বাবা-মায়ের ঘাম আর ছেলের আভিজাত্য: মাঝখানে এক চওড়া দেয়াল

মো. সাইফুল্লাহ খান

ভোর চারটার কনকনে শীতে যখন পুরো শহর গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, তখন ষাটোর্ধ্ব রহমত আলীর (ছদ্মনাম) রিকশার চাকা ঘুরতে শুরু করে। এই চাকা ঘোরার খটখট শব্দে মিশে থাকে তার একমাত্র ছেলের ভবিষ্যতের স্বপ্ন।

 

গত বিশটি বছর ধরে হাড়ভাঙা খাটুনি, রোদে পোড়া তামাটে চামড়া আর শ্রাবণ-বর্ষায় ভেজা শরীর নিয়ে তিনি শুধু একটি কামনাই করেছেন—তার সন্তান যেন বড় হয়ে ‘মানুষের মতো মানুষ’ হয়। দীর্ঘ এক জীবনযুদ্ধের পর আজ রহমত আলীর স্বপ্ন পূরণ হয়েছে; ছেলে আজ বিসিএস ক্যাডার, রাষ্ট্রের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। কিন্তু এই সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছে রহমত আলীর সেই শিক্ষিত ছেলে আজ ভুলে গেছেন তার বাবার রিকশার হ্যান্ডেল ধরা হাত দুটোকে, যা তাকে আজকের এই আসনে বসিয়েছে।

 

এটি কেবল রহমত আলীর একার গল্প নয়, বর্তমান বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে এটি এক নীরব ও করুণ বাস্তবতার নাম। যেখানে শিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত সন্তানদের একটি বড় অংশ তাদের শ্রমজীবী বাবা-মাকে জীবনের অপ্রয়োজনীয় বোঝা কিংবা লজ্জার কারণ হিসেবে গণ্য করছে।

 

আমাদের দেশের অধিকাংশ নিম্নবিত্ত ও শ্রমজীবী মানুষের জীবনের একমাত্র বিনিয়োগ হলো তাদের সন্তান। একজন রিকশাচালক, দিনমজুর বা সামান্য কৃষক তার জীবনের সবটুকু রক্ত জল করে দেন সন্তানের শিক্ষার পেছনে। নিজের তালি দেওয়া জামা আর আধপেটা আহারের কষ্ট তারা কখনো বুঝতে দেন না সন্তানকে।

 

তাদের লক্ষ্য থাকে একটাই—নিজেদের জীবনের অন্ধকার যেন সন্তানের গায়ে না লাগে, সন্তান যেন সমাজের উঁচু আসনে বসে।

 

কিন্তু বাস্তবতা অত্যন্ত রূঢ়। দেখা যাচ্ছে, সন্তান যখন সাফল্যের দেখা পায়, যখন তার নামের আগে-পরে যুক্ত হয় বড় বড় পদবী আর আভিজাত্যের তকমা, তখন সেই সাধারণ বাবা-মাই হয়ে ওঠেন তাদের জন্য এক ‘সামাজিক বিড়ম্বনা’। বিশেষ করে বিসিএস বা বড় কর্পোরেট চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর অনেকের মধ্যেই এক ধরনের ‘নব্য আভিজাত্য’ কাজ করে, যেখানে রিকশাচালক বা কৃষক বাবার পরিচয় দিতে তাদের আভিজাত্যে আঘাত লাগে।

 

এই শেকড় বিচ্যুতি ঘটনার পেছনে একটি বড় কারণ হলো শ্রেণি পরিবর্তন। যখন একজন শ্রমজীবী পরিবারের সন্তান উচ্চবিত্ত বা উচ্চ-মধ্যবিত্ত সমাজে প্রবেশ করে, তখন তার চারপাশে তৈরি হয় এক কৃত্রিম বলয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, পেশাগত জীবনে তারা এমন জীবনসঙ্গিনী বা শ্বশুরবাড়ি বেছে নেন যাদের কাছে বংশমর্যাদা আর টাকাই শেষ কথা। ধনাঢ্য শ্বশুরবাড়ির মন রক্ষা করতে গিয়ে এবং নিজের তথাকথিত ‘স্ট্যাটাস’ ধরে রাখতে গিয়ে তারা বৃদ্ধ বাবা-মায়ের সাথে যোজন যোজন দূরত্ব তৈরি করেন।

