পোশাক শিল্পে নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তর: শ্রম আইন ও নীতির ভবিষ্যৎ কী?

আফজাল হোসেন লাভলু।। 

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পে নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তরের ক্ষেত্রে শ্রমিকদের কর্মসংস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। আর বর্তমান শ্রম আইন ও সংশ্লিষ্ট নীতিমালাগুলোতে যথেষ্ট আইনি সুরক্ষা নেই। শ্রমিক, উদ্যোক্তা ও সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে এসব জানা গেছে।

জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন ১৫-২০ শতাংশ কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আর তৈরি পোশাক শিল্পের নিজস্ব উদ্যোগ ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি চার্টার ফর ক্লাইমেট অ্যাকশন-এ বলা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে ৩০% নিঃসরণ কমানো হবে। বিশ্বের বড় বড় পোশাক ক্রেতা কোম্পানিগুলো বলছে, ২০৩০ সালের পর তারা কেবল পরিবেশবান্ধব কারখানায় উৎপাদিত পণ্য নেবে। ফলে বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলোকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে যেতে বাধ্য হচ্ছে। অন্যদিকে তৈরি পোশাকশিল্পের সম্মুখ শারীর অংশীজনদের সুরক্ষায় বাংলাদেশের প্রচলিত শ্রম আইন ও নীতিমালাগুলো যথেষ্ট নয়।

কথা হয় ঢাকার অদূরে সাভারের কয়েকজন তৈরি পোশাক শ্রমিকের সাথে। কথা হয় আমেনা, মোস্তফা ও জামাল মিয়ার সাথে এরা কেউই জ্বালানি শক্তির রূপান্তর কিংবা চাকুরীর আইন ও নীতি এ সম্পর্কে জানেনা। তবে মধ্য বয়স্ক রহিমা খাতুন বলেন, “শুনেছি ফ্যাক্টরিতে নতুন কয়েকটি মেশিন আসবে, নতুন মেশিন চালাতে না জানলে চাকরি থাকবে না। কাটিং ম্যান, মোঃ আব্দুল খালেক জানান, আইন কানুন থাকলে মালিক শ্রমিক সবার জন্যই সুবিধা হয়। কিন্তু বাংলাদেশে মামলা মোকদ্দমায় টাকা আদায় করতে অনেক সময় লাগে। সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্ট সভাপতি রাজেকুজ্জামান রতন মনে করেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের ফলে বৈদ্যুতিক ও স্বয়ংক্রিয় মেশিনের ব্যবহার বাড়বে, যার ফলে কারখানাগুলোতে মানুষের নির্ভরতা কমবে।

তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক নাজমুল হাসান জানান, প্রচলিত আইনে নবায়নযোগ্য প্রযুক্তি ব্যবহারে সরকারের কোন সহায়তা নেই । তাই পুরো বিনিয়োগ ঝুঁকি আমাদেরই নিতে হচ্ছে। নতুন আইনে যদি শ্রমিক প্রশিক্ষণ ও কারখানার রূপান্তরে সরকারের সহায়তার আলাদা বিধান থাকত, তাহলে আমাদের রূপান্তরিত জ্বালানি শক্তি ব্যবহারে সুবিধা হতো।

