Home মতামত সমুদ্র আর ভূমিতে ভালো- অবৈধ অর্থ ও অস্ত্রে লাগাম টানো

সমুদ্র আর ভূমিতে ভালো- অবৈধ অর্থ ও অস্ত্রে লাগাম টানো

169
0
SHARE

এসডিজি বিষয়ক বিশ্লেষণধর্মী বিশেষ প্রতিবেদন-২

আফজাল হোসেন লাভলু।।এসডিজি ১৬ বাস্তবায়নে সরকার সমুদ্র শাসনে আর অবৈধ ভূমিতে উদ্বারে ভালো কাজ করছে অন্যদিকে অবৈধ অর্থ ও অস্ত্র বন্ধে এখনই কার্যকরি পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় এসডিজিতে সরকারের অব্যাহত সফলতা কোনো কাজে আসবে না। অভিষ্ট ১৬ এর ৪ নাম্বার সূচক বিশ্লেষনে দেখা যায়, সমুদ্র জয়, বেখল হওয়া সরকারি সম্পত্তি উদ্বারে সরকার সফল হলেও অর্থ পাচার ও অবৈধ অস্ত্র নিয়ন্ত্রনে এখনো লাগামহীন অবস্থা। এই অবস্থা উত্তরণে সরকারের আরো কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। এসডিজি বিষয়ক জাতীয়,আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে এসব জানা গেছে।

শুরুটা ১৯৮৭ সালে। ব্রুটল্যান্ড কমিশন রিপোর্টে প্রথম টেকসই উন্নয়নের কথা আলোচনায় আসে। ২০০০ সালে এসে ‘মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল’ বা এমডিজি তৈরি হয়। শেষ হয় ২০১৫ সালে। বাংলাদেশ সেখানে ৮টি ক্ষেত্রে সফলতা লাভ করে। ধরিত্রির জন্য টেকসই উন্নয়ন নিয়ে জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলো ২০১৬ সালে তৈরি করে ‘সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল’ বা এসডিজি। সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজির ১৭টি লক্ষ্য ও ১৬৯ টার্গেট পূরণ করতে হবে। এরই মধ্যে কেটে গেছে পাঁচ বছর। চার বছর আগে অর্থাৎ ২০১৭ সালের সূচকে ১৫৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ছিল ১২০তম অবস্থানে। ২০১৫ সালের পর থেকে এসডিজি সূচকে স্কোরের দিক দিয়ে সবচেয়ে বেশি এগিয়েছে বাংলাদেশ। এসডিজি সূচকে ১শ’র মধ্যে বাংলাদেশের স্কোর ৬৩.৫। এক বছর আগে এই স্কোর ছিল ৬৩.২৬, তার আগের বছর ছিল ৬৩.০২। জাতিসংঘের সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট সলিউশনস নেটওয়ার্ক (এসডিএসএন) চলতি বছরের জুন মাসে তাদের প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এসডিজির ১৭ টি অভিষ্টের মধ্যে অভীষ্ট ১৬তে বলা হয় শান্তি, ন্যায়বিচার এবং কার্যকর প্রতিষ্ঠান অর্থাৎ টেকসই উন্নয়নের জন্য শান্তিপুর্ন ও অন্তভুক্তিমূলক সমাজ ব্যবস্থার প্রচলন, সকলের জন্য ন্যায়বিচারের পথ সুগম করা এবং সকলস্তরে কার্যকর, জবাবদিহিপূর্ন অন্তভুক্তিমূলক প্রতিষ্টান বিনির্মানের কথা। এই অভিষ্টের অন্তর্গত সূচক ৪ এ বলা হয় ২০৩০ সালের মধ্যে অবৈধ অর্থ ও অস্ত্র প্রবাহ উল্লেখযোগ্য হারে কমানো, অপহৃত সম্পদের পুনরুদ্ধার ও প্রত্যার্পণ প্রক্রিয়া শক্তিশালী করা এবং সকল প্রকার সংঘবদ্ধ অপরাধ মোকাবেলা করার কথা। এসডিজির এই সুচকে অনেকগুলো বিষয় এক সাথে নির্ধারিত ২০৩০ সালের মধ্যে করতে হবে। যার জন্য বৈশি^ক ঐক্যমত ও প্রতিবেশি দেশগুলোর সহযোগীতা প্রয়োজন হবে। অবৈধ অস্ত্রউদ্বার করতে আইন শৃংখলা বাহিনীর তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়। বিশেষতঃ গত পাঁচ বছরে উগ্রবাদ ও চরমপন্থী দমনে আইন শৃংখলা বাহিনী তৎপর রয়েছে। অবৈধ অর্থ লেনদেন চালু রয়েছে, অন্যদিকে সরকার আন্তর্জাতিক আদালতের মামলায় ভারতের কাছ থেকে সমুদ্র সীমানা উদ্বার। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অর্পিত সম্পত্তি, বাংলাদেশ রেলওয়ে বে-দখল হওয়া সম্পত্তি, অবৈধভাবে নদী-খাল দখল সহ সরকারি খাস সম্পত্তি উদ্বার করে সরকার সফলতার পরিচয় দিয়েছে।

