খেলাধুলা

রূদ্ধশ্বাস নাটকীয় জয় বাংলাদেশের 

খেলাধুলা ডেস্ক:

নানা নাটকীয়তার মঞ্চায়ন, পেন্ডুলামের মতোই দুলেছে ম্যাচের ভাগ্য। শুক্রবার সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে সিরিজের প্রথম টি২০ ম্যাচে সহজ জয়ের পথেই এগিয়ে যায় বাংলাদেশ। কিন্তু শেষ ওভারের নাটকীয়তায় জয় এসেছে ১ বল বাকি থাকতে। রূদ্ধশ্বাস লড়াইয়ের পর আফগানিস্তানকে দুই উইকেটে হারিয়েছে বাংলাদেশ। শেষ ওভারে ৫ উইকেট হাতে নিয়ে যখন ৬ রান দরকার প্রথম বলেই মিডিয়াম পেসার করিম জানাতকে বাউন্ডারি হাঁকান মেহেদি হাসান মিরাজ। হাতের মুঠোয় আসে জয়। কিন্তু মানুষ ভাবে এক, আর হয় আরেক।

 

ভাগ্য বিধাতা অবিশ্বাস্য এক নাটকের মঞ্চায়ন করেন। পর পর ৩ বলে অগোছাল শটে ক্যাচ দিয়ে সাজঘরে ফেরেন মিরাজ, তাসকিন আহমেদ ও নাসুম আহমেদ। আন্তর্জাতিক টি২০-তে ৫০তম হ্যাটট্রিকের গৌরব অর্জন করেন জানাত। ২ বলে ২ রান দরকার বাংলাদেশের। পঞ্চম বলে শরীফুল ইসলাম চার হাঁকিয়ে দর্শকদের হৃদকম্পনের অবসান ঘটান। সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় বাংলাদেশ। আগে ব্যাট করে আফগানিস্তান ২০ ওভারে ৭ উইকেটে ১৫৪ রান তোলে। জবাবে আফগান বিশ্বসেরা বোলিং লাইনআপের সামনে শুরুতে বিপর্যস্ত হলেও তাওহিদ হৃদয় ও শামীম পাটোয়ারীর দারুণ ব্যাটিংয়ে ১৯.৫ ওভারে ৮ উইকেটে ১৫৭ রান তুলে জয় পায় বাংলাদেশ।

আবহাওয়ার পূর্বাভাসে দেখা গেছে সিলেটে শুক্রবার রাতে যখন বৃষ্টি হবে তা বাগড়া দেবে ম্যাচের দ্বিতীয় ইনিংসের শুরু ও শেষদিকে। আর সেক্ষেত্রে পরে ব্যাট করা দলের জন্য টার্গেট কঠিন হয়ে যেতে পারে ডাকওয়ার্থ-লুইস মেথডে। এর পরও টস জিতে বাংলাদেশ অধিনায়ক সাকিব আগে ফিল্ডিংয়ের সিদ্ধান্ত নেন। কারণ ম্যাচ শুরুর আগে হওয়া বৃষ্টিতে পেসারদের সুবিধা থাকবে। সেটিই হয়েছে, বাংলাদেশের ৩ পেসার শুরুটা ভালোই করেছেন। যদিও বাঁহাতি স্পিনার নাসুম শুরু করেন আক্রমণ। তিনিই প্রথম সাফল্য এনে দেন। তৃতীয় ওভারে তিনি, চতুর্থ ওভারে ডানহাতি পেসার তাসকিন এবং পঞ্চম ওভারে বাঁহাতি পেসার শরীফুল আঘাত হেনেছেন। দুই বিধ্বংসী ওপেনার হজরতউল্লাহ জাজাই (১০ বলে ৮), রহমানউল্লাহ গুরবাজ (১১ বলে ১৬) ও ফর্মে থাকা ইব্রাহিম জাদরান (৬ বলে ৮) সাজঘরে ফেরেন। তিনজনই একটি করে ছক্কা হাঁকিয়েছেন। তাই দলীয় ৩২ রানেই তাদের বিদায়ে নিশ্চিতভাবে স্বস্তি নামে স্বাগতিক তাঁবুতে। আরও নিয়ন্ত্রণ নেয় বাংলাদেশ অষ্টম ওভারে জানাতকে (৯ বলে ৩) অধিনায়ক সাকিব শিকার করার পর। তবে একপ্রান্তে দারুন ব্যাটিং করছিলেন অভিজ্ঞ মোহাম্মদ নবি। টি২০ র‌্যাঙ্কিংয়ের ৩ নম্বর অলরাউন্ডার নবি পঞ্চম উইকেটে নাজিবউল্লাহ জাদরানের সঙ্গে ৩৫ রানের জুটি গড়ে শুরুর বিপর্যয় কাটিয়ে তোলেন। নাজিবউল্লাহ ২৩ বলে ৩ চারে ২৩ রান করেছেন। ১৫ ওভারে ৫ উইকেটে ৯৪ রান নিয়ে খুব বেশিদূর যাওয়ার সম্ভাবনা দেখাতে পারেনি আফগানরা। কিন্তু তখনো নবি ছিলেন ক্রিজে। তার সঙ্গে আজমতউল্লাহ ওমরজাই যোগ দিয়ে ঝড় তোলেন। পরের ৫ ওভারে বাংলাদেশের বোলাররা রীতিমতো হিমশিম খেয়েছেন। ওই ৫ ওভারে আর ২ উইকেট হারালেও ৬০ রান তোলে আফগানরা।

