আফজাল হোসেন লাভলু।।
ক্রেতাদের অব্যাহত শর্ত ও চাপ, সরকারের প্রতিশ্রুতি আর শ্রমিকদের অদক্ষতা এবং অসচেতনতা এই ত্রিমুখী চ্যালেঞ্জের মুখে দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ। উদ্যোক্তা, শ্রমিক ও গবেষকদের সাথে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন বিজিএমইএ-এর তথ্যমতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের বড় ক্রেতাদের শর্তের কারণে বাংলাদেশের প্রায় ৫ হাজার গার্মেন্টস কারখানাকে নবায়নযোগ্য শক্তিতে রূপান্তরিত হতে হবে। এই পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাবে পড়বে তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের উপর। নতুন কিছু কাজের ক্ষেত্রে তৈরি হলেও কমতে পারে শ্রমিকের সংখ্যা। তবে প্রশ্ন উঠছে—এই রূপান্তরের চাপ কাদের ওপর বেশি পড়ছে? মালিক নাকি শ্রমিক?
তৈরিপোশাক শ্রমিকদের বড় অংশই জানে না যে, কারখানায় নবায়নযোগ্য শক্তি ও প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে তাদের চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে। ঢাকার আশুলিয়ার গার্মেন্টস শ্রমিক হাসান বলেন, “কারখানায় নতুন মেশিন এসেছে, নতুন যন্ত্রপাতি চালাতে নতুন লোক লাগে। ভবিষ্যতে আসলে চাকরি থাকবে কি না, জানি না।” শ্রমিক আয়েশা, হাসনাবান, আবু তাহেরের মতো অনেকেই জ্বালানি রূপান্তরের বাস্তবতা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ। সম্প্রতি চাকরি হারানো সাবেক অপারেটর শফিকুল ইসলাম জানান “আগে যেখানে ৩৫ জন কাজ করতাম, এখন নতুন মেশিনে সেই কাজ করে ২০ জন। আমি সহ বাকিদের চাকরি গেছে। মধ্যবয়স্ক রাবেয়া বেগম বলছিলেন, এমনিতেই চাকরি চলে যায়, আর নতুন নতুন যন্ত্রপাতির কাজ না জানলে তো পেটে ভাতই জুটবে না।
নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে রূপান্তরের প্রক্রিয়ায় উদ্যোক্তারাও নানা বাস্তব সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। এম মহিউদ্দিন নামের এক গার্মেন্টস উদ্যোক্তা জানান, “সোলার এনার্জির জন্য অনেক জায়গা দরকার, যা আমাদের অধিকাংশ কারখানার নেই। উপরন্তু প্রযুক্তি রূপান্তরের এককালীন খরচ অনেক বেশি।” তিনি আরও বলেন, সহজ শর্তে ঋণ এবং নবায়নযোগ্য শক্তি ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে শুল্ক কমানো না হলে উদ্যোক্তাদের জন্য এই রূপান্তর সম্ভব নয়। তার মতে, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদেরও নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অর্ডার নিশ্চিত করতে হবে, যাতে বিনিয়োগ সুরক্ষিত থাকে।
সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের সভাপতি রাজেকুজ্জামান রতন মনে করেন, “নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের ফলে স্বয়ংক্রিয়তার ব্যবহার বাড়বে, ফলে মানুষের ওপর নির্ভরতা কমবে। হাজার হাজার শ্রমিক চাকরি হারাতে পারে।” শ্রমিক অধিকার নিয়ে কাজ করে এমন বেসরকারি সংস্থা সেফটি অ্যান্ড রাইটস সোসাইটি (এসআরএস), নির্বাহী পরিচালক, সেকেন্দার আলী মীনা জানান, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতকে টেকসই ও মানবিকভাবে সবুজায়িত করতে হলে জরুরি কিছু উদ্যোগ নিতে হবে। শ্রম আইন সংস্কার করে জাস্ট ট্রানজিশনের বিষয় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। শ্রমিক প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। কারখানার রূপান্তরে শ্রমিকের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। সবুজ রূপান্তর রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে, যাতে প্রযুক্তি পরিবর্তনের সাথে শ্রমিক জীবিকা সুরক্ষিত থাকে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রায় ৮৪ শতাংশ অবদান রাখে। ফলে এদিকে সরকারের যথেষ্ট কর্মপরিকল্পনা রয়েছে বলে মনে করেন, বিজিএমইএ প্রশাসক মোঃ আনোয়ার হোসেন। তিনি আরো জানান, “বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে আমাদের নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে যেতে হবে। তবে শ্রমিকদের কর্মসংস্থান সংকোচন যেন না হয়, সেটা আমরা নিশ্চিত করার চেষ্টা করবো।” ইতিমধ্যেই বাংলাদেশ সরকার “জাস্ট ট্রানজিশন নীতি ২০৩০” পরিকল্পনার খসড়া তৈরি করেছে।
শ্রম সংস্কার কমিশনের চেয়ারম্যান সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদও স্বীকার করেন যে, রূপান্তরের সময় কিছু ঝুঁকি থাকবেই। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, “কাজ করতে হবে অংশীজনদের মতামত নিয়ে। ক্ষতির পরিমাণ পরিমাপ ও ক্ষতিগ্রস্তদের সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করেই রূপান্তর বাস্তবায়ন করতে হবে।”
বিশ্বের অনেক দেশ ইতোমধ্যে নবায়নযোগ্য শক্তিতে সফলভাবে রূপান্তর ঘটিয়েছে। চীন, রূপান্তরের সময় শ্রমিকদের জন্য পুনঃপ্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করেছে যাতে প্রযুক্তি পরিবর্তনের সাথে শ্রমিকরা সহজেই মানিয়ে নিতে পারে। জার্মানিতে সরকার পরিবেশবান্ধব পোশাক শিল্পের জন্য বিশেষ কর ছাড় ও ভর্তুকি দিয়েছে, যা মালিক-শ্রমিক উভয়ের জন্য সুবিধাজনক হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, পুনর্বাসনের সুযোগ, শ্রমিকদের জন্য একটি নিরাপত্তা তহবিল গঠন করা উচিত, যাতে চাকরি হারালে তারা ক্ষতিপূরণ পান।