দেওভোগ হাজী উজির আলী বিদ্যালয়ের

সাবেক প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ

ইসমাইল হোসেন :

নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার কাশিপুর বাংলাবাজারের দেওভোগ হাজী উজির আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের পদত্যাগকারী প্রধান শিক্ষক মো. হুমায়ুন কবীরের বিরুদ্ধে বহুমাত্রিক দুর্নীতি, অর্থ- অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার, জালিয়াতি ও নিয়োগ- বাণিজ্যের ২২টি গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বিদ্যালয়ের ৫১ জন শিক্ষক- কর্মচারীর স্বাক্ষরিত একটি স্মারকলিপি জেলা প্রশাসকের কাছে দাখিল করা হলে বিষয়টি নতুনভাবে সামনে আসে।

 

শিক্ষক–কর্মচারীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয়টি যেন দুর্নীতির অভয়ারণ্য-তে পরিণত হয়েছে। তারা দাবি করেন, চলমান তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই অদৃশ্য প্রভাবের কারণে পদত্যাগকারী এই প্রধান শিক্ষককে পুনর্বহালের চেষ্টা চলছে, যা তাদের কাছে উদ্বেগজনক।

 

স্মারকলিপি অনুযায়ী, ২০২৪ সালে অষ্টম থেকে দশম শ্রেণির ১,৬০৭ শিক্ষার্থীর কাছ থেকে আদায়কৃত ১ লাখ ৬০ হাজার ৭০০ টাকা বিদ্যালয়ের হিসাবখাতায় জমা হয়নি। শিক্ষকরা দাবি করেন, টাকা সরাসরি প্রধান শিক্ষক সংগ্রহ করলেও তা ব্যাংকে জমা দেওয়া হয়নি। বিদ্যালয়ের দক্ষিণ পাশে নির্মিত ভবনের জন্য ২ কোটি ১০ লাখ ৪৩ হাজার ৫০০ টাকা উত্তোলন করা হলেও প্রায় ৩৯ লাখ টাকার ভাউচার অনুপস্থিত বলে জানানো হয়। কোনো টেন্ডার ছাড়াই তৎকালীন সভাপতি ও প্রধান শিক্ষকের যৌথ স্বাক্ষরে পুরো অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে।

 

শিক্ষকদের দাবি, এত বড় অঙ্কের ভাউচারহীন ব্যয় আত্মসাতের পর্যায়ে পড়ে। ভর্তি ফরম, অডিট ফি, কোচিং বাণিজ্য- বহুমুখী অনিয়ম নতুন ভর্তির ৭০০ ফরম থেকে তোলা ৭৭ হাজার টাকা তহবিলে জমা নেই। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে অডিট দেখিয়ে প্রতি শিক্ষক থেকে ১৫ হাজার করে ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা এবং খণ্ডকালীন শিক্ষকদের কাছ থেকে আরও ১ লাখ টাকা নেওয়া হয়। অভিযোগকারীরা জানান, কোনো অডিট রিপোর্ট বিদ্যালয়ে পৌঁছায়নি।

 

নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও বিদ্যালয়ের ভেতরে কোচিং বাণিজ্য পরিচালিত হয়েছে এবং শিক্ষক- শিক্ষার্থীদের এতে বাধ্য করা হয়েছে। ষান্মাসিক পরীক্ষার জন্য তোলা ২ লাখ ১৫ হাজার ৬৮৮ টাকার হিসাব প্রদর্শন করতে পারেননি প্রধান শিক্ষক- এমন অভিযোগ রয়েছে।

 

একজন শিক্ষক রুবল চন্দ্র সাহার কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া ২ লাখ ৯০ হাজার টাকা উপজেলা প্রশাসনের ৭৫ নম্বর হিসাবে জমা দেওয়া হয়েছে। চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগে সরাসরি অর্থ লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়েছে। অভিযোগে আরো রয়েছে- বিদ্যালয়ের রড, সিমেন্ট, বালি এবং অন্যান্য নির্মাণসামগ্রী প্রধান শিক্ষকের নিজ বাড়ির কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের এক চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী সাক্ষ্য দিয়েছেন বলে স্মারকলিপিতে উল্লেখ রয়েছে।

 

অভিযোগকারীদের দাবি- নিজের জন্য ১০% পিএফ নিলেও অন্যদের দিয়েছেন ৬%, ২১ মাস পিএফ বন্ধ ছিল,

শিক্ষকদের সাত বছরের ইনক্রিমেন্ট বন্ধ, নিজের বেতন ৭ হাজার টাকা বৃদ্ধি করেছেন। শিক্ষকদের অভিযোগ, নিষিদ্ধ সহায়ক বই বাধ্যতামূলক করে প্রতি বছর ১২-১৪ লাখ টাকা পর্যন্ত উত্তোলন করা হয়েছিল। কয়েক বছর মিলিয়ে এই অঙ্ক ৬০-৭০ লাখ টাকা ছাড়াতে পারে।

 

কেরানির পদ থেকে সহকারী শিক্ষক হওয়ার সময় রেজুলেশন কারসাজি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আবার তিন বছরের অভিজ্ঞতা না থাকলেও তিনি প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান। এমনকি তার বি.এড. সনদ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষকরা। ১৬ আগস্ট হুমায়ুন কবীর পদত্যাগ করার পর ইউএনও ২১ আগস্ট পদ শূন্য ঘোষণা করে সহকারী প্রধান শিক্ষক আলেয়া বেগমকে দায়িত্ব দেন। কিন্তু অভিযোগকারীরা বলছেন, তদন্ত শেষ হওয়ার আগে তাকে পুনর্বহালের অদৃশ্য তৎপরতা চলছে।

 

১৭ নভেম্বর ইউএনওর নির্দেশে অতিরিক্ত কৃষি অফিসারকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করে প্রতিবেদন দাখিল করবে।

 

শিক্ষক- কর্মচারীদের দাবি- ২২টি অভিযোগের সবকটিই গুরুতর। এগুলো আড়াল করার যে কোনো প্রচেষ্টা আমরা মেনে নেব না। তারা আশা করছেন, তদন্তের মাধ্যমে পুরো ঘটনার সত্যতা বেরিয়ে আসবে।

 

২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে ইউএনওর নির্দেশক্রমে অতিরিক্ত কৃষি অফিসারকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। অভিযোগকারীরা জানান—তদন্তে প্রায় সব অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলেও, পরবর্তীতে জমা দেওয়া প্রতিবেদনে অসামঞ্জস্য লক্ষ্য করা যায়।

 

তাদের অভিযোগ, বর্তমান ডিও ও ডিও অফিসের একাউন্ট্যান্ট বিপুল—হুমায়ুন কবীরকে পুনরায় স্বপদে বসানোর প্রচেষ্টায় সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন। এতে শিক্ষক–কর্মচারীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

 

শিক্ষক–কর্মচারীরা এবং নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন এলাকাবাসী বলেন- ২২টি অভিযোগের প্রতিটিই গুরুতর। এগুলো আড়াল করে কোনো প্রতিবেদনই আমরা মেনে নেব না।

 

তারা জানান, সত্য গোপন করা হলে তারা আইনি পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হবেন, এবং স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে পুরো ঘটনাটি প্রকাশ পাবে বলে আশাবাদী।

 

এ বিষয়ে পদত্যাগকারী প্রধান শিক্ষক মো. হুমায়ুন কবীরের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

এই বিভাগের আরো খবর