সময়ের চিত্র ডেস্ক:
ঈদকে ঘিরে ঘরে ফেরার আনন্দ, স্বজনদের সঙ্গে মিলনের অপেক্ষা আর উৎসবের উচ্ছ্বাস—সবকিছুই যেন এবার ম্লান হয়ে গেছে একের পর এক দুর্ঘটনার মর্মান্তিক খবরে। সড়ক, নৌ ও রেলপথে যাত্রীচাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে প্রাণহানির সংখ্যাও। ঈদের ছুটির এই সময়জুড়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটেছে বহু দুর্ঘটনা, যার অনেকগুলোই ছিল ভয়াবহ।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ১৭ মার্চ থেকে ২৬ মার্চ ভোর পর্যন্ত সারা দেশে ৩৪২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৭৪ জন নিহত হয়েছেন। পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে যাত্রী চলাচল বাড়ার এই সময়ে দুর্ঘটনার হারও ছিল উদ্বেগজনক।
সংস্থাটির দেওয়া পরিসংখ্যান বলছে, গত বছরের ঈদুল ফিতরের ছুটিতে ১১ দিনে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছিলেন ২৪৯ জন। সেই তুলনায় এবার মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেড়েছে।
ঈদের ছুটির মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত দুর্ঘটনাগুলোর একটি ঘটে ২১ মার্চ দিবাগত রাতে কুমিল্লায়, যেখানে একটি বাসের সঙ্গে ট্রেনের সংঘর্ষে ১২ জন নিহত হন। এরপরও শোক কাটতে না কাটতেই ২৫ মার্চ রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ঘাটে পদ্মা নদীতে একটি বাস পড়ে গিয়ে ২৬ জনের মৃত্যু হয়। দুটি ঘটনাই দেশজুড়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।
এদিকে সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)-এর তথ্যেও দেখা গেছে, ১৭ মার্চ থেকে ২৩ মার্চ পর্যন্ত সাত দিনে ৯২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১০০ জন নিহত এবং ২১৭ জন আহত হয়েছেন।
সড়ক দুর্ঘটনার কারণ বিশ্লেষণে পুলিশের একটি গবেষণায় উঠে এসেছে, বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোই সবচেয়ে বড় ঝুঁকি, যা মোট দুর্ঘটনার প্রায় ৪২ শতাংশের জন্য দায়ী। পুলিশ সদর দপ্তরের ‘রিসার্চ, প্ল্যানিং অ্যান্ড ইনোভেশন’ বিভাগ ২০২৪ সালে সড়ক দুর্ঘটনা কমিয়ে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের কৌশল নিয়ে একটি গবেষণা পরিচালনা করে। এতে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চও যুক্ত ছিল।
গবেষণায় বলা হয়, ঈদের সময় সড়কে যানবাহনের চাপ বেড়ে যাওয়ায় দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বেড়ে যায়। এ কারণে উৎসবকেন্দ্রিক যাত্রী চলাচলের সময় সড়ক ব্যবস্থাপনায় বাড়তি নজরদারি ও সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছিল।
তবে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান মনে করেন, এবার সেই কার্যকর ব্যবস্থাপনার ঘাটতি ছিল স্পষ্ট। ২৬ মার্চ সন্ধ্যায় তিনি বলেন, দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে দেয় সড়ক ব্যবস্থাপনা কতটা দুর্বল ছিল। তার ভাষায়, যেটুকু নিয়ন্ত্রণ ছিল, সেটিও অনেক ক্ষেত্রে কার্যকরভাবে টেকেনি।
সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হিসাব অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান এবং আহত হন প্রায় ১০ হাজার মানুষ। তবে এই সংখ্যা মূলত গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে নির্ধারিত। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরবর্তী মৃত্যু বা অনিবন্ধিত অনেক ঘটনাই এই হিসাবের বাইরে থেকে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্ঘটনার মূল কারণগুলো নিয়ে বহু গবেষণা ও পর্যালোচনায় স্পষ্ট তথ্য উঠে এলেও, তা প্রতিরোধে এখনও পর্যাপ্ত ও সমন্বিত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অদক্ষ চালক, লাইসেন্সবিহীন ড্রাইভিং এবং দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। তারা মনে করেন, পরিকল্পিত নজরদারি, নিয়মিত অভিযান এবং কঠোর আইন প্রয়োগ ছাড়া সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব নয়।