Home অন্যান্য আজ পহেলা ফাল্গুন।। ঋতুরাজ বসন্তের প্রথম দিন

আজ পহেলা ফাল্গুন।। ঋতুরাজ বসন্তের প্রথম দিন

278
0
SHARE

সময়ের চিত্র ডেস্ক॥

বসন্ত বাতাসে সই গো/বসন্ত বাতাসে/বন্ধুর বাড়ির ফুলের গন্ধ আমার বাড়ি আসে…। পাচ্ছেন তো সেই গন্ধ? কত শত ফুল যে ফুটে আছে এখন! বন সেজেছে। মনও। বুকের ভেতরে, টের পাচ্ছেন নিশ্চয়ই, অদ্ভুত একটা পুলক! চঞ্চল হয়ে উঠেছে চিত্ত। আকুলিবিকুলি করছে। কী যেন চায়, কারে যেন খুঁজে বেড়ায়। ভুলে যাওয়া স্মৃতি পুরনো হাহাকার নতুন করে বেজে ওঠে ভেতরে!

কেন হঠাৎ এত পরিবর্তন? এত ভাংচুর কেন? কারণ ‘আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে।’ রবীন্দ্রনাথ সম্ভাষণ করে বলেছিলেন, আজি দখিন-দুয়ার খোলা-/এসো হে, এসো হে, এসো হে আমার বসন্ত এসো…। এসেছে বসন্ত। বসন্ত এসে গেছে। আজ ১ ফাল্গুন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ। সোমবার। বিপুল ঐশ্বর্যের অধিকারী ঋতুরাজ বসন্তের প্রথম দিন। নজরুল যেন প্রিয় ঋতুকে স্বাগত জানিয়ে বলছেন, সহসা খুলিয়া গেল দ্বার,/আজিকার বসন্ত-প্রভাতখানি দাঁড়াল করিয়া নমস্কার!

প্রতিবারের মতোই রাঙিয়ে দিতে এসেছে ফাগুন। শূন্য হৃদয় ভরিয়ে দিতে এসেছে। ‘যদি তারে নাই চিনি গো সে কি আমায় নেবে চিনে/এই নব ফাল্গুনের দিনে…।’ আবারও এসেছে ফাল্গুনের দিন। ‘আমার প্রাণের পরে চলে গেল কে/বসন্তের বাতাসটুকুর মতো…।’ একেবারে বুকের ওপর দিয়ে বইছে সে বাতাস! করোনাকাল হলেও বর্ণিল অনুষ্ঠানমালার মধ্য দিয়ে প্রিয় ঋতুকে তাই বরণ করে নেবে বাঙালী। স্বাস্থ্যবিধি মেনেই রাজধানী ঢাকা ও ঢাকার বাইরে হবে বসন্ত উৎসব।

ষড়ঋতুর বাংলাদেশে প্রতি দুই মাস অন্তর রূপ বদলায় প্রকৃতি। শুরু হয় গ্রীষ্ম দিয়ে। আর সমাপনী ঋতুটি বসন্ত। ফাল্গুন চৈত্র মিলে বসন্তের বৈশিষ্ট্য গড়ে দেয়। এ সময় শীতে ভুগতে হয় না। গরমও থাকে সহনীয় পর্যায়ে। সময়টা তাই ভীষণ উপভোগ করে বাঙালী। এরই মাঝে বদলাতে শুরু করেছে প্রকৃতি। শীতে বিবর্ণ প্রকৃতি জেগে উঠছে নতুন করে। বৃক্ষের নবীন পাতায় এখনকাঁচা সবুজ। রোদ এসে পড়তেই চিক চিক করছে। আর বাগান সব ভরে উঠেছে ফুলে। গোলাপ, গাঁদা, চন্দ্রমল্লিকা, গ্ল্যাডিওলাস ইত্যাদির সঙ্গে এবার যোগ হয়েছে টিউলিপও। নাগরিক উদ্যানে বনে পার্কে তারও আগে থেকে ফুটে আছে ফাগুনে অনিবার্য পলাশ শিমুল। চারপাশের এসব দৃশ্য দেখেই রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ওরে ভাই, ফাগুন এসেছে বনে বনেÑ/ডালে ডালে ফুলে ফলে পাতায় পাতায় রে,/আড়ালে আড়ালে কোণে কোণে।

একই সময় রঙিন ফুলের আকর্ষণে উড়ে আসছে প্রজাপতি। মৌমাছিরাও ব্যস্ত মধু সংগ্রহে। ফুলের বাগানে গুনগুন। পাখিরাও প্রণয়ী খুঁজছে। দূরে গাছের ডালে বসে ডাকছে কোকিল। মানুষের চঞ্চল মন আপনি গেয়ে উঠছে ‘আহা, আজি এ বসন্তে এত ফুল ফুটে,/এত বাঁশি বাজে, এত পাখি গায়…।’

