Home মতামত জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ

জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ

90
0
SHARE
Spread the love

মীর মোহাম্মদ আসলাম উদ্দিন।।

 

অর্থনীতি এবং আধুনিক সভ্যতার মূলচালিকা শক্তি হচ্ছে জ্বালানি। তাই, দেশের অর্থনীতির ভিতকে মজবুত করে সোনার বাংলা গড়ার লক্ষ্যে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ট বাঙালি, প্রজ্ঞাবান ও বিচক্ষণ রাষ্ট্রনায়ক, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালের ৯ আগস্ট তৎকালীন ব্রিটিশ তেল কোম্পানি শেল অয়েল এর নিকট থেকে তিতাস, হবিগঞ্জ, রশিদপুর, কৈলাশটিলা ও বাখরাবাদ-এ ৫টি গ্যাসক্ষেত্র নামমাত্র ৪.৫ মিলিয়ন পাউন্ড স্টার্লিং মূল্যে ক্রয় করে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় হস্তান্তরের কার্যক্রম সম্পন্ন করেন। ৯ আগস্ট তাই বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের জন্য একটি অবিস্মরণীয় দিন। জ্বালানি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, নতুন নতুন প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা ও গবেষণা, গ্যাসসহ অন্যান্য প্রাথমিক জ্বালানির অনুসন্ধান ও উত্তোলন বৃদ্ধিসহ জ্বালানি খাতে গতি আনার জন্য ২০১০ সাল থেকে ৯ আগস্ট ‘জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা দিবস’ হিসেবে পালিত হচ্ছে।

বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, অকৃত্রিম দেশপ্রেম, চিন্তা চেতানার দূরদর্শিতা ও জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনে বিচক্ষণতার জন্য দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে নামমাত্র মূল্যে গ্যাস ক্ষেত্রগুলো ক্রয় করতে পেরেছিলেন। উল্লিখিত ৫টি গ্যাস ক্ষেত্রের (Gas Initially in Place (GIIP) মজুদ ২০.৭৯ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। সর্বশেষ প্রাক্কলন অনুযায়ি সে সময় ৫টি গ্যাস ক্ষেত্রের উত্তোলনযোগ্য গ্যাস মজুদের পরিমাণ ছিল ১৫.৪৪ ট্রিলিয়ন ঘনফুট- যার বর্তমান সমন্বিত গড় বিক্রয় মূল্য প্রায় ৪৯.৮৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ৪৬ বৎসর পরও এই পাঁচটি গ্যাসক্ষেত্র মোট গ্যাস উৎপাদনের এক-তৃতীয়াংশ যোগান দিচ্ছে। অর্থাৎ জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে অতুলনীয় অবদান রেখে চলছে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার পর জাতীয় অগ্রগতির লক্ষ্যে যে সকল অবিষ্মরণীয় ও দূরদর্শী কার্যক্রম গ্রহণ করেছিলেন তন্মধ্যে জাতীয় জ্বালানির নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিতকরণ ছিল অন্যতম। সদ্য স্বাধীন দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের জন্য একটি শক্তিশালী জ্বালানি অবকাঠামো গড়ে তোলার প্রত্যয়ে ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর গৃহীত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১৪৩ (১) ধারায় বাংলাদেশের যে কোনো ভূমির অন্তঃস্থ সকল খনিজ ও অন্যান্য মূল্যসম্পন্ন সামগ্রী ; বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় জলসীমার অন্তর্বর্তী মহাসাগরের অন্তঃস্থ কিংবা বাংলাদেশের মহীসোপানের উপরিস্থ মহাসাগরের অন্তঃস্থ সকল ভূমি, খনিজ ও অন্যান্য মূল্যসম্পন্ন সামগ্রী; এবং আইনসঙ্গতভাবে প্রজাতন্ত্রের উপর ন্যস্ত যে কোনো ভূমি বা সস্পত্তি প্রজাতন্ত্রের উপর ন্যস্ত করা হয়। ২৬ মার্চ, ১৯৭২ সালের রাষ্ট্রপতির আদেশ নং ২৭ এর মাধ্যমে দেশের তৈল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান ও উন্নয়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশ মিনারেল, অয়েল এন্ড গ্যাস করপোরেশন (বিএমওজিসি) গঠন করা হয়। পরবর্তীতে, বাংলাদেশ মিনারেল, অয়েল এন্ড গ্যাস করপোরেশন (বিএমওজিসি)-কে বাংলাদেশ অয়েল এন্ড গ্যাস করপোরেশন (বিওজিসি) নামে পুনর্গঠন করা হয় এবং ১৯৭৪ সালের ২২ আগস্ট রাষ্ট্রপতির আদেশ নং ১৫ এর মাধ্যমে বিওজিসি’কে ‘পেট্রোবাংলা’ নামে সংক্ষিপ্ত নামকরণ করা হয়।