 

শহুরে বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের এসি রুমে বসে এই সন্তানরা হয়তো দামি রেস্তোরাঁর খাবার খান, কিন্তু তাদের মনে পড়ে না গ্রামের ভাঙা ঘরে একবেলা খেয়ে না খেয়ে থাকা সেই বাবা-মায়ের কথা। শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়দের কাছে তারা নিজেদের আসল পরিচয় গোপন করেন অথবা এক মিথ্যা আভিজাত্যের আড়ালে ঢেকে রাখেন নিজের ফেলে আসা ধূলিমলিন শৈশবকে।

 

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এমন কিছু ভয়াবহ তথ্য, যা শুনে শিউরে উঠতে হয়। অনেক প্রতিষ্ঠিত সন্তান কেবল মাসে সামান্য কিছু টাকা পাঠিয়েই মনে করেন তাদের দায়িত্ব শেষ হয়েছে। আবার অনেকের ক্ষেত্রে সেই টাকাটুকুও জোটে না। বৃদ্ধ বাবা-মায়ের অসুখ-বিসুখে পাশে থাকা তো দূরের কথা, বছরে একবার খোঁজ নিতেও তাদের সময় হয় না।

 

সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো তখন, যখন দেখা যায় উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার বাবা-মাকে শেষ বয়সে বেঁচে থাকার তাগিদে পথে নামতে হয়। লোকলজ্জার ভয়ে তারা মুখ ফুটে পরিচয় দেন না যে তাদের সন্তান মস্ত বড় অফিসার। তারা ভিক্ষাবৃত্তি বেছে নেন অথবা মানুষের দ্বারে দ্বারে হাত পাতেন একমুঠো অন্নের জন্য। এটি কেবল ব্যক্তিগত অবক্ষয় নয়, বরং একটি পঙ্গু সমাজের লক্ষণ।

 

এই বাস্তবতার সবচেয়ে করুণ দিকটি হলো ‘মৃতদেহের কাছে ফেরা’। অনেক সন্তান বাবা-মা জীবিত থাকতে তাদের চেহারাও দেখতে চান না, পাছে পরিচিত মহলে সম্মানহানি হয়। কিন্তু বাবা-মা মারা যাওয়ার পর তারা ঠিকই গ্রামে ফেরেন—তাও শোকের চেয়ে লোকদেখানো আড়ম্বরের জন্য বেশি। দামি গাড়ি হাঁকিয়ে গ্রামে এসে তারা দাফন-কাফনে বা কুলখানিতে লক্ষ টাকা খরচ করেন, যাতে প্রতিবেশীরা বুঝতে পারে ছেলে কত বড় অফিসার। অথচ সেই বাবা-মায়ের শেষ ইচ্ছা হয়তো ছিল শুধু সন্তানের সাথে বসে একবেলা ডাল-ভাত খাওয়া আর নাতি-নাতনির মুখ দেখা।

 

সাফল্যের কোনো শর্টকাট নেই, আর সেই সাফল্যের কারিগরদের অবহেলা করার কোনো অধিকারও কারো নেই। আজ যারা বড় অফিসার হয়ে বাবা-মাকে ভুলে যাচ্ছেন, তাদের মনে রাখা উচিত—সময়ের চাকা চিরকাল এক জায়গায় থাকে না। প্রকৃতির বিচার বড় নির্মম। যে সন্তান নিজের বাবার রিকশা চালানোর শ্রমে শিক্ষিত হয়ে আজ লজ্জায় মুখ লুকাচ্ছেন, তার এই আভিজাত্য বালির বাঁধের চেয়েও ঠুনকো।

 

শেকড়হীন গাছ যেমন ঝড়ে টিকে থাকতে পারে না, তেমনি মা-বাবার দোয়া আর মমতা ছাড়া কোনো অর্জনই প্রকৃত শান্তি আনতে পারে না। সমাজের এই ক্ষত মেরামতে প্রয়োজন ব্যাপক পারিবারিক শিক্ষা ও সামাজিক সচেতনতা। নতুবা একদিন হয়তো দেশটা বড় বড় অফিসার দিয়ে ভরে যাবে, কিন্তু খুঁজে পাওয়া যাবে না একজনও প্রকৃত ‘মানুষ’।

এই বিভাগের আরো খবর