Home মতামত একটি দারিদ্র্যশূন্য দেশ

একটি দারিদ্র্যশূন্য দেশ

190
0
SHARE

 

ইমদাদ ইসলাম।।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের সময় দারিদ্র্যের হার ছিল ৮০ শতাংশ। আর ২০১৯ সালে বাংলাদেশের সাধারণ দারিদ্র্যের হার ২০.৫% এবং চরম দারিদ্র্যের হার ১০.৫%। দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে আমাদের এ অগ্রগতি  বিশ্বকে চমকে দিয়েছে। দারিদ্র্যমোচনে বাংলাদেশ এখন বিশ্ববাসীর কাছে রোল মডেল। দারিদ্র্য নিরসনে এই অগ্রগতি ধরে রেখে সরকার  ২০৪১ সালের মধ্যে  বাংলাদেশকে দারিদ্র্যমুক্ত করার  লক্ষ্য  নির্ধারণ করেছে। সরকার নির্ধারিত রূপকল্প ২০৪১ এর লক্ষ্য হলো ২০৩১ সালের মধ্যে চরম দারিদ্র্য নির্মূল করা (৩% এর কম) এবং ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি উচ্চ- আয়ের দেশে উন্নীত করা, যেখানে দারিদ্র্য হবে নিম্নতম(৫% এর কম)। সরকারে লক্ষ্য হলো ২০৪১ সালের মধ্যে সকল কর্মক্ষম নাগরিক তাদের কর্মসংস্থান থেকে প্রাপ্ত আয় দিয়ে জীবনধারনের ন্যূনতম মান বজায় রাখতে পারবে এবং যাঁরা বার্ধক্য বা দৈহিক সামর্থ্যের অভাবে শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ করতে পারবে না তাদেরকে সরকার সামাজিক সুরক্ষা বেষ্টনীর আওতায় নিয়ে আসবে। এখানে যারা দারিদ্র্য হিসেবে বিবেচিত হবে তাদের জীবনধারণের ন্যূনতম মান বজায় রাখার জন্য  প্রয়োজনীয় সামগ্রী ক্রয়ের জন্য পর্যপ্ত অর্থের ব্যবস্থা সরকার করবে। এটি অর্জনের ক্ষেত্রে  চ্যালেঞ্জগুলো ব্যাপক এবং ঝুঁকি ও প্রচুর।

আমাদের দেশে গ্রাম ও শহরের দারিদ্র্য দ্রুত কমছে।সাধারণ দারিদ্র্যের তুলনায় চরম দারিদ্র্য অধিকতর দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে।তবে দেশের পূর্বাঞ্চলের তুলনায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে দারিদ্র্য এখনো বেশি। রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের দারিদ্র্য নিরসনে হার কম।ঢাকা ও চট্টগ্রামের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শ্রম ও পণ্যের চলাচল, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার সুযোগ দেশের অন্য অঞ্চল থেকে অনেক বেশি হওয়ায় দারিদ্র্যের হার এখানে কম। বৈদেশিক রেমিট্যান্সের উপকারভোগী পরিবারের সংখ্যাও বেশি। জাতীয় পর্যায়ে দেশের অভ্যন্তরে গ্রামাঞ্চল থেকে শহরাঞ্চলে অভিবাসন দারিদ্র্য নিরসনে সহায়তা করে। এতে অভিবাসীদের কাজের সুযোগ সৃষ্টিসহ বেশি আয়ের সুযোগ তৈরি হয়।তবে অপরিকল্পিতভাবে নগরায়ণের কারণে রাজধানী ঢাকাসহ এর চারপাশের জেলা বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর  ও নরসিংদীর উপর চাপ পড়েছে বেশি। এখানে আবাসন, পরিবহণ, পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন ও পয়ঃনিষ্কাশনসহ অবকাঠামোগত অন্যান্য সমস্যা রয়েছে। দারিদ্র্য নিরসনে এগুলো গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ইতিমধ্যে সরকার গ্রহণ করছে। পশ্চমাঞ্চলের শহরগুলোতে নগর সেবা সেভাবে গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। সরকার পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোর মধ্যে শ্রম ও পণ্যের চলাচল ব্যবস্হার উন্নতির লক্ষ্য ব্যাপক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। পদ্মা সেতু এধরনের একটি কৌশলগত বিনিয়োগ যা উন্নয়নকে বেগবান করবে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ এ অঞ্চলের দারিদ্র্য নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। সরকার দেশের সকল অঞ্চলের উন্নয়নকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে প্রতিটি উপজেলা থেকে বছরে এক হাজার কর্মী বিদেশে পাঠানোর পরিকল্পনা করেছে। এতে করে রেমিট্যান্স প্রবাহ দেশের সকল অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়বে। রেমিট্যান্স সুবিধা প্রাপ্ত পরিবারের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে যা দারিদ্র্য নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। গত পাঁচ দশকে ১ কোটি ৩০ লাখ শ্রমিক বাংলাদেশ থেকে বিদেশে গেছে। এর অধিকাংশই দেশের পূর্বাঞ্চলের। ২০২৫ সালের মধ্যে বৈদেশিক কর্মসংস্থানের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৩২ লাখ ৫০ হাজার। এখাতে দক্ষ জনবল তৈরির লক্ষ্যে ৬৪টি টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার (টিটিসি) ও ৬টি ইনস্টিটিউট অব মেরিন টেকনোলোজি (অব এমটি) চালু রয়েছে। এছাড়াও উপজেলা পর্যায়ে আরো ৪০টি টিটিসি নির্মাণের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এগুলো চালু হলে দক্ষ কর্মী বাহিনী তৈরির কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এখানে উল্লেখ প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স দেশের জিডিপিতে ১২ শতাংশের মতো অবদান রয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ দারিদ্র্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে।জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত জেলা এবং দুর্যোগপ্রবন জেলাগুলোতে দারিদ্র্যের হার বেশি। এসব জেলার জনগণ শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও তথ্যের অভাবে শ্রম বাজারে অংশ গ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়।এছাড়াও এসব জেলার জনগণের পক্ষে অভিবাসনের উচ্চ ব্যয় নির্বাহ করা সম্ভব হয় না।ফলে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় দারিদ্র্যমোচন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। দেশের ১৫ টি দরিদ্রতম জেলার অধিকাংশই বন্যা, নদী ভাঙ্গনসহ জলবায়ু পরিবর্তনের স্বীকার।