 

দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে জ্বালানি তেল একটি অপরিহার্য পণ্য। দেশের কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রার বিরাট একটি অংশ ব্যয় হয় জ্বালানি তেল আমদানি খাতে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা উত্তরকালে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং স্বনির্ভরতার লক্ষ্যে যে সকল দূরদর্শী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন তন্মধ্যে ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ অ্যাবানড্যান্ড প্রোপার্টি আদেশ (পিওনং ১৬, ১৯৭২) এর মাধ্যমে পাকিস্থান ন্যাশনাল ওয়েল কোম্পানি লিঃ, দাউদ পেট্রোলিয়াম লিমিটেড, ইস্টার্ণ রিফাইনারি লিমিটেড, বার্মা ইস্টার্ণ লিঃ, ইত্যাদি অধিগ্রহণের মাধ্যমে জ্বালানি তেল খাতকে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে আনা ছিল অন্যতম। ১৯৭৫ সালের ১৪ মার্চ The ESSO Undertakings Acquisition Ordinance, 1975 এর মাধ্যমে বাংলাদেশে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের ESSO Eastern Inc.-কে সরকারিভাবে গ্রহণ করে জ্বালানি তেলের মজুদ, সরবরাহ ও বিতরণে এবং সক্ষমতা অর্জনে যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।

 

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিশ্বাস করতেন বঙ্গোপসাগর আমাদের জন্য একটি আশীর্বাদ। এ বিশ্বাস থেকেই ১৯৭৪ সালে পাশ করিছিলেন “The Territorial Waters and Maritime Zones Act, 1974” যা এ অঞ্চলে সমূদ্র সংক্রান্ত প্রথম আইন। এর ধারাবাহিকতায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় সমুদ্রে আমরা অর্জন করেছি এক লক্ষ ১৮ হাজার আটশত ১৩ বর্গ কিলোমিটার এলাকা। এখানকার সম্পদ সম্ভাবনার অপার দ্বার উম্মোচন করবে। এ জন্য জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অধীন ‘ব্লু ইকোনমিসেল’ গঠন করা হয়েছে। এ সেল সমুদ্রে গবেষণার পাশাপাশি অন্যান্য দপ্তর ও সংস্থার সাথে সমন্বয় করবে।

বঙ্গবন্ধুর জ্বালানি নীতি অনুসরণ করে বর্তমান সরকার দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, নতুন নতুন জ্বালানির উৎস উদ্ভাবন, জ্বালানি সমৃদ্ধ দেশসহ আঞ্চলিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের মাধ্যমে দেশকে উন্নয়নের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

 

সরকারের বিভিন্ন বাস্তবমুখী পরিকল্পনা গ্রহণ ও কর্মকাণ্ডের ফলে দেশের দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও জীবন যাত্রার মানউন্নয়নের সাথে জ্বালানির চাহিদাও দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। জ্বালানির ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে সরকার দেশজ জ্বালানি প্রাকৃতিক গ্যাস, কয়লা আহরণ ও উৎপাদন এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির জন্য ব্যাপক পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করছে।

 