অর্থ পাচারঃ লাগাম ছাড়া ঘোড়া

বেশ কিছু কারণে আর নতুন নতুন পদ্বতি ব্যবহার করে দেশ থেকে বিদেশে অর্থ পাচার হয়ে থাকে। ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদরা ছাড়াও বিদেশিরা ও বাংলাদেশ থেকে টাকা পাচার করে। ঠিক কবে থেকে টাকা পাচার শুরু হয়েছে তার কোন গবেষণা ও তথ্য না থাকলেও ধরে নেয়া হয় বিদেশে ছেলে-মেয়েদের স্থান করে দেয়ার প্রবণতা থেকে, ৭০-এর দশকে অর্থপাচার শুরু হয়। আর সর্বশেষ পদ্বতি হিসেবে ই কমার্সের মাধ্যমে বিদেশে অর্থ পাচার করা হয়। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এর গবেষণা প্রতিবেদন মতে, বিদেশিরা বছরে পাচার করে ২৬ হাজার কোটি টাকা। চলতি বছরের মার্চ মাসে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি (জিএফআই) বাংলাদেশ থেকে বছরে গড়ে ৬৪ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়ে যায়। প্রতিবেদনে বলা হয় বাংলাদেশের মোট বানিজ্যের প্রায় ১৯ শতাংশ কোন না কোনভাবে বিদেশে পাচার হয়। সে হিসেবে ২০১৬ থেেক ২০২০ সাল র্পযন্ত পাঁচ বছরে পাচার হয়েেছ তিন লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা। ওভার ইনভয়েসিং আর আন্ডার ইনভয়েসিং এই দুটি উপায়ে অর্থ পাচারের কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। চলতি বছরের ২০ অক্টোবর আদালতে দেয়া এক তদন্ত প্রতিবেদনে ১২ ব্যক্তি ও একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ৩১০ কোটি ৮০ লাখ ১৪ হাজার ৭৪৮ টাকা বিদেশে পাচারের তথ্য জানায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এ ছাড়া ২০১৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির মামলার বিষয়ে বলা হয়, অজ্ঞাত হ্যাকাররা ১০১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার হাতিয়ে নিয়েছিল। তার মধ্যে ফিলিপাইন ও শ্রীলঙ্কা থেকে ৩৪ দশমিক ৬১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার উদ্ধার করা হয়েছে। দুটি দেশেই অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট পাঠানো হয়েছে এবং মামলা এখনো তদন্তাধীন রয়েছে। পরিস্থিতি এতোটাই লাগাম চাড়া যে, সম্প্রতি দেশের উচ্চ আদালত অর্থ পাচারের তথ্য চেয়ে রুল জারি করে। আদালত বলে, পানামা পেপারস ও প্যারাডাইস পেপারসে কাদের নামে এসেছে, অন্তত সেই নামগুলো আমরা জানতে চাই। তবুও লাগামহীন ঘোড়ার মত চলছে অর্থ পাচার।

বাংলাদেশ সরকার ২০০২ সালে মানিলন্ডারিং আইন এবং ২০১২ সালে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন পাশ করে। এই আইনে ২৮টি উপায়ে অর্থ ও সম্পত্তি অর্জন বা সম্পত্তি স্থানান্তর কে অপরাধ বলা হয়েছে। আইনে উল্লেখিত এ সকল অপরাধের জন্য চার থেকে বার বছর পর্যন্ত কারাদন্ড এবং দশ থেকে বিশ লক্ষ টাকা অর্থদন্ড অথবা উভয় দন্ডের বিধান রাখা হয়েছে। আইনে বাংলাদেশ ব্যাংককে ক্ষমতা প্রদান করে, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সশিয়াল ইেেন্টলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) গঠন করা হয়েছিল। বিএফআইইউ ২০১৯-২০২০ সালে অর্থ পাচারের ১১৬টি ঘটনা চিহ্নিত করে। আইনি জটিলতা, তদন্তে দীর্ঘসূত্রীতা, আদালতে আসামি পক্ষের সময়ক্ষেপণ, সমন্বয়ের অভাব এবং উচ্চ আদালতে স্থগিতাদেশ থাকা সহ নানা জটলিতার কারণে পাচার হওয়া টাকা ফেরত আনা যায় না। ফলে সরকার ২০১৫ সালের ২৬ নভেম্বর সরকার ‘মানিলন্ডারিং প্রিভেনশন অ্যাক্ট সংশোধন করে দুদকসহ মোট পাঁচটি সংস্থা কে মামলা তদন্তের দায়িত্ব দেয়। বাণিজ্যের আড়ালে বিদেশে অর্থপাচারকে উচ্চ ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করে গত বছরের ১০ ডিসেম্বর দেশের সব ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের কাছে একটি নির্দেশনা পাঠায় বাংলাদেশ ব্যাংক।

