ইউরোপযাত্রা হলো মৃত্যুযাত্রা

গ্রিস উপকূলে নৌকাডুবি: ১৮ বাংলাদেশিসহ ২২ অভিবাসীর মৃত্যু

লিবিয়া থেকে ছেড়ে যাওয়া রাবারের নৌকায় ছয় দিন খাবার-পানি ছাড়া ভেসে ছিলেন যাত্রীরা জীবিত উদ্ধার ২৬ জন, আটক ২ সন্দেহভাজন পাচারকারী

সময়ের চিত্র ডেস্ক :

উত্তর আফ্রিকা থেকে সমুদ্রপথে ইউরোপে পাড়ি দেওয়ার চেষ্টায় আবারও প্রাণঘাতী ট্র্যাজেডির মুখে পড়লেন অভিবাসীরা। গ্রিসের উপকূলের কাছে একটি রাবারের নৌকায় অন্তত ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে, যাদের মধ্যে ১৮ জনই বাংলাদেশি বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। জীবিত উদ্ধার হওয়া যাত্রীরা এই তথ্য জানিয়েছেন।

গ্রিসের কোস্ট গার্ড জানিয়েছে, শুক্রবার ক্রিট দ্বীপের কাছাকাছি সমুদ্র এলাকা থেকে ২৬ জন অভিবাসীকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধারপ্রাপ্তদের মধ্যে একজন নারী ও একটি শিশুও রয়েছে।

প্রাথমিক তথ্যে জানা গেছে, নৌকাটি ২১ মার্চ পূর্ব লিবিয়ার তোবরুক বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করে। গন্তব্য ছিল গ্রিস হয়ে ইউরোপে প্রবেশ। কিন্তু মাঝসমুদ্রে প্রতিকূল আবহাওয়া, দিকভ্রান্তি, খাদ্য ও পানির তীব্র সংকট এবং শারীরিক অবসাদে যাত্রীরা এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে যান।

উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, টানা ছয় দিন সমুদ্রে ভেসে থাকার সময় একে একে অসুস্থ ও দুর্বল হয়ে পড়েন অনেকেই। পরে ২২ জনের মৃত্যু হয়। অভিযোগ উঠেছে, যাত্রাপথে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মরদেহ পাচারকারীদের নির্দেশে সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হয়।

তিন বাংলাদেশির পরিচয় মিলেছে:

এ পর্যন্ত নিহত বাংলাদেশিদের মধ্যে তিনজনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। তারা হলেন—

মুজিবুর রহমান (৪৫), রনারচর, দিরাই, সুনামগঞ্জ

মো. নুরুজ্জামান সর্দার ময়না (৩০), তারাপাশা, দিরাই, সুনামগঞ্জ, মো. সাহান (২৫) অন্যদের পরিচয় নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কাজ করছে।

উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে বাংলাদেশিরাই বেশি

উদ্ধারপ্রাপ্তদের তথ্য অনুযায়ী, জীবিতদের মধ্যে রয়েছেন,

২১ জন বাংলাদেশি, ৪ জন দক্ষিণ সুদানের নাগরিক, ১ জন চাদের নাগরিক।

এতে বোঝা যাচ্ছে, ইউরোপে অনিয়মিত অভিবাসনের ঝুঁকিপূর্ণ এই পথে এখনও বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি জীবন বাজি রেখে যাত্রা করছেন।

আটক ২ সন্দেহভাজন পাচারকারী:

ঘটনার পর দক্ষিণ সুদানের দুই সন্দেহভাজন মানবপাচারকারীকে আটক করেছে গ্রিক কর্তৃপক্ষ। তাদের বয়স ১৯ ও ২২ বছর।

তাদের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে অভিবাসন সহায়তা, মানবপাচার এবং অবহেলার কারণে মৃত্যুর অভিযোগে তদন্ত চলছে বলে জানা গেছে।

ক্রিটের দক্ষিণে উদ্ধার অভিযান:

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, নৌকাটি ক্রিটের দক্ষিণাঞ্চলের ইয়েরাপেত্রা শহর থেকে প্রায় ৫৩ নটিক্যাল মাইল দূরে অবস্থান করছিল। সেখান থেকেই উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা হয়।

উদ্ধার অভিযানে অংশ নেয় গ্রিসের কোস্ট গার্ড এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সীমান্ত ও উপকূলীয় নিরাপত্তা সংস্থা ফ্রন্টেক্স।

ভূমধ্যসাগরে বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল:

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (IOM) পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের প্রথম দুই মাসেই ভূমধ্যসাগরে প্রাণহানির সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।

জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি সময়ে ৫৫৯ জন অভিবাসীর মৃত্যু হয়েছে, যেখানে গত বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ২৮৭।

বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপে প্রবেশের পথ যত কঠিন হচ্ছে, পাচারচক্র তত বেশি ঝুঁকিপূর্ণ রুট ব্যবহার করছে। ফলে সমুদ্রপথে এমন প্রাণহানির ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে।

কঠোর হচ্ছে ইউরোপের অভিবাসন নীতি:

অভিবাসী প্রবাহ ঠেকাতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন সম্প্রতি তাদের নীতিতে আরও কঠোরতা এনেছে। নতুন করে ‘রিটার্ন হাব’ চালুর প্রস্তাবও অনুমোদন পেয়েছে।

তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, সীমান্তে কঠোরতা বাড়ালেও নিরাপদ ও মানবিক অভিবাসনব্যবস্থা নিশ্চিত না করলে এমন দুর্ঘটনা থামানো কঠিন হবে।

স্বপ্নভঙ্গের আরেক নাম ভূমধ্যসাগর:

দারিদ্র্য, বেকারত্ব, অনিশ্চয়তা আর উন্নত জীবনের আশায় প্রতি বছর হাজারো মানুষ উত্তর আফ্রিকা থেকে ইউরোপমুখী হন। কিন্তু সেই যাত্রাপথই অনেকের জন্য হয়ে ওঠে মৃত্যুর ফাঁদ।

গ্রিস উপকূলে সর্বশেষ এই ঘটনায় আবারও স্পষ্ট হলো—ইউরোপের স্বপ্ন অনেকের জন্য এখনো জীবন-মৃত্যুর জুয়া।

এই বিভাগের আরো খবর