স্থানীয় নেতা, স্থানীয় বাস্তবতা

ক্ষমতার কাছাকাছি থেকেও কেন বদলায় না মানুষের জীবন

মো: সাইফুল্লাহ খান 

গ্রামের চায়ের দোকানে বসলে রাজনীতির গল্প আসবেই। কে চেয়ারম্যান হবে, কে মেম্বার, কার সঙ্গে কার সম্পর্ক ভালো নয়—সব আলোচনা ঘুরে ফিরে স্থানীয় নেতাদের নিয়েই। শহরের বড় রাজনীতি দূরের বিষয়, কিন্তু ইউনিয়ন, ওয়ার্ড বা পৌরসভার নেতা মানুষের জীবনের খুব কাছের। রাস্তা ভাঙলে, ভাতা বন্ধ হলে, স্কুলে সমস্যা হলে—সবার আগে মানুষ যাদের কাছে যায়, তারা এই স্থানীয় নেতারাই।

তবু প্রশ্নটা থেকেই যায়—এত কাছাকাছি থেকেও কেন মানুষের জীবন খুব একটা বদলায় না?

 

নেতা যিনি সব জানেন: স্থানীয় নেতাদের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো মানুষের সঙ্গে তাদের সরাসরি যোগাযোগ। কে অসুস্থ, কার জমি নিয়ে ঝামেলা, কার ছেলে বিদেশ যেতে চায়—সব খবরই তারা জানেন। বিয়ের দাওয়াত থেকে জানাজা, সব জায়গায় তাদের উপস্থিতি চোখে পড়ে।

 

এই জানাশোনাই তাদের জনপ্রিয়তার মূল ভিত্তি। মানুষ ভাবে, “উনি আমাদের লোক।” কিন্তু এই পরিচিতি কি সব সময় কাজের ফল বয়ে আনে? অনেক সময় দেখা যায়, জানাশোনা থাকলেও সমস্যার সমাধান হয় না।

 

নির্বাচনের সময়ের প্রতিশ্রুতি: নির্বাচনের সময় স্থানীয় এলাকা বদলে যায়। দেয়ালে পোস্টার, মাইকে প্রচারণা, বাড়ি বাড়ি গিয়ে হাত ধরা। তখন নেতাদের ভাষায় উন্নয়নের ছড়াছড়ি—রাস্তা হবে, ড্রেন হবে, কর্মসংস্থান হবে।

ভোট শেষ হলে বাস্তবতা বদলে যায়। উন্নয়ন হয় ধীরে, আর প্রতিশ্রুতি হারিয়ে যায় দ্রুত। মানুষ আবার চায়ের দোকানে বসে বলে, “সবই তো আগের মতোই আছে।”

 

ক্ষমতা আর সীমাবদ্ধতার দ্বন্দ্ব: সব দায় শুধু স্থানীয় নেতাদের ঘাড়ে চাপানোও পুরো সত্য নয়। অনেক সময় তাদের ক্ষমতা সীমিত। বাজেট কম, সিদ্ধান্ত আসে ওপর থেকে। একটি রাস্তা মেরামতের জন্যও অনুমোদনের অপেক্ষা করতে হয়।

 

কিন্তু এই সীমাবদ্ধতার আড়ালে অনেক সময় দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতাও দেখা যায়। কে কোন প্রকল্প পেল, কার লোক নিয়োগ হলো—এসব প্রশ্ন উঠলেই আলোচনা থেমে যায়।

উন্নয়ন কোথায় আটকে যায় গ্রামের রাস্তা, ড্রেন, স্কুল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র—এই জায়গাগুলোতেই উন্নয়নের বাস্তব চিত্র ধরা পড়ে। কোথাও নতুন কাজ হয়, কিন্তু মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বর্ষা এলেই রাস্তা ভেঙে যায়, ড্রেন উপচে পড়ে।

 

মানুষ প্রশ্ন করে—এই উন্নয়ন কি কাগজে, নাকি বাস্তবে? স্থানীয় নেতারা বলেন, “আমরা চেষ্টা করছি।” কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে সেই চেষ্টা অনেক সময় দৃশ্যমান হয় না।

 