বাঙালীর মন, হ্যাঁ, বসন্তে চঞ্চল হয়ে ওঠে। বিশেষ প্রভাবিত হয়। আর মনে রাজত্ব করে বলেই তো সে ঋতুরাজ। কবি নির্মলেন্দু গুণে ফিরে যেতে হয়, কবি বলছেন, ‘দোলা চাই অভ্যন্তরে,/মনের ভিতর জুড়ে আরো এক মনের মর্মর… এ না হলে বসন্ত কিসের?’ বসন্ত আসলেই আরও এক মনের মর্মর। গভীর গোপন অনুভূতিগুলোকে জাগিয়ে তোলে। উস্কে দেয়। স্বীকার করে নিয়েই যেন কবিগুরু বলেন, ‘ফুলের বনে যার পাশে যাই তারেই লাগে ভাল।’ বসন্ত ভালবাসার বোধগুলোকে তীব্র করে। তৃষ্ণার্থ করে তুলে হৃদয়কে। কাতর করে তুলে। ভাললাগা ভালবাসার সৌরভ ছড়ানো বসন্ত মিলনের বার্তা দেয়। ভীরু প্রাণে কেবলই বাজে, ‘মধুর বসন্ত এসেছে মধুর মিলন ঘটাতে/মধুর মলয়সমীরে মধুর মিলন রটাতে।’ লোকজ সুরেও ধ্বনিত হয় অভিন্ন বাসনা। আব্বাসউদ্দীনের কালজয়ী কণ্ঠ গেয়ে ওঠে- সুখ বসন্ত দিলরে দেখা, আর তো যৈবন যায় না রাখা গো…।

আর যারা বসন্তেও বাঁধে না ঘর, বাঁধতে পারে না যারা, তাদের বেদনা অপার। বেদনাকে নিয়েও খেলা করে বসন্ত। তেমনই বেদনার কথা উল্লেখ করে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, মর্মরিয়া ওঠে আমার দুঃখরাতের গান/ফাগুন, হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান…। অন্যত্র তিনি লিখেছেন, অতি নিবিড় বেদনা বনমাঝে রে/আজি পল্লবে পল্লবে বাজে রে-/দূরে গগনে কাহার পথ চাহিয়া/আজি ব্যাকুল বসুন্ধরা সাজে রে…। অভিন্ন অনুভূতি থেকে কবি মহাদেব সাহার বলাটি এরকম- তোমার সঙ্গে প্রতিটি কথাই কবিতা, প্রতিটি গোপন কটাক্ষই অনিঃশেষ বসন্তকাল।

রাজধানীতে বসন্ত উৎসব ॥ প্রতি বছরের মতো এবারও রাজধানীতে আয়োজন করা হয়েছে বসন্ত উৎসবের। সকালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের উন্মুক্ত মঞ্চে শুরু হবে অনুষ্ঠান। সঙ্গীত নৃত্য আবৃত্তিসহ নানা আয়োজনে বরণ করে নেয়া হবে বসন্তকে। বসন্ত উৎসব উদ্যাপন পরিষদের পক্ষে মানজার চৌধুরী সুইট জানিয়েছেন, সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। করোনা সংক্রমণের মধ্যেই উৎসব। এ কারণে দু-বেলার পরিবর্তে শুধু সকালেই উৎসব অনুষ্ঠিত হবে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে সবাইকে উৎসবে যোগ দেয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন তিনি। বিকেলে নিজেদের খোলা চত্বরে বসন্ত উৎসবের আয়োজন করেছে সরকারী প্রতিষ্ঠান শিল্পকলা একাডেমি।

এসব উৎসবে যোগ দেয়ার পাশাপাশি নগরবাসী ঢাকার অলিগলি রাজপথে ঘুরে বেড়াবেন বসন্তের সাজে। রঙিন হয়ে উঠবে চারপাশ। ছোট্ট মেয়েটিও খোঁপায় জড়িয়ে নেবে গাঁদা ফুলের মালা। বড়দের মতো শাড়ি পরে গন্তব্যহীন হেঁটে যাবে। ছেলেরা পরবে পাঞ্জাবি। তবে এখন একই দিনে ভালবাসা দিবস উদ্যাপিত হয়। ফলে বাসন্তী রং এবং ভালবাসার লাল- দুটো রং-ই দেখা যাবে একসঙ্গে। যথারীতি শাহবাগ, টিএসসি, চারুকলাসহ আশপাশের এলাকায় উৎসবপ্রেমীদের মূল স্রোতটি দৃশ্যমান হবে। এখান থেকে ছড়িয়ে পড়বে গোটা শহরে। সারাদেশেই উদ্যাপিত হবে বসন্ত উৎসব।

image_print