রমজান ঘিরে লাগামহীন নিত্যপণ্যের বাজার

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রতি বছর রমজান এলেই বেড়ে যায় নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য। কোনো নির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই প্রায় প্রতিবছরই বাজারে একই ধরনের অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হয়। এবারের রমজানকে ঘিরেও এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জে।

সম্প্রতি ডিম, ভোজ্যতেল, চিনিসহ বেশকিছু নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে লাফিয়ে লাফিয়ে। আর দ্রব্যমূল্য বাড়িয়ে অধিক মুনাফা লুটে নিচ্ছে এক ধরনের অসাধু ব্যবসায়ী। এই কারসাজির দায় নিয়ে উৎপাদক, পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীরা একে অপরকে দোষারোপ করছেন; দায় নিচ্ছেন না কেউই।

রমজানকে কেন্দ্র করে রামগঞ্জ বাজারে অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে সব ধরনের সবজির দাম। ৬০ টাকার নিচে মিলছে না কোনো সবজি। এছাড়া ব্রয়লার মুরগীর কেজি ২২০ টাকা, কক মুরগী ৩৮০ ও গরুর গোস্ত ৯শ থেকে হাজার টাকা, খাসির মাংস ১১০০-১৩০০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে রামগঞ্জ বাজারে।

সরজমিনে রামগঞ্জ কাঁচা বাজার ও মাছ বাজার লক্ষ্মীধর পাড়া বাজার, আথাকরা বাজার, ভাটরাবাজার, দল্টাকে বাজারসহ বেশ কয়েকটি বাজারে গিয়ে দেখা যায়, করোলার কেজি ১৪০ টাকা, মূলা ৬০ টাকা, কচুর লতি ১২০ টাকা, কাঁচা মরিচ ১০০, কুমড়া ৫০, টমেটো ৫০, তরি (ধুন্দল) ৭০, কাঁচা পেঁপে ৪৫, ঝিঙে ৭০, চিচিঙ্গা ৬০, বাঁধাকপি ১০০, দেশি শিম ৮০/১০০, বরবটি ১২০, শসা ৯০, বেগুন ৮০-৯০টাকা কেজিদরে বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা। এছাড়া ছোট আকারের কাঁচকলার হালি ৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

অন্যদিকে বাজারে কয়েক সপ্তাহ ধরে মাছের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। আকারভেদে প্রতি কেজি রুই বিক্রি হচ্ছে ৩৬০-৪০০ টাকায়। চিংড়ি ৫৫০ থেকে ১০০০ টাকা, তেলাপিয়া ২২০ থেকে ২৬০ টাকা, পাঙ্গাস ২৫০ থেকে ২৮০ টাকা, পাবদা ৩৮০ থেকে ৪৫০ টাকা, শোল ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা, ট্যাংরা ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা, শিং ৪০০ থেকে ৫৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে। দেশি জলাশয়ের মাছের দাম ৮০০-১০০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া ইলিশ মাছ এক হাজার ৫০০ থেকে দুই হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

এদিকে প্রতি কেজি ছোলা বিক্রি হচ্ছে ১০০-১৩০ টাকা। প্রতি কেজি খোলা চিনি ১৪০-১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া মসুর ডাল ১৩৫-১৫০ টাকা, খেসারি ডাল ১২০-১৫০ টাকা, অ্যাংকরের বেসন ৭৫-৮৫ টাকা এবং বুটের বেসন বিক্রি হচ্ছে ১২০-১৪০ টাকায়।

গত রমজানের ৯০-১১০ টাকা দরের খেজুর এবার খুচরা বাজারে ৩০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। পাইকারি বাজারের ২০০ টাকার খেজুর ৪৮০ টাকায় এবং ৩০০-৩৫০ টাকার খেজুর বিক্রি হচ্ছে ৬০০-৮০০ টাকায়। মানসম্মত বা একটু ভালো খেজুর কিনতে হলে তো কোনো কথাই নেই; কিনতে হচ্ছে ১৫০০-২০০০ টাকা প্রতি কেজি।

বৃহস্পতিবার বাজারে ৫ লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেল বিক্রি হয় ৮২০ থেকে ৮৫০ টাকায়। এছাড়া এক লিটারের বোতলজাত সয়াবিন বিক্রি হতে দেখা গেছে ১৮০ থেকে ১৮৫ টাকায়।

বাজার করতে আসা কয়েকজন ক্রেতার সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তারা আক্ষেপ নিয়ে জানান, এ দেশে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির পেছনে বিবিধ অজুহাত থাকলেও আমাদের আয় বৃদ্ধির কোনো অজুহাত নেই। সারাদিন গাধার মতো পরিশ্রম করেও পরিবারের সদস্যের জন্য মাসিক খাবারের খরচ মেটাতে পারছি না কোনোভাবেই। প্রতি মাসে পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে চলতে হলে ৮/১০ হাজার টাকা ঋণের চাপ নিতে হয়।

ভোক্তাদের অভিযোগ, সরকারের মন্ত্রীরা বা সরকারের পক্ষ থেকে বাজারে কোনো সংকট নেই বলা হলেও, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বেড়েই চলছে। বিষয়টি সরকারও স্বীকার করছে। তবে সিন্ডিকেট সৃষ্টিকারী অসাধু ব্যবসায়ী বা বাজার অস্থিতিশীর করার পেছনে যারা কলকাঠি নাড়ছেন, তাদের শাস্তির আওতায় আনা হচ্ছে না। সরকারের বিভিন্ন সংস্থা মাঝেমধ্যে অভিযান চালালেও তাতে বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টির পেছনে থাকা মাস্টারমাইন্ডরা ধরা পড়ছে না। এ অবস্থায় বেশিরভাগ মানুষের আর্থিক সঙ্গতি বিবেচনা করে দ্রব্যমূল্য স্বাভাবিক রাখতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন ভোক্তরা। আলাপকালে বেশ কয়েকজন ভোক্তা এমন দাবি জানান।

আরিফ হোসেন নামের বাজারের এক সবজি ব্যবসায়ী জানান, গত এক মাসের তুলনায় কেজি প্রতি দ্রব্যমূল্য বেড়েছে ২৫ থেকে ৪০ শতাংশ। পাইকারী বাজারেও একই অবস্থা। আমরা নিজেরাও ধারদেনা করে এখন ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছি।

নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক একজন পাইকারী ব্যবসায়ী জানান, কুমিল্লা-ঢাকার কারওয়ান বাজার ও চট্টগ্রাম থেকে এ এলাকায় সবজি আসে। ঘাঁটে ঘাঁটে গাড়ি আটকায়, তার ওপর গত কয়েকদিন আগে বৃষ্টিতে মৌসুমি সবজির ক্ষেতের ফসল নষ্ট হয়েছে। বাধ্য হয়ে মালও কম আনি এখন। কি করবো, পাইকারী বাজারে বস্তা প্রতি সবজির দাম বেড়েছে ৩ থেকে ৪শ টাকা। স্থানীয় এলাকা বা গ্রাম থেকে সবজি আসবে আরও পরে। তখন কিছুটা সহনীয় হবে সবজির বাজার।

এই বিভাগের আরো খবর