বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প শুধু অর্থনীতির চালিকাশক্তি নয়, লাখো শ্রমিকের জীবিকার অবলম্বন। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৪% আসে এই খাত থেকে এবং প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক—যাদের বেশিরভাগই নারী-এই খাতে নিয়োজিত। তবে জলবায়ু সংকট মোকাবিলার বৈশ্বিক চাপ, নবায়নযোগ্য শক্তিতে রূপান্তরের চাহিদা এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের নতুন মানদণ্ডের মুখে তৈরি পোশাক শিল্প এখন এক কঠিন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। শ্রম আইন ও নীতির সংস্কার শূন্যতা এই সংকট আরো বাড়িয়েছে। প্রশ্ন উঠছে এই রূপান্তরে সংকট মোকাবিলায় কতটা প্রস্তুত বাংলাদেশ?
সিপিডির মতে, বাংলাদেশের পোশাক খাত বিশ্বে দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানিকারক। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে প্রায় ৪১ লাখ মানুষ নিয়োজিত যেখান থেকে প্রায় ৩২ বিলিয়ন ডলার আয় করে বাংলাদেশ। যা মোট রফতানির ৮৪ শতাংশের বেশি। ফলে সহজেই বোঝা যায় এই খাত বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
ইউনাইটেড নেশনস ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (ইউএনএফসিসিসি)র চুক্তি অনুসারে বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে তার বর্তমান শ্রীনহাউস গ্যাস নির্গমণের তুলনায় ১৫-২০ শতাংশ নির্গমণ কমাতে চুক্তিবদ্ধ। বৈশ্বিক তৈরী পোশাক শিল্প “ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি চার্টার ফর ক্লাইমেট অ্যাকশনের” আওতায় ২০৩০ সালের মধ্যে গ্রীনহাউস গ্যাস নিঃসরণ ৩০% কমানোর লক্ষ্য নিয়েছে সরকার। পোশাক প্রস্তুতকারী এবং রপ্তানিকারী শিল্প কারখানাগুলোর সংস্থা বিজিএমইএ ইতোমধ্যে ইউএনএফসিসিসির ফ্যাশন চার্টারের সঙ্গে ২০৩০ সাল নাগাদ পোশাক খাতের মোট গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন ৩০ শতাংশ কমিয়ে আনতে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকায় অনুষ্ঠিত তৈরি পোশাক শিল্পের এক অনুষ্ঠানে সুইডিশ ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট এজেন্সির (সিডা) মহাপরিচালক জ্যাকব গ্রানিট এ বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে জানান, বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য তৈরি পোশাক খাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তবে ইউরোপের কঠোর পরিবেশগত নীতিমালা মেনে চলতে হলে এ খাতকে অবশ্যই নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর করতে হবে। এই পরিবর্তন করা না গেলে, বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা কঠিন হয়ে পড়বে। উন্নয়ন সহযোগিরা বলছেন জাস্ট এনার্জি ট্রানজেকশন বা ন্যায্যতা ভিত্তিক শক্তির রূপান্তরের কথা।
জাস্ট এনার্জি ট্রানজিশন (JET) হলো পরিবেশবান্ধব ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে পরিবর্তনের এমন একটি নীতি ও প্রক্রিয়া, যেখানে শ্রমিক, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ওক্ষতিগ্রস্ত শিল্পগুলোর স্বার্থ সুরক্ষিত থাকে। এর মূল লক্ষ্য হলো জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াই করার পাশাপাশি শ্রমিকদের জীবিকা, সামাজিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সুযোগগুলো রক্ষা করা। এই রূপান্তরের পরিণতিতে কিছু অপ্রত্যাশিত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে তৈরি পোশাক শিল্প। অনেক কারখানায় অটোমেশন, নতুন মেশিন ও জ্বালানি শক্তির রূপান্তর চলছে। তবে বাংলাদেশে এই রূপান্তর সহজ নয়। তৈরি পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তাদের মতে, সৌরশক্তির জন্য বিশাল জায়গার প্রয়োজন, যা অনেক কারখানার নেই। এছাড়া প্রযুক্তি আমদানি ও স্থাপনে এককালীন ব্যয় অনেক বেশি। যা এই রূপান্তরকে বাধাগ্রস্ত করছে। অনেক তৈরি পোশাক শিল্পের মালিক সরকারের কাছে সহজ শর্তে ঋণ, ট্যাক্স ছাড় এবং প্রযুক্তিগত সহায়তার দাবি জানিয়েছেন।