বাপেক্স গ্যাস/তেল অনুসন্ধানও খনন কার্যক্রমের পাশাপাশি সালদা নদী, শাহবাজপুর, ফেঞ্চুগঞ্জ, সেমুতাং, বেগমগঞ্জ, গ্যাস ক্ষেত্র থেকে দৈনিক প্রায় ১১৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন করছে। বাপেক্স কর্তৃক আবিষ্কৃত এ সকল গ্যাসক্ষেত্রে ১.৬ টিসিএফ গ্যাস মজুদ রয়েছে। সিংগেল পয়েন্ট মুরিং, ইআরএলইউনিট-২, এলএনজি টার্মিনাল, এলপিজি টার্মিনাল, তেল সঞ্চালন পাইপলাইন প্রভৃতি চলমান প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে জ্বালানি খাতে দৃশ্যমান পরিবর্তন পরিলক্ষিত হবে। তাছাড়া অটোমেশন কার্যক্রম জ্বালানি খাতকে আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক ব্যবস্থাপনার সাথে সংযুক্ত করবে।

 

এক নজরে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ (২০০৯-২০২০) এর অর্জনগুলো মধ্যে হলো- ২০০৯ সালে দৈনিক প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ করা হতো ১৭৪৪ মিলিয়ন ঘনফুট থেকে ২০২০ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৩৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট; ২০০৯ সালে এলএনজি আমদানি ক্ষমতা শূন্য থেকে ২০২০ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ১০০০ এমএমসিএফডি; ২০০৯ সালে গ্যাসক্ষেত্র ২৩টি থেকে ২০২০ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ২৭টি; ২০০৯ সালে গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন নির্মাণ ২০২৫ কিঃমিঃ থেকে ২০২০ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ২৮৮৭ কিঃমিঃ; ২০০৯ সালে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান দ্বিমাত্রিক জরিপ থেকে ২০২০ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ২,৬৮০ লাইন কিঃমিঃ; ২০০৯ সালে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ত্রিমাত্রিক জরিপ থেকে ২০২০ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৭৬৬ বর্গকিঃমিঃ; ২০০৯ সালে ভূ-তাত্ত্বিক জরিপ থেকে ২০২০ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৫৫৭ লাইন কিমিঃ; ২০০৯ সালে জ্বালানি তেল সরবরাহ থেকে ২০২০ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৪০.৪৩ লক্ষ মেঃটন; ২০০৯ সালে জ্বালানি তেল মজুদক্ষমতা থেকে ২০২০ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৩০ দিন (৯ লক্ষ মেঃটন); ২০০৯ সালে এলপিজি সরবরাহ থেকে ২০২০ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৪৫ হাজার মেঃটন; ২০০৯ সালে এলপিজি সরবরাহকারী কোম্পানি থেকে ২০২০ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৫টি; ২০০৯ সালে এলপিজি‘রমূল্য (১২ কেজি) থেকে ২০২০ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ১৪০০ টাকা।

 

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি, প্রেট্রোল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, কয়লা উৎপাদন বৃদ্ধি, তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের বহুমুখী ব্যবহার, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি, দ্বি-পাক্ষিক বা বহু-পাক্ষিক সম্পর্কের আওতায় ও আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধির মাধ্যমে জ্বালানি চাহিদা ও যোগান এর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে। বৈশ্বিক মহামারি কারোনার প্রভাব জ্বালানি খাতে পড়েনি বললেই চলে। ফলে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে। শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন তেল-গ্যাস বা বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যাচ্ছে। বর্তমান সরকার ঘোষিত রূপকল্প-২০২১ (মধ্যম আয়ের দেশ), রূপকল্প-২০৪১ ( সমৃদ্ধ বাংলাদেশ), নির্বাচনি অঙ্গীকার, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি), পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ও বদ্বীপ পরিকল্পনা বাস্তবায়নকল্পে সরকারের নির্দেশনা মোতাবেক জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ ও এর আওতাধীন প্রতিষ্ঠানসমূহ নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। বৈশ্বিক মহামারি কোভিড-১৯ এর সংক্রামণের প্রেক্ষিতেও জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ ২০২০-২১ অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে  ১০৪.২৭% বাস্তবায়ন করেছে। কোভিড মহামারির মধ্যেও রূপকল্প-২০৪১ নির্দেশিতভাবেই বাংলাদেশ এগিয়ে চলছে। যার যার উপর অর্পিত দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে পালন করলে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা সুনিশ্চিত হয়ে রূপকল্প-২০৪১ নির্ধারিত সময়ের পূর্বেই বাস্তবায়িত হয়ে বাংলাদেশ হবে – সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।

 

–   পিআইডি ফিচার