ওমরজাই মাত্র ১৮ বলে ৪ ছক্কা হাঁকিয়ে ৩৩ রান করে সাকিবের দ্বিতীয় শিকার হন ১৯তম ওভারের শেষ বলে। ৩১ বলে ৫৬ রানের দুর্দান্ত জুটি ভেঙে যায়। তিনি তাসকিনকে ১৭তম ওভারে ও সাকিবকে ১৯তম ওভারে ২টি করে ছক্কা হাঁকিয়েছেন। নবি শেষ ওভারে ক্যারিয়ারের পঞ্চম ফিফটি পান মুস্তাফিজুর রহমানকে চার হাঁকিয়ে। তিনি ৪০ বলে ৬ চার, ১ ছয়ে ৫৪ রানে অপরাজিত থাকেন। ২০ ওভারে ৭ উইকেটে ১৫৪ রান পায় আফগানরা। ১৪ রান করে আসে ১৭, ১৮ ও ১৯তম ওভারে। শেষ ওভারে আরও ১১- সব মিলিয়ে শেষের ৪ ওভারে ৫৩ রান খরচা করেন বাংলাদেশের বোলাররা। সাকিব সফলতম ৪ ওভারে ২৭ রান দিয়ে ২ উইকেট নিয়ে। ১৫৫ রানের টার্গেটে নামে বাংলাদেশ। প্রথম ওভারেই রনি তালুকদার একটি চার হাঁকিয়ে বোল্ড হন ফজলহক ফারুকীর বাঁহাতি পেসে। টি২০ র‌্যাঙ্কিংয়ে বিশ্বের দুই নম্বর এই বোলার বেশ ভুগিয়েছেন স্বাগতিক ব্যাটারদের। লিটন কুমার দাস ও নাজমুল হোসেন শান্ত অবশ্য ভালোই খেলছিলেন। কিন্তু ষষ্ঠ ওভারে শান্ত ১২ বলে ১ ছয়ে ১৪ রানে মুজিব উর রহমানের অফস্পিনে এবং সপ্তম ওভারে লিটন ১৯ বলে ২ চারে ১৮ রানে ওমরজাইয়ের শিকার হন। ৩৯ রানে ৩ উইকেট খুঁইয়ে বিপদে পড়ে বাংলাদেশ। এর পর বৃষ্টি নামলে কিছুক্ষণ বন্ধ থাকে খেলা।