অবৈধ অস্ত্রঃ দস্যুবাহিনীর পুনর্বাসন

বাংলাদেশের ৩ দিকে ভারত আর একদিকে মিয়ানমার সীমান্ত। একসময় এসব এলাকায় সন্ত্রাসি কর্মকান্ড চলত আর অবৈধ অস্ত্রসরবারহের নিরাপদ রুট হিসেবে বাংলাদেশকে ব্যবহার করত। বিগত এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে নিষ্ঠুর রাজনৈতিক কাজে অস্ত্রের ব্যবহার ছিল বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে গ্রেনেড হামলা ও গুলিবর্ষনের ঘটনা। ২০০৪ সালের ২১ অগাস্ট গ্রেনেড হামলা চালিয়ে ২৪ জনকে হত্যার ওই ঘটনা স্তব্ধ করে দেয় জাতিকে। রাজনৈতিক কর্মকান্ডে গ্রেনেড ও একে ৪৭ এর মতো ভারি অস্ত্রের ব্যবহার ইতিপুর্বে এদেশে হয়নি। চট্টগ্রাম ইউরিয়া সার কারখানার ঘাটে ২০০৪ সালের ১ এপ্রিল রাতে সন্ত্রাসী সংঘঠন উলফার আট ট্রাক অস্ত্র আটকের ঘটনা ছিল ব্যাপক আলোচিত । বর্তমান সরকারের প্রচেষ্টায় এখন নিত্য-নতুন আর অত্যাধুনিক অস্ত্রপরিবহন না থাকলেও অস্ত্রর সবারহ রয়েছে। সম্প্রতি অনুষ্টিত ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে পাঁচজন নিহতের পর দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনে দেশের বিভিন্ন স্থানে অস্ত্রের ব্যবহার দেখা যায়। দ্বিতীয় ধাপের ইউপি নির্বাচন ঘিরে ১২ জেলায় সংঘাত, সংঘর্ষ ও গোলাগুলিতে ২৪ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে অতি সম্প্রতি। এর মধ্যে নরসিংদী, মাগুরা, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা ও কক্সবাজার এই পাঁচ জেলায় গুলিতে নিহত হয়েছেন ১৬ জন।

