ পাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে অধিকাংশ মানুষ সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, কক্সবাজারের বিভিন্ন ওএমএস পয়েন্টে সাধারণ মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও খালি হাতে ফিরছেন। অনেক ক্ষেত্রে ডিলাররা “মাল শেষ” কিংবা “বরাদ্দ কম এসেছে” অজুহাতে ক্রেতাদের ফিরিয়ে দিচ্ছেন। অথচ একই সময়ে পেছনের দরজা দিয়ে কিংবা গুদাম থেকে সরকারি চাল ও আটা বেশি দামে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সরকারি সিলযুক্ত ওএমএসের বস্তা থেকে চাল ও আটা বের করে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের প্লাস্টিক বা চটের বস্তায় ভরে বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে। পরে সেগুলো সাধারণ বাণিজ্যিক পণ্য হিসেবে খুচরা ও পাইকারি বাজারে উচ্চমূল্যে বিক্রি করা হয়। এতে সরকার যে উদ্দেশ্যে বিপুল ভর্তুকি দিচ্ছে, তার সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন হতদরিদ্র ও শ্রমজীবী মানুষ।
গত ১৩ এপ্রিল দুপুরে ঝাউতলা মোড় এলাকায় ওএমএস ডিলার তপন কান্তি দাসের দোকানে গিয়ে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। তবে দোকানের ভেতরে অবিক্রিত চাল ও আটার মজুত দেখা যায়। এ সময় সংবাদকর্মীরা ডিলারকে ফোন করলে তিনি সন্তোষজনক কোনো জবাব দিতে পারেননি। পরে উপজেলা ও জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রককে বিষয়টি জানানো হলে তারা ঘটনাস্থলে এসে অনিয়মের সত্যতা পেয়ে দোকানটি সিলগালা করেন।
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক জানান, জেলা প্রশাসকের সঙ্গে আলোচনা করে সংশ্লিষ্ট ডিলারের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কক্সবাজারের অধিকাংশ ওএমএস দোকানে সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত এনআইডি কার্ডের মাধ্যমে সীমিত সময় চাল ও আটা বিক্রি করা হয়। এরপর আর কাউকে পণ্য দেওয়া হয় না। এতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পরও সাধারণ মানুষ খালি হাতে ফিরে যান। অনেক সময় ক্রেতাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করার অভিযোগও রয়েছে।
তাদের দাবি, নির্ধারিত সময়ে বিক্রি না হওয়া পণ্য রাতের আঁধারে কালোবাজারে বিক্রি করা হয়।

এদিকে, কক্সবাজার উপজেলা গেইট এলাকার ওএমএসের ডিলার আবুল কাসেম গুদামে চাল ও আটা অবৈধভাবে বিক্রির তথ্য পেয়ে শুক্রবার (১৫ এপ্রিল) বিকেল ৫টার দিকে সংবাদকর্মীরা সেখানে যান। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ১৪ এপ্রিলের অবিক্রিত ৮ বস্তা আটা ও ৪৮ বস্তা চাল গুদামে মজুত রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট তদারকি কর্মকর্তারা এসব অবিক্রিত পণ্যের বিষয়ে অবগত নন বলে জানা যায়। এমনকি অবিক্রিত চাল-আটার সমন্বয় সংক্রান্ত কোনো বৈধ কাগজপত্রও দেখাতে পারেননি ডিলার বা তার প্রতিনিধিরা। অভিযোগ রয়েছে, পূর্বের দিনের অবিক্রিত আটা ৩৬ টাকা কেজি দরে বিক্রি করা হচ্ছিল।

এ বিষয়ে সংবাদকর্মীরা ইউএনও, জেলা খাদ্য কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ট্যাগ অফিসারকে অবহিত করেন। তবে সরকারি ছুটির দিন হওয়ায় তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি। পরে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের পরামর্শে সাংবাদিকরা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করেন।
খবর পেয়ে সদর থানার এএসআই বিকাশ সঙ্গীয় ফোর্স নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে অভিযোগের সত্যতা পান। পরে এসআই আব্দুল্লাহ আল হাসান ঘটনাস্থলে এসে তদন্ত করেন। তদন্তে সরকারি পণ্য অনৈতিকভাবে বিক্রি ও পাচারের চেষ্টার প্রমাণ পাওয়ায় চাল ও আটা জব্দ করা হয় এবং ইউসুফ ও রাশেদুল নামে দুই কর্মচারীকে আটক করা হয়।

পরে আটক ব্যক্তিদের ছাড়িয়ে নিতে একটি পক্ষ মব করে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে।
এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট এস আইর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সুপারকে অবহিত করা হলে তার নির্দেশনায় পরবর্তীতে আটক দুই কর্মচারীকে ছেড়ে দেওয়া হয় এবং গুদামটি পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জেলা খাদ্য অফিস, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে বিষয়টি তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
এদিকে স্থানীয় সচেতন মহল অবিলম্বে জেলা প্রশাসন ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কঠোর হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন। তারা অবৈধ মজুত, কালোবাজারি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা, অভিযুক্ত ডিলারদের লাইসেন্স বাতিল এবং জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান।
এ বিষয়ে জেলা খাদ্য কর্মকর্তার সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “যদি কেউ অন্যায় করে থাকে, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আজ সরকারি ছুটির দিন। বিষয়টি নিয়ে রোববার সিদ্ধান্ত জানানো হবে।”