বৃষ্টি শেষে কোনো ওভার না কমিয়েই খেলা মাঠে গড়ানোর কিছুক্ষণ পরই ১৭ বলে ৩ চারে ১৯ রান করা সাকিব সাজঘরে ফেরেন। পাওয়ার প্লের ৬ ওভারে ২ উইকেটে ৩৭ এবং ১০ ওভারে ৩ উইকেটে ৬৪ রান নিয়ে তেমন ভালো অবস্থানে ছিল না বাংলাদেশ। ওই সময় সাকিবও সাজঘরে ফেরাতে বেশ বিপদেই পড়ে যায় স্বাগতিকরা। এর পর তাওহিদ হৃদয় ও শামীম হোসেন পাটোয়ারী প্রতিরোধ গড়েন। তারা দুর্দান্ত ব্যাটিংয়ে দলকে নিয়ে যেতে থাকেন ওমরজাইয়ের ১৩তম ওভারে ৩ বাউন্ডারি হাঁকান হৃদয় ও শামীম, ওয়াইডসহ হয় আরেকটি চার। সব মিলিয়ে ২১ রান এলে আবার জয়ের আশা তৈরি হয়। শতরান পূর্ণ করে বাংলাদেশ। ওভারে ৬, ৭ রান করে নিয়ে এগোতে থাকেন তারা হিসেবী ব্যাটিংয়ে। ১৭তম ওভারে ফারুকীকে ১ ছক্কা ও ১ চার হাঁকিয়ে ১৬ রান তুলে নিলে জয়ের কাছাকাছি পৌঁছে বাংলাদেশ। কিন্তু ১৮তম ওভারে বিশ্বসেরা বোলার রশীদের লেগস্পিনে সাজঘরে ফেরেন শামীম। ফলে ৪৩ বলে ৭৩ রানের দুর্দান্ত এক জুটির পতন ঘটে। শামীম ২৫ বলে ৪ চারে ৩৩ রান করেন। ১৯তম ওভারে ফারুকী আবার ৮ রান দিলে ম্যাচের ভাগ্য পুরোপুরি বাংলাদেশের পক্ষে চলে আসে। শেষ ওভারে ৬ রান প্রয়োজন পড়ে। জানাত বোলিংয়ে আসার পর প্রথম বলেই বাউন্ডারি হাঁকান মেহেদি হাসান মিরাজ।

 

কিন্তু তারপর তিন বলে মিরাজ (৮), তাসকিন (০) ও নাসুমকে (০) সাজঘরে ফিরিয়ে হ্যাটট্রিক করেন জানাত। তিনজনই উল্টোপাল্টা শটে তুলে মারতে গিয়ে ক্যাচ দিয়ে সাজঘরে ফেরেন।

এটি আন্তর্জাতিক টি২০-তে ৫০তম হ্যাটট্রিকের ঘটনা। আফগানিস্তানের দ্বিতীয় বোলার হিসেবে এই গৌরব দেখান মিডিয়াম পেসার জানাত। লেগস্পিনার রশীদ আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে দেরাদুনে হ্যাটট্রিক করেছিলেন। জানাত এবার তার পাশে জায়গা নিয়েছেন। তার হ্যাটট্রিকে ২ বলে জয়ের জন্য ২ রান প্রয়োজন পড়ে বাংলাদেশের। অর্ধশতক থেকে মাত্র ৩ রান দূরে থাকা তাওহিদ অপরপ্রান্তে দাঁড়িয়ে অসহায়ের মতো অন্যপ্রান্তে দেখেছেন আত্মাহুতি। তবে শরীফুল পঞ্চম বলে বাউন্ডারি হাঁকিয়ে বাংলাদেশকে জয় এনে দেন। ১৯.৫ ওভারে ৮ উইকেটে ১৫৭ রান তুলে ১ বল আগেই ২ উইকেটের রূদ্ধশ্বাস জয় পায় সাকিবের দল। এতে ২ ম্যাচের সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে থাকল বাংলাদেশ। তাওহিদ ক্যারিয়ারসেরা ব্যাটিং করে ৩২ বলে ৩ চার, ২ ছক্কায় ৪৭ রানে অপরাজিত থাকেন। জানাত ১.৫ ওভারে ১৫ রান দিয়ে ৩ উইকেট নেন। নবি ছাড়া বাকি ৫ বোলার পেয়েছেন ১টি করে উইকেট।

স্কোর॥ আফগানিস্তান ইনিংস- ১৫৪/৭; ২০ ওভার (নবি ৫৪, ওমরজাই ৩৩, নাজিবউল্লাহ ২৩; সাকিব ২/২৭)।

বাংলাদেশ ইনিংস- ১৫৭/৮; ১৯.৫ ওভার (তাওহিদ ৪৭*, শামীম ৩৩, সাকিব ১৯, লিটন ১৮; জানাত ৩/১৫)।

ফল॥ বাংলাদেশ ২ উইকেটে জয়ী।

ম্যাচসেরা॥ তাওহিদ হৃদয় (বাংলাদেশ)।

সিরিজ॥ ২ ম্যাচের সিরিজে বাংলাদেশ ১-০ ব্যবধানে

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button