হামের থাবায় দেশ, সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ঢাকা

গত দুই মাসে ঢাকা বিভাগে ২৪ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত ৬০১ জন, গত দুই সপ্তাহে রাজশাহীতে ১২ শিশু ও ময়মনসিংহে ৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

সময়ের চিত্র ডেস্ক:

দেশজুড়ে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে হাম (মিজলস) সংক্রমণ। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ঢাকা বিভাগে। রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় শিশুদের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এই সংক্রামক রোগ। বিভিন্ন হাসপাতালে বাড়ছে রোগী ভর্তি, বাড়ছে মৃত্যুও।

স্বাস্থ্য বিভাগ ও হাসপাতালসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, গত দুই মাসে শুধু ঢাকা বিভাগেই ৬০১ জন আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকায় সর্বোচ্চ ৩৯১ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে।

এছাড়া ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকায় ৬৯ জন, ঢাকা জেলায় ৩০ জন, নারায়ণগঞ্জে ৩১ জন, নারসিংদীতে ১৬ জন, গাজীপুরে ২০ জন আক্রান্ত হয়েছে।

পাশাপাশি কিশোরগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, শরীয়তপুর ও টাঙ্গাইলেও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে।

 

শিশুমৃত্যুতে উদ্বেগ:

গত আট সপ্তাহে ঢাকা বিভাগে অন্তত ২৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ২১ জন এবং সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ৩ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

অন্যদিকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও গত দুই সপ্তাহে ১২টির বেশি শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে।

রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জেও বাড়ছে ঝুঁকি:

রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে ২৬ মার্চ পর্যন্ত ৩৪২ জন সন্দেহভাজন হাম রোগীর তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ২৪৬ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ৭৭ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে।

বিশেষ করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, শিবগঞ্জ ও গোমস্তাপুরে শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ দ্রুত বাড়ছে। গত তিন মাসে সেখানে চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে প্রায় ৬০০ শিশু চিকিৎসা নিয়েছে।

ময়মনসিংহে ১২ দিনে ৫ শিশুর মৃত্যু:

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত ১২ দিনে হামে আক্রান্ত হয়ে পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে সেখানে ৭০ জন শিশু ভর্তি রয়েছে। হাসপাতালটিতে শিশুদের জন্য আইসিইউ না থাকায় জটিল রোগীদের চিকিৎসা আরও কঠিন হয়ে পড়ছে।

চট্টগ্রাম, সিলেট, পাবনাতেও চাপ :

চট্টগ্রামে বিভিন্ন হাসপাতালে অন্তত ২৪ শিশু ভর্তি রয়েছে।

সিলেটে শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালের একটি ইউনিটকে আইসোলেশন সেন্টার ঘোষণা করা হয়েছে।

পাবনা জেনারেল হাসপাতালেও বাড়তে থাকা রোগীর চাপ সামলাতে খোলা হয়েছে আলাদা হাম আইসোলেশন কর্নার।

রংপুর, খুলনা ও বরিশালেও শনাক্ত;

রংপুর বিভাগের আট জেলায় গত দুই সপ্তাহে ১১৬টি নমুনা পরীক্ষায় ৬ জনের হাম এবং ৪ জনের রুবেলা শনাক্ত হয়েছে।

এছাড়া ২৪ মার্চ পর্যন্ত খুলনায় ৯ জন এবং বরিশালে ৩৯ জন আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা:

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকাদান কার্যক্রমে ধারাবাহিকতা ব্যাহত হওয়ায় এই পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।

জ্যেষ্ঠ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. আবু জামিল ফয়সাল বলেন, দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য কর্মসূচি থেকে সরে গিয়ে স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনায় যাওয়ার কারণে টিকা সরবরাহ, অর্থায়ন ও মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমে ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

তার মতে, হামসহ টিকা প্রতিরোধযোগ্য রোগের এই বৃদ্ধি জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় সতর্কবার্তা।

যা জরুরি:

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিশেষজ্ঞরা বলছেন—

শিশুদের নিয়মিত টিকাদান নিশ্চিত করতে হবে,

টিকা না পাওয়া শিশুদের দ্রুত শনাক্ত করতে হবে,

হাসপাতালে আইসোলেশন ও জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থা বাড়াতে হবে,

অভিভাবকদের সচেতনতা বাড়াতে হবে,

সতর্কতা:

চিকিৎসকদের মতে, হামকে সাধারণ জ্বর বা ফুসকুড়ি ভেবে অবহেলা করা ঠিক নয়। সময়মতো চিকিৎসা না হলে এটি নিউমোনিয়া, অপুষ্টি, পানিশূন্যতা ও মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়াতে পারে, বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে।

 

 

 

 

 

এই বিভাগের আরো খবর