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক কাজ করেন, যার মধ্যে ৬০% নারী। নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার ফলে হাজার হাজার শ্রমিক চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা অনুমান করছেন, আগামী এক দশকে ১০-১৫% শ্রমিকের কর্মসংস্থান হ্রাস পেতে পারে। অধিকাংশ শ্রমিকেরই নতুন প্রযুক্তির সাথে কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা নেই। নারী শ্রমিকরা সাধারণত কম দক্ষ ও কম বেতনের কাজে নিয়োজিত। প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের ফলে তাদের চাকরি হারানোর ঝুঁকি বেশি। চাকরি হারানো শ্রমিকদের জন্য কোনো কার্যকর সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই। ফলে এই জ্বালানি রূপান্তরের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হচ্ছেন তৈরি পোশাক শ্রমিকরা।
তৈরি পোশাক শিল্পের শ্রমিকরা জানান “নতুন মেশিন আসায় লোক কম লাগছে। যদি আমরা নতুন প্রশিক্ষণ না পাই, তাহলে চাকরি থাকবে কি না জানি না।” সম্প্রতি গাজীপুরের একটি আধুনিক কারখানায় দেখা গেল, আগে যেখানে একটি ইউনিটে ৪০ জন শ্রমিক কাজ করতেন, এখন সেখানে আধুনিক মেশিনের মাধ্যমে মাত্র ২০ জনে সেই কাজ শেষ হচ্ছে।
বাংলাদেশ সরকার শ্রম আইনসহ জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন এবং নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার সংক্রান্ত বেশ কিছু নীতি, আইন ও কৌশলগত দলিল প্রণয়ন করেছেন। তবে সেগুলোতে “জাস্ট এনার্জি ট্রানজিশন” (ন্যায়সঙ্গত জ্বালানি রূপান্তর) বা শ্রমিক-কেন্দ্রিক রূপান্তরের দৃষ্টিভঙ্গি এখনো স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। বাংলাদেশের শ্রম আইন ২০০৬ (সংশোধিত ২০১৮)-তে ছাঁটাই ও ক্ষতিপূরণের কিছু বিধান থাকলেও, ‘জাস্ট এনার্জি ট্রানজিশন’-এর মতো কাঠামোগত পরিবর্তনের জন্য প্রাসঙ্গিক কোনও ধারা নেই। নেই চাকরি হারানো শ্রমিকদের জন্য পুনঃপ্রশিক্ষণ, পুনর্বাসন বা বিকল্প কর্মসংস্থানের বাধ্যবাধকতা। এমনকি শ্রমিক সুরক্ষার আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করা হচ্ছে না। ফলে দেখা যাচ্ছে, শ্রমিক ও কর্মসংস্থান বিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গি এখনও উপেক্ষিত রয়ে গেছে।
শিল্প সংক্রান্ত আরো বেশ কিছু আইন ও নীতি রয়েছে। ২০০৮ সালের জাতীয় নবায়নযোগ্য শক্তি নীতিতে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ১০% নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও, তৈরি পোশাক খাতের জন্য আলাদা কোনো দিকনির্দেশনা নেই। ২০০৯ সালের বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন কৌশল ও কর্মপরিকল্পনায় অভিযোজন, প্রশমন, গবেষণা ও সক্ষমতা উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, কিন্তু সেখানে “জাস্ট ট্রানজেকশন” ধারণাটি অনুপস্থিত, এবং শ্রমিক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কথা বলা হয়নি। জাতীয় শিল্প নীতি ২০১৬ ও কর্মসংস্থান নীতি ২০১৯ (ড্রাফট) অনুযায়ী পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ও মর্যাদাপূর্ণ কাজের কথা থাকলেও, সবুজ জ্বালানিতে রূপান্তরের ফলে কর্মসংস্থান ঝুঁকি ও শ্রমিক পুনঃপ্রশিক্ষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। ৮ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় সবুজ অর্থনীতি ও জলবায়ু অভিযোজনের উল্লেখ থাকলেও, তৈরি পোশাক খাতের রূপান্তর সংক্রান্ত কোনো পরিকল্পনা নেই। ফলে স্পষ্টভাবে বলা যায়, বর্তমান আইন ও নীতি কাঠামো