স্বজনপ্রীতির অভিযোগ : স্থানীয় রাজনীতির সবচেয়ে আলোচিত বিষয় স্বজনপ্রীতি। ভাতা, প্রকল্প, চাকরি—সবকিছুতেই অভিযোগ ওঠে কাছের লোকদের অগ্রাধিকার দেওয়ার। যারা নেতা ঘনিষ্ঠ, তারা সুবিধা পায়। যারা দূরে, তারা অপেক্ষায় থাকে।

এই বৈষম্য ধীরে ধীরে মানুষের আস্থা নষ্ট করে। মানুষ তখন নেতৃত্বকে আর সেবক হিসেবে দেখে না, দেখে সুবিধাভোগী হিসেবে।

 

স্থানীয় নেতাদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলা সহজ নয়। সবাই সবাইকে চেনে। প্রতিবাদ মানেই ঝামেলা ডেকে আনা। তাই অনেক অন্যায় নীরবতায় ঢাকা পড়ে যায়। এই নীরবতাই সবচেয়ে বিপজ্জনক। কারণ প্রশ্ন না থাকলে জবাবদিহি থাকে না। আর জবাবদিহি না থাকলে নেতৃত্ব দুর্বল হয়।

 

 

সব চিত্র অন্ধকার নয়। কিছু এলাকায় স্থানীয় নেতারা সত্যিই মানুষের পাশে দাঁড়ান। নিজের উদ্যোগে রাস্তা মেরামত, স্কুলে সহায়তা, অসহায় পরিবারকে সাহায্য—এসব উদাহরণও আছে।

এই নেতারা দেখিয়ে দেন, ইচ্ছা থাকলে সীমাবদ্ধতার মধ্যেও কাজ করা যায়। সমস্যা হলো, এই ভালো উদাহরণগুলো সংখ্যায় কম।

তরুণদের আগ্রহ কমছে

 

স্থানীয় রাজনীতিতে তরুণদের আগ্রহ কমে যাওয়াও একটি বড় বাস্তবতা। তারা মনে করে, এখানে আদর্শের জায়গা কম, প্রভাব আর সম্পর্কের জায়গা বেশি। ফলে নেতৃত্বের জায়গা বারবার একই মানুষের হাতেই ঘুরে ফিরে যায়।

এর ফল হলো নতুন চিন্তার অভাব। পুরোনো সমস্যার পুরোনো সমাধানেই আটকে থাকে এলাকা।

 

মানুষ কী চায় : সাধারণ মানুষের চাওয়া খুব বেশি নয়। ভালো রাস্তা, নিরাপদ পানি, স্কুলে ঠিকমতো পড়াশোনা, অসুখে চিকিৎসা—এই মৌলিক বিষয়গুলোই তাদের কাছে উন্নয়ন।

 

মানুষ চায় এমন নেতা, যিনি শুধু নির্বাচনের সময় নয়, সারা বছর পাশে থাকবেন। কথা বলবেন, শুনবেন, জবাব দেবেন।

 

পরিবর্তনের পথ কোথায়: স্থানীয় নেতৃত্বকে শক্তিশালী করতে হলে জবাবদিহি বাড়াতে হবে। পরিকল্পনা ও বাজেটের তথ্য মানুষের কাছে পরিষ্কার হতে হবে। নাগরিকদেরও সচেতন হতে হবে—ভোট দেওয়ার পাশাপাশি প্রশ্ন করাও দায়িত্ব।

মিডিয়া, নাগরিক সংগঠন ও তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়লে নেতৃত্বের ওপর চাপ তৈরি হবে। তখন স্থানীয় বাস্তবতাও ধীরে ধীরে বদলাতে পারে।

 

শেষ কথা হলো,স্থানীয় নেতা মানেই শুধু একটি পদ নয়, এটি মানুষের জীবনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত একটি দায়িত্ব। এই দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন না হলে উন্নয়ন শুধু স্লোগানেই থেকে যায়।

স্থানীয় বাস্তবতা বদলাতে হলে নেতৃত্বকে মানুষের কাছেই ফিরতে হবে। আর মানুষকেও নেতৃত্বের কাছে শুধু আশা নয়, প্রশ্ন নিয়ে যেতে হবে। এই দুইয়ের মাঝখানেই লুকিয়ে আছে সত্যিকারের পরিবর্তনের সম্ভাবনা।

 

 

মো: সাইফুল্লাহ খান

সাংবাদিক ও কলামিস্ট

এই বিভাগের আরো খবর