কৃষিতে কর্মসংস্থান দিনদিন কমছে।এখানে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও  যান্ত্রিকায়নের ফলে উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে, খরচ কমছে।অন্যদিকে কৃষিতে প্রকৃত মজুরি বৃদ্ধি পাচ্ছে যা দারিদ্র্য নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। খামার বর্হিভূত বিকল্প কর্মসংস্থান ও  আয় বৃদ্ধি পাওয়ায় গ্রামাঞ্চলে অর্থের যোগান বৃদ্ধি পাচ্ছে যা দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। তৈরি পোশাকখাত দারিদ্র্য নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। শ্রমঘন এরকম আরো কিছু ম্যানুফ্যাকচারিং খাত
দারিদ্র্য নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এসব খাতের দক্ষ জনবলকে পরিবর্তনশীল প্রযুক্তি ও কর্মসংস্থান কাঠামোর সাথে সমন্বয়ের মাধ্যমে চলতে হবে। এজন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা আয়ত্তে আনতে হবে। সবচেয়ে কঠিন হবে দরিদ্র্য জনগোষ্ঠীকে মানব সম্পদে পরিণত করা। সরকার ইতিমধ্যে শহরের সুবিধা গ্রামে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ২০২৫ সালের মধ্যে দেশে ৮০ লাখ ৫০ হাজার নতুন কর্মসংস্থানের ব্যবস্থার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে, যা দারিদ্রমোচনে ভূমিকা রাখবে। সরকার দেশের সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে। দেশের ভৌগলিক অবস্থানগত এবং

পারিপার্শ্বিক  কারণে যে অঞ্চলগুলো পিছিয়ে রয়েছে সে অঞ্চলের উন্নয়নের জন্য বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। অবকাঠামো উন্নয়নসহ শ্রমঘন শিল্প স্হাপনের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে দারিদ্র্য নিরসনের চেষ্টা করা হচ্ছে। প্রান্তিক মানুষ যাতে দারিদ্র্যের জালে জড়িয়ে না পড়ে সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া হচ্ছে। আয় বৈষম্য মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। এটি চলমান এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। পার্বত্য জেলার প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, হিজড়া সম্প্রদায়, জাতিগত সংখ্যালঘু, প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠী, যৌনকর্মী, পথশিশু, বেদে সম্প্রদায়, বস্তিবাসী, চরাঞ্চলবাসী ইত্যাদি যারা মূলধারা বাইরে আছে তাদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য সরকারের বিশেষ পরিকল্পনা রয়েছে। বিগত পরিকল্পনাগুলোতে সমাজের সবচেয়ে দুর্বল অংশের  উন্নয়নে সামাজিক সুরক্ষার দৃষ্টিতে দেখা হতো। রূপকল্প ২০৪১ এ সমৃদ্ধি অর্জনে কেউ পিছিয়ে থাকবে না সবাইকে নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ হবে একটি উন্নত দেশ, যেখানে মাথাপিছু আয় হবে ১২,৫০০ মার্কিন ডলারেরও বেশি। বাংলাদেশ হবে সোনার বাংলাদেশ,যেখানে দারিদ্র্য হবে সুদূর অতীতের ঘটনা। আর এর সুফলভোগী হবে জনগণ এবং এরাই হবে প্রবৃদ্ধি ও রূপান্তর প্রক্রিয়ার প্রধান চালিকাশক্তি।

একটি আধুনিক উন্নয়নশীল রাষ্ট্র হিসেবে ইতিমধ্যে বিশ্ব দরবারে পরিচিতি পেতে শুরু করেছে বদলে যাওয়া বাংলাদেশ।

বর্তমান সরকার ক্ষুধা দারিদ্র্যমুক্ত উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল দেশটি আত্মনির্ভরশীল হবে।মানুষ দুবেলা আহার পাবে, মাথার উপর চাল থাকবে, শিক্ষিত হবে, সব মানুষের কর্মসংস্থান ও সুস্বাস্থ্য থাকবে এবং সমাজে সংহতি থাকবে। দেশ এখন সেদিকেই যাত্রা করছে। কোভিড-১৯ বৈশ্বিক মহামারির একটি সংকটময় সময় অতিক্রম করছি আমরা। এ ভাইরাসের কারণে জনস্বাস্থ্য ও জনজীবন নানা সংকটের মুখোমুখি। সরকার দক্ষতার সাথে মোকাবিলা করছে এই বৈশ্বিক মহামারি কোভিড-১৯। এই মহামারি মোকাবিলায় সরকারের অনেক পরিকল্পনা সময়মতো বাস্তবায়নে সমস্যা হচ্ছে। কিন্তু এটা সাময়িক, বাংলাদেশ তার নিজস্ব পরিকল্পনা মাফিক লক্ষ্য অর্জনে এগিয়ে যাবে। ২০৪১ এ একটি দারিদ্র্যশূন্য দেশ হবে বাংলাদেশ, জ্ঞান বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ হয়ে বঙ্গবন্ধুর আজীবন লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়ন করাই হবে মুজিব শতবর্ষে দেশবাসীর অঙ্গীকার।

image_print