তৈরি পোশাক শিল্পের রূপান্তরজনিত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত নয়। এই প্রেক্ষাপটে জরুরি হয়ে উঠেছে একটি মানবিক, বাস্তবসম্মত ও অংশগ্রহণমূলক “জাস্ট এনার্জি ট্রানজেকশন” কাঠামো প্রণয়ন। এটি বাস্তবায়নের জন্য আলাদা নীতি গ্রহণ, শ্রম আইন সংস্কার করে সবুজ প্রযুক্তির রূপান্তরজনিত চাকরি ঝুঁকি অন্তর্ভুক্ত করা, “ গ্রীন ট্রানজেকশন ফান্ড” গঠন করে শ্রমিক পুনঃপ্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি, জাতীয় কর্মসংস্থান নীতিতে “গ্রীন জব” ও “ক্লাইমেট রিসাইলেন্ট এমপ্লয়মেন্ট” বিষয়ক অধ্যায় যোগ করা উচিত। সর্বোপরি, কেবল কাগজে-কলমে নীতি নয়, সকল অংশীজনের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি সমন্বিত জাতীয় রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে, যেখানে নির্দিষ্ট করে উল্লেখ থাকবে কোন খাতে কত শ্রমিক চাকরি হারাতে পারেন, এবং তাদের কীভাবে স্থানান্তর করা হবে।
পোশাক শিল্প বাংলাদেশের বৃহত্তম রপ্তানি আয়কারী, যার ২০১৯-২০ অর্থবছরে রপ্তানির পরিমাণ ২৭.৯ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮৩% এই খাত থেকে আসে। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অংশ হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ প্রধান পোশাক আমদানিকারক দেশগুলো ২০৩০ সালের পর থেকে শুধুমাত্র পরিবেশবান্ধব লিড (LEED)সার্টিফাইভ কারখানায় উৎপাদিত পণ্য কিনবে বলে ঘোষণা দিয়েছে। আনন্দের সংবাদ হলো প্রতিযোগিতার এই দৌড়ে আমরা এগিয়ে আছি। সারা পৃথিবীর সাথে পাল্লা দিয়ে আমাদের অনেক কারখানা ইতোমধ্যেই সৌরবিদ্যুৎ, রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং ও LEED সনদ অর্জনের পথে এগিয়েছে। বিশ্বের শীর্ষ ১০০টি সর্বোচ্চ রেটিংপ্রাপ্ত LEED পরিবেশবান্ধব কারখানার মধ্যে ৬২টি বাংলাদেশে অবস্থিত। বর্তমানে যার মোট সংখ্যা ২৩০-এ দাঁড়ালো। সরকারের পক্ষ থেকেও অনেকগুলো ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। সরকার ইতোমধ্যেই “জাস্ট ট্রানজিশন নীতি ২০৩০” পরিকল্পনার খসড়া তৈরি করেছে। এই নীতির লক্ষ্য হলো কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত করা। ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড বিজিএমইএ এর সদস্যদের মধ্যে ২০২৬ সালের মধ্যে ৩০০ মেগাওয়াট ছাদ সৌর প্রকল্পের অর্থায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং পানি সম্পদ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান “বাংলাদেশের শিল্প খাতকে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থা থেকে নবায়নযোগ্য ও টেকসই জ্বালানির দিকে স্থানান্তরের জন্য সহায়তা করতে ব্যবসায়ী সমাজ ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
পরিশেষে বলা যায়, নবায়নযোগ্য শক্তিতে রূপান্তরের সঙ্গে শ্রমিকদের জীবিকা রক্ষার জন্য বাংলাদেশে মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি প্রয়োজন। শ্রমিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাস্তবভিত্তিক রোডম্যাপ তৈরির পাশাপাশি, ত্রিপক্ষীয় “ন্যাশনাল ট্রানজিশন কাউন্সিল” গঠনের উদ্যোগও জরুরি। জার্মানি, কানাডা ও দক্ষিণ কোরিয়ার অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, সামাজিক ন্যায্যতা নিশ্চিত করলেই রূপান্তর সফল হয়। বাংলাদেশকেও পরিবেশ সুরক্ষা ও শ্রমিক সুরক্ষার ভারসাম্য বজায় রেখে নবায়নযোগ্য শক্তিতে রূপান্তর নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায়, এই পরিবর্তন লাখো শ্রমিকের জীবিকার জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করবে এবং দেশের অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
লেখক: সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক সময়ের চিত্র।