শিপুফরাজী, চরফ্যাশন:
ভোলার চরফ্যাশন পৌরসভার শত কোটি টাকার মালিকানাধীন বেহাত জমি উদ্ধারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং পৌর প্রশাসক রাসনা শারমীন মিথি নোটিশ দিয়েছেন।
বিগত আওয়ামী শাসনামলে চরফ্যাশন শহরের পৌরসভার প্রায় ১৫ শতাংশ মূল্যবান জমি ক্ষমতার অপব্যবহার করে সাবেক সাংসদের অনুসারীরা দখল করে সেখানে মার্কেট নির্মাণ করে দীর্ঘদিন ব্যবসা চালিয়ে আসছিল। তবে ২৪ জুলাইয়ের পরিবর্তনের পর ওই দখলদাররা পালিয়ে গেলেও কিছু পুরনো ভূমিদস্যু নতুন পরিচয়ে ফের জমিগুলো দখল করে নিয়েছে। বর্তমানে পৌরসভার জমিতে নির্মিত ১২টি দোকান ও পুরো একটি মার্কেট তাদের দখলে রয়েছে।
এ ছাড়া পৌরসভার আরও বহু সম্পত্তি পুরনো ভূমিদস্যুদের হাত বদল হয়ে নতুন দস্যুদলের কব্জায় চলে গেছে। এ কারণে সরকারি সম্পত্তি উদ্ধারে স্থানীয় প্রশাসন দৃঢ় পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে দখলদাররা উল্টো পৌর প্রশাসক ও ইউএনওকে বেকায়দায় ফেলতে নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে।
সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, চরফ্যাশন শহরের থানা মসজিদ সংলগ্ন সোনালী পুকুরের দক্ষিণ পাড়ের পৌর জমি ফের দখল করে সেখানে ১২টি আধাপাকা টিনসেড দোকান নির্মাণ করা হয়েছে। এসব দোকান বর্তমানে গুদাম হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা ভাড়া নিয়ে ব্যবসা করছেন।
৫ আগস্টের আগে জমিটি আওয়ামী লীগ নেতাদের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও বর্তমানে অন্যদের দখলে রয়েছে।
পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, জমিটি সরকারি খাস সম্পত্তি হওয়ায় সুপ্রিম কোর্ট ২০১৪-১৫ অর্থবছরে জমিটি চরফ্যাশন পৌরসভার তত্ত্বাবধানে দেয়ার নির্দেশ দেন। পরবর্তীতে পৌরসভা নিজস্ব অর্থায়নে সেখানে আধুনিক কিচেন মার্কেট নির্মাণের উদ্যোগ নেয় এবং ৪৪ লাখ টাকার একটি প্রকল্পের টেন্ডার আহ্বান করে।
লটারির মাধ্যমে মেসার্স ইব্রাহীম ডাকুয়া এন্টারপ্রাইজ নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ৪২ লাখ ৪১ হাজার টাকায় কাজটি পায় এবং ১৫ জুন কার্যাদেশ জারি হয়। কিন্তু দখলদারদের কারণে এখনো কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি।
পৌর কর্তৃপক্ষ অবৈধ দখলদারদের একাধিকবার নোটিশ দিলেও তারা জমি ছাড়ছে না। বরং তারা উল্টো ৪৪ লাখ টাকার টেন্ডার লুটপাট হয়েছে বলে মিথ্যা প্রোপাগান্ডা ছড়াচ্ছে।
চরফ্যাশন বাজার ব্যবসায়ী সমিতির যুগ্ম আহ্বায়ক ও মুদি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. আব্দুস সাত্তার মিঠু বলেন, “এই পৌর জমিটি দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা ভাগাভাগি করে খেয়েছে। এখন দেশের পরিস্থিতি বদলানোর পর জমিটি অন্যদের দখলে গেছে।”
ঠিকাদার ইব্রাহীম ডাকুয়া বলেন, “টেন্ডার নিয়ে যে লুটপাটের অভিযোগ ছড়ানো হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। পৌরসভার বেহাত জমির অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ না হওয়ায় কাজ শুরু করা যাচ্ছে না। জমি বুঝিয়ে দিলে আমরা দ্রুত কাজ শুরু করবো।”
পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শামীম আহমেদ জানান, “সোনালী পুকুর পাড়ের জমিটি দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালীরা দখল করে অবৈধ স্থাপনা তৈরি করেছিল। আমরা এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টে রিট করেছিলাম। আদালত ২০১৪-১৫ অর্থবছরে জমিটি চরফ্যাশন পৌরসভার তত্ত্বাবধানে রাখার নির্দেশ দেন।” “অবৈধ দখলদারদের একাধিকবার নোটিশ দিয়েও কোনো ফল পাওয়া যায়নি। তাই উন্নয়নের স্বার্থে সেখানে আধুনিক কিচেন মার্কেট নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছি। ইউএনওর নেতৃত্বে সরকারি জমি উদ্ধারের প্রস্তুতি শেষ হয়েছে।”
চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক রাসনা শারমীন মিথি বলেন, “সোনালী পুকুর পাড়ের জমিটি পৌরসভার মালিকানাধীন। কিন্তু কিছু প্রভাবশালী মহল এটি বাজার সমিতির নামে দখলের চেষ্টা করছে।
আমরা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে সেখানে পৌরসভার অর্থায়নে একটি আধুনিক কিচেন মার্কেট নির্মাণ করবো।
যদি দ্রুত পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, জমিটি আবারও বেদখল হয়ে যাবে এবং পৌরসভা রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হবে।”
চরফ্যাশন পৌরসভার মালিকানাধীন শত কোটি টাকার জমি উদ্ধারে স্থানীয় প্রশাসন ও পৌরসভা দৃঢ় পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে দখলদারদের প্রতিরোধ এবং নানা ষড়যন্ত্রের কারণে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। সঠিক সময়ে অভিযান সম্পন্ন না হলে জমিটি ফের দখল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।