তৈরি পোশাক শিল্প ও রূপান্তরিত জ্বালানি শক্তি নিয়ে কাজ করেন এমন শ্রমিক সংগঠন ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নবায়নযোগ্য শক্তিতে রূপান্তরের ফলে অনেক শ্রমিক চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে। বর্তমান শ্রম আইন ২০০৬ (সংশোধিত ২০১৮) কিছু মৌলিক সুরক্ষা দিলেও, নবায়নযোগ্য শক্তি বা প্রযুক্তি রূপান্তরের মতো পরিবর্তনের জন্য তা মোটেও প্রস্তুত নয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় ধারা ২৬: যেখানে ছাঁটাইয়ের নিয়ম আছে, কিন্তু প্রযুক্তিগত কারণে চাকরি হারালে শ্রমিকের পুনর্বাসনের বাধ্যবাধকতা নেই। আর ধারা ২০ এ অবসরের পর ক্ষতিপূরণের কথা বলা হলেও হঠাৎ চাকরি হারানো শ্রমিকদের জন্য সুনির্দিষ্ট নিরাপত্তা বিধান নেই। শ্রম অধিকার বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার জাকির উজ্জামান বলেন, বর্তমান আইন পুরনো সময়ের কথা মাথায় রেখে তৈরি। এখন যেসব প্রযুক্তিগত ছাঁটাই হতে পারে, তার কোনো সুরক্ষা এখানে নেই। জাতীয় শিল্পনীতি ২০১৬, কর্মসংস্থান নীতি ২০১৯ (ড্রাফট) এবং ৮ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় প্রযুক্তি রূপান্তরের ক্ষেত্রে পুনঃপ্রশিক্ষণের জন্য কোনো আলাদা কর্মপরিকল্পনা বা তহবিল গঠনের সুস্পষ্ট ব্যবস্থা নেই। সরকার চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি আইন’ এর একটি খসড়া প্রকাশ করেছে, যা এখন সংশোধন ও পরিমার্জনের পর্যায়ে রয়েছে। প্রস্তাবিত আইনের বহু ধারায় ভবিষ্যৎকালীন শব্দ (‘করবে’, ‘হবে’, ‘দেখবে’) ব্যবহৃত হওয়ায় বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ও সময়সীমা অস্পষ্ট রয়ে গেছে। ফলে বর্তমান আইন ও নীতিমালাগুলো শ্রমিকদের এই নতুন চ্যালেঞ্জ সামাল দেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়।

এই প্রসঙ্গে সেফটি অ্যান্ড রাইটস সোসাইটি (এসআরএস), নির্বাহী পরিচালক, সেকেন্দার আলী মীনা জানান, ন্যায্য জ্বালানি রূপান্তরের আলোকে শ্রমিকদের পুনঃস্কিলিং, সামাজিক সুরক্ষা ও কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে। বর্তমান আইনে এই সংক্রান্ত কোনো পৃথক ধারা নেই। নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও টেকসই শিল্প নীতিতে শ্রমিকদের অন্তর্ভুক্তির জন্য পৃথক কর্মপরিকল্পনা থাকা জরুরি বলে তিনি মনে করেন।

সরকারি সূত্র বলছে, বাংলাদেশ সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের ১০% নবায়নযোগ্য উৎস থেকে সরবরাহ করার পরিকল্পনা নিয়েছে। ছাদ সৌর প্রকল্পের মাধ্যমে ৫০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি (আইডিসিওএল) বলছে, তারা পোশাক শিল্পে ছাদ সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্পে বিনিয়োগ করছে এবং ২০২৬ সালের মধ্যে ৩০০ মেগাওয়াট ছাদ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের লক্ষ্য নিয়েছে। জাস্ট ট্রানজিশন নীতি ২০৩০ (ন্যায়সঙ্গত রূপান্তর নীতি) তৈরির কাজ করছে। এই নীতির লক্ষ্য হলো পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের পাশাপাশি শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা করা। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেছেন, বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে ‘সস্তা শ্রম’ শব্দটি বাদ দিতে হবে। টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে শ্রমিক ও মালিক উভয়কেই দায়িত্ব নিতে হবে।

জার্মানি, কানাডা ও দক্ষিণ কোরিয়া জাস্ট ট্রানজিশন ফান্ড গঠন ও আইনিভাবে সুরক্ষা নিশ্চিত করেছে।যেখানে ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকদের পুনঃপ্রশিক্ষণ এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শ্রম আইন ও নীতিমালা সংশোধন করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তর জনিত চাকরি ঝুঁকি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। সরকার, উদ্যোক্তা ও শ্রমিক সংগঠনকে নিয়ে একটি সমন্বিত রোডম্যাপ তৈরি করে সংশ্লিষ্ট অংশী জনের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

এই বিভাগের আরো খবর