সময়ের চিত্র ডেস্ক:
কারিতাস বাংলাদেশের উদ্যোগে আজ বুধবার (২৫ জুন) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) অডিটোরিয়ামে “জলবায়ু পরিবর্তন জনিত অভিবাসন ও নগর জীবনের বাস্তবতাঃ নীতিমালা বাস্তবায়নের বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ পন্থা” শীর্ষক একটি জাতীয় পরামর্শমূলক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সভার শুরুতে কারিতাস বাংলাদেশের পরিচালক (কর্মসূচি) দাউদ জীবন দাশ জলবায়ু পরিবর্তন জনিত বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীসহ দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত,বিপদাপন্ন ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ঝুঁকি নিরসন, অভিযোজন ও জীবনমান উন্নয়নমূলক সংক্রান্ত কারিতাস বাংলাদেশ কর্তৃক গৃহীত বিভিন্নকার্যক্রমের সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরেন।
বক্তব্য রাখেন, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল। প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক সোহরাব হাসান , সময়ের চিত্রের সম্পাদক এ আর এম মামুন। সাংবাদিক রফিকুল ইসলাম আজাদ। নাসিমা সোমো, প্রমূখ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ড. জামিল আহমেদ।
সভার সংবাদ মাধ্যম কর্মীদের কাছে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অভিবাসন সংকট বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরা হয় । জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অগণিত মানুষ জীবিকা হারাচ্ছে ও বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। বাধ্য হয়ে শহরের বস্তিতে অমানবিক পরিবেশে বসবাস করছে
যেখানে নাগরিক সেবার অভাব যেমন আছে, তেমনি জীবন-জীবিকারও কোন নিরাপত্তা নেই । সভায় এ সংকট সমাধানের জন্য সরকারি নীতিমালাও অপর্যাপ্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এছাড়া, বাস্তুচ্যুত মানুষদের সেবা পাবার ক্ষেত্রে সরকারি বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে আরো সমন্বয় বৃদ্ধির প্রয়োজন রয়েছে। জাতীয়ভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক নগর পরিকল্পনার অনুপস্থিতির মতো নীতিগত ও প্রশাসনিক শূণ্যতাগুলো নিয়ে সংবাদ মাধ্যমগুলো আরো পর্যালোচনা ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি করলে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এ সংকট সহনীয় হতে পারে বলে সভায় আলোচনা করা হয় ।
সভায় মিডিয়া পেশাজীবীদের সক্রিয় সমর্থন আহ্বান করা হয় জাতীয় ও স্থানীয় নীতিনির্ধারকদের প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে, যেন অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি, উন্নত সেবাপ্রদান এবং জলবায়ু পরিবর্তন জনিত অভিবাসীদের নগর জীবনে ন্যায্য ও মর্যাদাপূর্ণ একত্রীকরণ নিশ্চিত করা যায় । পাশাপাশি বাস্তুচ্যুত জনগণের সংখ্যা হ্রাসের জন্য জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব কমাতে প্রয়োজনীয় কর্মসূচি প্রয়োজনে সাংবাদিকদের মতামত/ফিডব্যাক জানতে চাওয়া হয় ।
সভায় জানানো হয়, বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়, অস্বাভাবিক জোয়ারের প্লাবন, লবণাক্ততা ও নদীভাঙনের ফলে জলবায়ু পরিবর্তন জনিত অভ্যন্তরীণ অভিবাসনের হার ক্রমবর্ধমান। এসব পরিবার রাজধানী ঢাকা ছাড়াও খুলনা ও চট্টগ্রামের মতো শহরে আশ্রয়
নিচ্ছে। কিন্তু এসব শহরে এসেও তারা নতুন ধরনের সংকটের মুখোমুখি হয় যেমন— অনিরাপদ আবাসন, পানি-স্বাস্থ্য-শিক্ষা সেবার অভাব এবং সামাজিক বঞ্চনা ।
বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতীয় পরিকল্পনায় জলবায়ু পরিবর্তন জনিত অভিবাসীদের বিষয়ে উল্লেখ রয়েছে যেখানে অভিবাসন মোকাবিলায় ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে বলা হয়েছে। তবে এর জন্য কোন নির্দিষ্ট আইনি কাঠামো না থাকায় তাদের অন্তর্ভুক্তি বা সেবা নিশ্চিত করা দুরূহ
বিষয় ।
এক পরিসংখ্যানে (IDMC) জানা গেছে, ২০০৮-২০১৪ সাল পর্যন্ত প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাংলাদেশে ৪৭ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। গবেষণা সংস্থা রামরু (RMMRU) ও এসসিএমআরের (SCMR) মতে, ২০১১ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে ১.৬ থেকে ২.৬ কোটি মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হতে পারে। জিআইজেড-এর ২০২৩ সালের গবেষণায় দেখা গেছে, শহরে আশ্রয় নেয়া জলবায়ু পরিবর্তন জনিত অভিবাসীদের মধ্যে ৫৭ শতাংশই উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরার ।
সভা সূত্র জানায়, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা কারিতাস বাংলাদেশ দুর্যোগ সাড়াদান, প্রশমণ ও জলবায়ু পরিবর্তন জনিত ক্ষতিকর প্রভাব কমাতে এ পর্যন্ত দশ লক্ষের বেশি গৃহ নির্মাণ, পয়নিঃষ্কাশ ব্যবস্থা উন্নয়ন এবং কমিউনিটি অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে ৪ কোটি ৭০ লাখের বেশি মানুষের কাছে ভালবাসাপূর্ণ সেবা পৌঁছে দিয়েছে। এছাড়াও কারতিাস ৩,০০০ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি এবং ১৪,০০০ কমিউনিটি স্বেচ্ছাসেবককে প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় উপকরণ দিয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করেছে। শুধুমাত্র উপকূলীয় এবং বন্যাপ্রবণ এলাকার দুর্যোগ ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ঝুঁকি প্রশমনে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় ৩২৯টি ঘূর্ণিঝড় ও বন্যা আশ্রয় কেন্দ্র তৈরি করেছে। বর্তমানে বাংলাদেশের খুলনা ও সাতক্ষীরা জেলায় জার্মান সরকারের বিএমজেড (BMZ) এবং কারিতাস জার্মানীর যৌথ অর্থায়নে পরিচালিত DRR & CCA প্রকল্পের মাধ্যমে শহরাঞ্চলের জলবায়ু পরিবর্তন জনিত অভিবাসীদের মর্যাদাপূর্ণ অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্যে কাজ করছে কারিতাস।
কারিতাস বাংলাদেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রধান অ্যালেক্সজান্ডার ত্রিপুরা সমাপনী বক্তব্যে বলেন,
সভার শেষে অংশগ্রহণকারীরা আশা প্রকাশ করে তাদের অভিমতে জানানঃ গণমাধ্যমের মাধ্যমে জলবায়ু অভিবাসন বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে এবং নীতিগত দুর্বলতা চিহ্নিত করে প্রাসঙ্গিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের ভূমিকায় গতি আসবে। কেবল দুর্যোগের সময় নয়, নিয়মিত ও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে রিপোর্টিং করবেন। নাগরিক সমাজ ও মিডিয়ার মধ্যে সহযোগিতা আরও জোরদার হবে-বিশেষ করে অন্তর্ভুক্তিমূলক নগর নীতির জন্য।
সভায় দেশের জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকগণ অংশগ্রহণ করেন।