বাংলাদেশে কী পরিমাণ অবৈধ অস্ত্র রয়েছে তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। তবে, ২০১৭ সালের এক হিসেবে দেখা যায়, মোট বৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের সংখ্যা ১৮৫০০০ টি। আর উদ্বারকৃত আগ্নেয় অস্ত্রের মধ্যে শুধুমাত্র ২০১৯ সালের জুলাই থেকে জুন ২০২০ পর্যন্ত র‌্যাপিড এ্যকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব), বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও বাংলাদেশ কোস্টগার্ড মোট ৯৭৫টি ছোট-বড় দেশি-বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র ও ৯৫২৭টি তাজা গুলি উদ্বার করে। যার মধ্যে রয়েছে পিস্তল, রিভলবার ও বন্দুক। বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টনারশিপ সেন্টার বিডিপিসির গবেষণা সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশে অবৈধ অস্ত্রের ১২৮টি সিন্ডিকেট রয়েছে। দেশে অবৈধ অস্ত্র রয়েছে ৪ লাখের মতো। বাংলাদেশে প্রতি বছর ৫০০ কোটি টাকার অবৈধ অস্ত্র নিয়ে আসে আন্তর্জাতিক চোরাচালানকারীরা। অর্থনীতিবিদদের মতে শুধু মাত্র জলদস্যুতার কারণে বছরে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার আর্থিক ক্ষতি হয়। গত তিন দশকে সুন্দরবন এলাকায় নানা সশস্ত্র গোষ্ঠী সক্রিয় ছিল। গত পাঁচ বছরে সরকার অবৈধ অস্ত্রউদ্বার ও অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার কারীদের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনতে বিভিন্ন উদ্দ্যোগ গ্রহন করে। যার মধ্যে অন্যতম ছিল দস্যু ও মাদক ব্যাবসায়ীদের কাছ থেকে অস্ত্র উদ্বার ও তাদের পুনর্বাসন করা। ২০১৬ সালের ৩১ মে সুন্দরবনের সবচেয়ে বড় দস্যুদল ‘মাস্টার বাহিনী’ আত্মসমর্পণ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে। বাগেরহাট ও মংলা এলকায় ২০১৬ সালের ১৬ জুলাই, মজনু বাহিনী’র ৯ জন এবং ইলিয়াস বাহিনী’র ১১ জন দেশি-বিদেশি ২৫টি আগ্নেয়াস্ত্র ও এক হাজার ২০টি গুলি সহ আত্বসমর্পন করে। ২০১৬ সালের ২৮ নভেম্বর, সুন্দরবনের খোকাবাবু বাহিনীর ১২ জন ২২টি আগ্নেয়াস্ত্র ও এক হাজারেরও বেশি গুলিসহ আত্মসমর্পণ করে। ২০১৮ সালের ২০ অক্টোবর সশস্ত্র ৪৩ জন জলদস্যু আত্মসমর্পণ করে। টেকনাফে আত্মসমর্পণ করেন ১০২ জন ইয়াবা ব্যবসায়ী। ২০১৯ সালের ২৩ নভেম্বর কক্সবাজারের মহেশখালীর ১২টি বাহিনীর ৯৬ জন জলদস্যু ও অস্ত্র কারিগর আত্মসমর্পণ করে। তারা দেশি-বিদেশি ১৫৫টি আগ্নেয়াস্ত্র, ২৮৪ রাউন্ড গুলি ও অস্ত্র তৈরির বিভিন্ন প্রকার সরঞ্জাম জমা দেয়। ২০২০ সাল পর্যন্ত একে একে দস্যুতা ছেড়ে ফিরে আসে প্রায় ৪০টি সশস্ত্র দস্যুবাহিনী। এ পর্যন্ত প্রায় চার শতাধিক বনদস্যু-জলদস্যু আত্মসমর্পণ করে। জমা দেয় ৫০০টি আগ্নেয়াস্ত্র ও প্রায় ৩০ হাজার গুলি।

১৯৭৮ সালের আর্মস অ্যাক্ট এবং ১৯২৪ সালে আর্মস রুলস এর আওতায় বৈধ আগ্নেয় অস্ত্রের লাইসেন্স দেয়া হয়। আইনে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত আত্বরক্ষায় ব্যক্তিগত আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, বৈধ অস্ত্র ব্যবসার আড়ালে অবৈধ অস্ত্র কেনাবেচার। লাইসেন্সকৃত বৈধ আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে গুলি চালিয়ে মানুষ হত্যার ঘটনা ঘটেছে সাম্প্রতিক সময়ে। কয়েক বছর আগে এক সাংসদের ছেলে রাজধানীর নিউ ইস্কাটনে যানজটে পড়ে এলোপাতাড়ি গুলি চালিয়েছিলেন, আর তাতে এক রিকশাচালক ও এক অটোরিকশা চালক গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। একই বছরের গাইবান্ধার এক সাংসদ শিশু সৌরভকে গুলি করে হত্যা করে। এসব দিক বিবেচনায় সরকার বৈধ অস্ত্র ব্যবহার সীমিত রাখতে সর্বশেষ ২০১৬ সালে নীতিমালা তৈরি করে। নতুন নীতিমালায় বলা হয়েছে, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে ছয়টির বেশি লাইসেন্স দেওয়া যাবে না।

বাংলাদেশ এনজিওস নেটওয়ার্ক ফর রেডিও এন্ড কমিউনিকেশন (বিএনএনআরসি) প্রধান নির্বাহি কর্মকর্তা এএইচএম বজলুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্বি, আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতের মাধ্যমে ভারতের কাছ থেকে বাংলাদেশ ১৯ হাজার বর্গ কিলোমিটার এলাকা কে সমুদ্রসীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে, এটি একটি বড় সফলতা। বাণিজ্যের আড়ালে অর্থপাচার রোধে বাংলাদেশ ব্যাংক ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড একটি টাস্কফোর্স গঠন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে। তিনি আরো বলেন, একটি নির্ধরিত সময়ের মধ্যে অবৈধ অর্থ ও অস্ত্র প্রবাহ উল্লেখযোগ্য হারে কমানো সহয কাজ নয়, সেটি শুধু বাংলাদেশ সরকারের একার পক্ষেও সম্বভ নয়, অপরাপর বৈশি^ক নেতা ও রাষ্ট্রগুলোকে একই মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে ।

এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম, বাংলাদেশের আহ্বায়ক ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য জিএফআই প্রতিবেদনের সূত্র ধরে বলেন, বাংলাদেশ প্রতি বছর যে পরিমাণ অর্থ বৈদেশিক সাহায্য হিসেবে পায় সেটির প্রায় তিনগুণ টাকা পাচার হয়। বেশি দামের জিনিসকে কম দাম দেখিয়ে পাঠানো হচ্ছে এবং সেটার ভিত্তিতে কম টাকা দেশের ভেতরে আসছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত দাম দেখিয়ে রপ্তানি করা হলেও টাকা আদৌ দেশের ভেতরে আসেনি। তিনি আরও বলেন, এসডিজিতে অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অগ্রগতি অর্জন করলেও বিভাজিতভাবে দেখলে দেখা যাবে দলিত, প্রতিবন্ধী, দুর্গম এলাকার নাগরিক এবং শহরের অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের মানুষ তেমন সুযোগ পায়নি এখনো।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, কর ফাঁকি দেয় বড় বড় ব্যবসায়ীরা, তাদেরকে শতভাগ ট্যাক্সের আওতায় আনা দরকার। এইসব বিপুল আয়ের মানুষ কর ফাঁকি দিয়ে দেশের বাইরে অর্থ পাচার করছেন। একটি বড় সংখ্যার মানুষদেরকে এখনো করের আওতায় আনা যায়নি।

সম্প্রতি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এসডিজি পরিবিক্ষণ ও মুল্যায়নে উপাত্ত প্রস্তুত ও বিভাজনের কর্মপরিকল্পনা ও পদ্বতিগত নির্দেশিকা প্রকাশ করেছেন। সেখানে অভিষ্ট ১৬ এর অন্তর্গত ১২টি টার্গেট অর্জনে ২৪টি ইন্ডিগেটর নির্ধারণ করেছে। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে, এসডিজি-১৬ অর্জনে উল্লেখযোগ্য হারে দুর্নীতি কমানোর কথা বলা হয়েছে। ‘টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট: বাংলাদেশের অগ্রগতি প্রতিবেদন-২০২০’ শীর্ষক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কার্যকর বিচার ব্যবস্থায় জনসাধারণের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করাও মৌলিক চ্যালেঞ্জ। প্রতিবেদনটি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ‘শান্তি, ন্যায় বিচার ও কার্যকর প্রতিষ্ঠানের’ ক্ষেত্রে ছয়টি ঝুঁকি রয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে- বৈদেশিক উৎস থেকে সম্পদ সংগ্রহের ঝুঁকি।

জাতিসংঘের এসডিজি বিষয়ক প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়, বাংলাদেশ সহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে ১৬ অর্জন সহজ হবে না। কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়, পদ্বতিগত বিষয় বা সিস্টেমেটিক বিষয় সামাল দেয়া। অন্যদিকে সিপিডির বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য মনে করেন, সামগ্রিকভাবে এসডিজির ১৬ গোল অর্থাৎ প্রাতিষ্ঠানিক উন্নতি ও সুশাসনে অগ্রগতি না হলে উপরের ১ থেকে ১৫ নম্বর গোলের লক্ষ্য অর্জন হবে না। মুল্যায়ন করতে হলে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে ২০৩০ সাল পর্যন্ত।

এসডিজি ১৬ নিয়ে কাজ করছেন এমন সংঘঠনগুলো মনে করে, জাতীয় সংসদ. নির্বাচন কমিশন, পাবলিক সার্ভিস কমিশন, অডিট জেনারেল অফিস ও দুর্নীতি দমন কমিশন কে দক্ষ ও প্রভাবমুক্ত করতে হবে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন কে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে। সকল সরকারি প্রতষ্ঠানে জবাবদিহি নিশ্চিত করে, জনগনের কাছে দায়বদ্ব করতে হবে। একই সাথে আদালত ও আইনশৃংখলা বাহিনীর মাধ্যমে আইনের শাসন নিশ্চিত করা জরুরী। অন্যথায় ২০৩০ সালের মধ্যে অবৈধ অর্থ ও অস্ত্র প্রবাহ উল্লেখযোগ্য হারে কমানো সহয কাজ হবে না, সেটি শুধু বাংলাদেশ সরকারের একার পক্ষেও সম্বভ নয়, অপরাপর বৈশি^ক নেতা ও রাষ্ট্রগুলোকে একই মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।

 

image_print