সময়ের চিত্র ডেস্ক:
চলতি বছরের প্রথম আট মাসে দেশে নিখোঁজের পর ৩৬ শিশুর মরদেহ উদ্ধারের তথ্য পাওয়া গেছে। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) পরিসংখ্যানে এ তথ্য উঠে এসেছে। একই সময়ে নিখোঁজ শিশুদের একটি অংশকে জীবিত উদ্ধার করা হলেও অনেক শিশুর পরিণতি হয়েছে মর্মান্তিক।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে দেশের বিভিন্ন থানায় ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ শিশু উদ্ধার হয়েছে অথবা নিজ নিজ পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে।
নিখোঁজের পর শিশুদের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা দেশের বিভিন্ন এলাকায় ঘটেছে। কারও মরদেহ পাওয়া গেছে মাটির নিচে, আবার কারও মরদেহ উদ্ধার হয়েছে নদী বা অন্য স্থান থেকে। এসব ঘটনার পাশাপাশি ধর্ষণের পর হত্যা, শারীরিক নির্যাতন এবং পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়ে শিশু মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে।
সম্প্রতি কুমিল্লায় নিখোঁজ হওয়ার পর ১৩ বছর বয়সী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এর আগে জামালপুরের মাদারগঞ্জে বিদ্যালয়ে যাওয়ার পর নিখোঁজ হয় সাত বছরের এক শিশু। পরে ১২ সেপ্টেম্বর তার সহপাঠীর বাড়ির মেঝেতে মাটিচাপা অবস্থায় মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
আসকের গণমাধ্যমভিত্তিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন ঘটনায় মোট ১৫৫ শিশুর মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে শারীরিক নির্যাতনে ৬৮, পারিবারিক পরিসরে নির্যাতনে ৪৯ এবং ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় ২৬ শিশু নিহত হয়েছে। ধর্ষণচেষ্টার পর হত্যা করা হয়েছে চার শিশুকে। এছাড়া গুলিতে তিনজন, গৃহকর্মী হিসেবে নির্যাতনের ঘটনায় দুজন এবং উত্ত্যক্তকারীর হাতে দুজন শিশু নিহত হয়েছে। অপহরণের পর হত্যার শিকার হয়েছে একজন।
এ ছাড়া আত্মহত্যা, রহস্যজনক মৃত্যু ও বিভিন্ন ঘটনায় মরদেহ উদ্ধারের ৯৯টি ঘটনাও আসকের হিসাবে রয়েছে।
চলতি বছরে পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে নিহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। গত ২৫ জুন লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে একটি ভাড়া বাসায় হামলার ঘটনায় এক নারী ও তার তিন মেয়েকে হত্যা করা হয়। নিহতদের মধ্যে ১০ বছর বয়সী এক শিশুও ছিল।
আগস্টে রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের সঙ্গে ১২ বছরের ছেলে আয়ুশও হত্যার শিকার হয়। একই মাসে মাদারীপুরের শিবচরে এক নারীর মরদেহ উদ্ধারের কয়েক দিন পর নদী থেকে তার এক বছর বয়সী সন্তানের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
সুনামগঞ্জের তাহিরপুরেও একই পরিবারের তিন শিশুর হত্যার ঘটনা ঘটে। ১৮ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে ১০, ৭ ও ২ বছর বয়সী তিন শিশুকে হত্যার তথ্য পাওয়া গেছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত দেশে ২ হাজার ৩৬২টি হত্যা মামলা হয়েছে। আট মাসের হিসাবে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ২৯৫টি হত্যা মামলা হয়েছে।
শিশুদের ওপর সহিংসতা ও হত্যার ঘটনায় আন্তর্জাতিকভাবেও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। গত ২২ মে বাংলাদেশে শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে ইউনিসেফ বিবৃতি দেয়। সংস্থাটি শিশুদের জন্য পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের সব পর্যায়ে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেয়।
শিশু সুরক্ষায় অভিযোগ গ্রহণের কার্যকর ব্যবস্থা, শিশুবান্ধব পুলিশি সেবা ও বিচারপ্রক্রিয়া, স্থানীয় পর্যায়ে সুরক্ষা এবং মানসিক-সামাজিক সহায়তা জোরদারের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরে ইউনিসেফ। পাশাপাশি স্কুল, মাদ্রাসা ও কর্মক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ফাতেমা রেজিনা ইকবাল মনে করেন, শিশুদের ওপর এ ধরনের সহিংসতা সমাজের জন্য গুরুতর উদ্বেগের বিষয়। তাঁর মতে, পরিবারের বাইরে কিংবা ভেতরে—কোথাও যেন শিশুদের নিরাপত্তা পুরোপুরি নিশ্চিত হচ্ছে না।
তিনি বলেন, শিশুদের বিরুদ্ধে অপরাধের পেছনে অপরাধীর মানসিকতা, পারিবারিক বিরোধ, প্রতিশোধ কিংবা বড়দের দ্বন্দ্বের প্রভাব থাকতে পারে। এসব অপরাধের দ্রুত তদন্ত ও বিচার এবং কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি অপরাধ প্রতিরোধেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।