নিজস্ব প্রতিবেদক:
জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের সদস্য (প্রশাসন ও অর্থ) আলমগীর হুছাইনের বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্য, অতিরিক্ত জমি বরাদ্দ, প্লট-ফ্ল্যাটের দায়মুক্তিতে ঘুষ আদায়, টেন্ডারবিহীন ঠিকাদারি কাজ দেওয়া এবং ব্যক্তিগত দালাল চক্র গড়ে তোলাসহ নানান অভিযোগ উঠেছে।
গৃহায়ণের কর্মকর্তা-কর্মচারিরা এসব অভিযোগ প্রকাশ করেছেন।
দালাল সিন্ডিকেট ও সন্ধ্যাকালীন আড্ডা:
কর্মকর্তারা জানান, প্রশাসক আলমগীর হুছাইনের রয়েছে নিজস্ব দালাল চক্র, মাইন উদ্দিন, নিলয়, জয়নাল ও খায়রুল। অফিস শেষে সন্ধ্যার পর তিনি তাদের নিয়ে নিজের কক্ষে আড্ডায় বসেন। দালালদের মাধ্যমে নিয়োগ তদবির, প্লট-ফ্ল্যাটের দায়মুক্তি, ফাইল অগ্রগতি ও নানা কাজের বিপরীতে টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ আছে, অফিসের অর্থ লেনদেনের কাজ তার নির্দেশে সম্পন্ন করেন অফিস সহায়ক নজরুল ও ড্রাইভার মাসুদ।
ঘুষ না দিলে বদলি, টেন্ডার ছাড়াই বন্ধুকে কাজ :
ঢাকা অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের সহকারী পরিচালক একরামুল কবীর জানান, তার কাছ থেকে ঘুষ দাবি করা হলেও তিনি অসম্মতি জানালে সাত মাসের মাথায় তাকে সিলেটে বদলি করা হয়।
আরও অভিযোগ আছে, নরসিংদীর তার ঘনিষ্ঠ এক বন্ধুকে কোনো টেন্ডার ছাড়াই স্টেশনারি ও বিশ্ব বসতি দিবসের কাজ দেওয়া হয়েছে।
ফ্ল্যাট বরাদ্দে অনিয়ম ও অতিরিক্ত জমি বরাদ্দ:
২৫৩টি রেডি ফ্ল্যাটের দায়মুক্তি ও অনুমতি প্রদানের ক্ষেত্রেও ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে কনকচাঁপা প্রকল্পে স্বজনপ্রীতির ভিত্তিতে ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়া হয় বলে কর্মকর্তাদের অভিযোগ।
রূপনগর সরকারি হাউজিং এস্টেটে একটি সমবায় সংগঠনের আবেদন অনুযায়ী চাহিদার চেয়ে ৪.৮ শতাংশ বেশি জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে,যার মূল্য প্রায় ৫ কোটি টাকা বাড়তি বলে অভিযোগ।
একইভাবে, মিরপুর-১০ ব্লক-বি এলাকায় একটি বাণিজ্যিক প্লটের বিলম্ব ফি নিয়মমতে ২১ শতাংশ হওয়া সত্ত্বেও ১৬ শতাংশ দেখিয়ে কম আদায় করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
নিয়োগে অনিয়ম,১৬ জনের মধ্যে অর্ধেকই বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত:
জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের সহকারী স্থপতি, সহকারী পরিচালক, সহকারী প্রকৌশলীসহ ৭ ক্যাটাগরিতে ১৬ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগ আছে, নিয়োগ পাওয়া লোকজনের অন্তত অর্ধেকই প্রশাসক আলমগীর হুছাইনের ‘বিশেষ সুপারিশে’ নিয়োগপ্রাপ্ত।
কর্মকর্তারা জানান, উচ্চমান সহকারী লতিফা আক্তারের মেয়েকে সহকারী স্থপতি হিসেবে নিয়োগ দিতে ‘মিষ্টি খাওয়ানোর’ নামে প্রায় ৭ লাখ টাকার চুক্তি হয়।
আরও ৬০ জন নিয়োগে রমরমা বাণিজ্যের অভিযোগ:
১৩তম থেকে ২০তম গ্রেডের ১১টি পদে ৬০ জন নতুন নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। এমসিকিউ পরীক্ষার পর ভাইভা নিচ্ছে বোর্ড, যেখানে প্রশাসক নিজে উপস্থিত। অভিযোগ উঠেছে—ভাইভা বোর্ডে তিনি তার পরিচিতদের বিশেষ সুবিধা দিচ্ছেন এবং নিয়োগ ঘিরে বাণিজ্য চলছে।
বদলি ও পোস্টিংয়েও লেনদেনের অভিযোগ, দুদকে লিখিত অভিযোগ:
ঢাকার পদে পোস্টিং পেতে লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে। কয়েকজন ভুক্তভোগী এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের বক্তব্য :
জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের সদস্য (প্রশাসন ও অর্থ) আলমগীর হুছাইন বলেন,“আমি ভাইভা বোর্ডে আছি, এখন সব বলা সম্ভব নয়। আপনার প্রশ্নগুলো লিখে পাঠান।”
পরবর্তীতে লিখিতভাবে অভিযোগ জানালে তিনি জানান, “এসব অভিযোগ পুরোপুরি মিথ্যা এবং কাল্পনিক।”
উচ্চমান সহকারী লতিফা আক্তার তার মেয়ের নিয়োগ প্রসঙ্গে বলেন, “আমি হার মানতে চাইনি বলে মেয়েকে যোগদান করিয়েছি, অন্যথায় চাকরি দেওয়ার ইচ্ছা ছিল না।”
জাতীয় গৃহায়ণের চেয়ারম্যান ফেরদৌসী বেগম বলেন, “সব নিয়োগ নিয়ম মেনেই হয়েছে। অনিয়মের কোনো সুযোগ নেই।”