Home প্রধান খবর বাড়ির পাশেই ড্রাগন

বাড়ির পাশেই ড্রাগন

100
0
SHARE

আফরোজা নাজনীন।।

 

একসময় শুধু ধান-পাট ও দেশী ফল চাষ করেই জীবন যাপন করতো গ্রামের মানুষ, কিন্তু সময় পাল্টেছে এখন। হাঁটছে মানুষ ভিন্ন পথে। মানুষ এখন হাত বাড়িয়েছে অন্য দেশের দিকে। সম্পন্ন চাষীরা এখন বিদেশি ফল উৎপাদনে পারদর্শী হয়ে উঠেছে। তারা বাড়ির পাশেই গড়ে তুলছে বিদেশিফলের বাগান। সে ধারাবাহিকতায় ড্রাগন এখন পরিচিত ফল হিসেবে জনপ্রিয়তা পেয়েছে গ্রাম বাংলায়।

 

ঢাকার অদূরে সাভারের ওয়াসপুরের ষোলমাসী গ্রামের সালেহা বেগম, তার বাড়ির পাশে দু’কাঠা জমিতে ড্রাগন ফলের চাষ করছে। সালেহা বলেন, ‘প্রথম আমার এক বিদেশফেরত আত্মীয় আমাকে ড্রাগন চাষে উৎসাহিত করেন। আমি একেবারে উঠোনের পাশে পরীক্ষামূলকভাবে চাষ শুরু করি। বেশ ফল ধরে। সুমিষ্ট ফলগুলো শিশুরা খুব পচ্ছন্দ করে। আমি উৎসাহিত হয়ে বেশি জমিতে এ ফলের চাষ শুরু করি।’

 

সরজমিনে সালেহার বাগান ঘুরে দেখা যায়, একেবারে লতার মতো সবুজের ঘেরে ড্রাগন ধরেছে। প্রায় পাঁচফুট উচ্চতার খুঁটিতে পেঁচিয়ে উঠেছে ড্রাগন ফলের গাছ। সালেহা জানান চারা রোপনের তিনমাসের মাথায় ফল ধরে। এবছর ফল বাজারজাত করে তিনি এক লাখ টাকা লাভ করেছেন।

 

শেরপুরেও ড্রাগন ফলের চাষ জনপ্রিয়তা পেয়েছে খুব তাড়াতাড়ি। শেরপুরের নকলার রবিনা আলি এখন ড্রাগন চাষ করে সয়ংসম্পূর্ন। আইএ পাশ রবিনা শুরুতে একটা চাকরির জন্য চেষ্টা করে। কিন্তু সফল হয়নি। তারপর বন্ধুদের পরামর্শে ড্রাগন ফলের চাষে ঝোঁকে। আগে সে লাল শাক, টমেটো, বেগুন চাষ করতো। ড্রাগন চাষে লাভবান হওয়ায় অন্য সব চাষ বাদ দিয়েছে। রবিনা শুরুতে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউট উদ্ভাবিত লালবারী-১ জাতের ৪৫০টি চারা রোপন করে। এক বছরের মধ্যে ফল ধরে। রবিনা জানান, ড্রাগন উৎপাদন খরচ তুলনামূলকভাবে কম। ড্রাগন গাছে সামান্য জৈব সার দিলেই চলে, রাসয়নিক সারের তেমন প্রয়োজন হয়না। প্রয়োজন হয়না কীটনাশকেরও। মাসে একবার ছত্রাক নাশক ছিটাতে হয়। শীতকালে রোদের জন্য আলোর ব্যবস্থা করতে হয়। একবার রোপন করলে টানা ২৫ থেকে ৩০ বছর পর্যন্ত ফল ধরে। একটি গাছ থেকে প্রতি বছর ২৫ থেকে ৩০ কেজি ফল পাওয়া যায়।

 

বাওসা গ্রামের চাষি পারুল বেগম জানান, তার বাগানে ৮০টি গাছ রয়েছে। ড্রাগন চাষে সময় কম লাগে। বাড়তি ব্যয় নেই। সংসারে বাড়তি আয় হয়। ফলে ড্রাগন ফলের চাষ লাভজনক।

 

শেরপুরের রোহা গ্রামের মেয়ে শেফালী ড্রাগন চাষেই নিজের জীবিকা খুঁজে পেয়েছেন। বাবা-মা মারা গেছেন ছোট বেলায়, নানীর কাছে মানুষ হওয়া শেফালীর বয়স এখন আঠেরো বছর। শেফালী যে বাগানে কাজ করেন, সেখানে ড্রাগনসহ অন্য ফলের চাষ হয়। তবে শেফালী অন্য ফল নয়, ড্রাগন ফলের পরিচর্যা করেন। এ বাগানের মালিক হযরত আলী। তার রয়েছে এক’শ বিঘা জমি। এ জমিতে ড্রাগন, মাল্টা, কমলা, আঙ্গুর, খেজুর ও বিভিন্ন দেশিফল বাণ্যিজিকভাবে চাষ করা হয়।

 

শেফালী জানান, এ ফলে ফরমালিন ও ক্ষতিকারক কীটনাশক ব্যবহার করা হয় না বলে এর চাহিদা বেশি। নকলা উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল ওয়াদুদ জানান, এ এলাকার কৃষকদের ড্রাগন চাষে উৎসাহিত করতে মাঠপর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারা কৃষকদের পরামর্শ দেন। বাড়ির আঙ্গিনা ও ফেলে রাখা জমিতে এ ফলের চাষ করে তারা লাভবান হচ্ছেন।

শুরুতে ২০১২ সালে জামালপুর হর্টিকালচার সেন্টার নকলায় ৩২০ জন নারী-পুরুষ কৃষককে কাটিংকৃত চারা সরবরাহ করে। তাদের প্রশিক্ষণ দেয়াসহ বিনাখরচে প্রয়োজনীয় উপকরণও সরবরাহ করে। প্রতি বছরই প্রয়োজন অনুযায়ী কৃষকদের সাহায্য করা হয়।

 

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খামার বাড়ির উপ-পরিচালক ড. মোহিত কুমার দে বলেন, ২০১২ সালে নকলায় ড্রাগন চাষ শুরু হয়। পরে তা বাণিজ্যিক চাষে রূপ নেয়। কৃষিবিভাগ থেকে, কৃষকদের সব ধরণের টেকনিক্যাল সার্পোট দেয়া হয়।

 

বগুড়ার আদম দীঘি উপজেলার কুন্দ গ্রামের চাষী সুফলা দে তার ১৫ বিঘা জমিতে ড্রাগন চাষ করেন। শুরুতে স্বামী মনিলাল দে তার সঙ্গে ছিলেন। এখন তিনি কিডনিজনিত রোগে ভুগছেন, তাই কায়িক পরিশ্রম করতে পারেন না। এবার তাদের প্রতি বিঘাতে খরচ পড়েছে ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকা। সুফলা সাংবাদিকদের কাছে বলেন, কৃষিবিভাগ যদি সহজ শর্তে ঋণ দেয় তবে আরো বেশিসংখ্যক মানুষ ড্রাগন চাষ করবে। সুফলা আরো জানান, সব ধরণের মাটিতে ড্রাগন চাষ হয়। তবে উচুঁজমিতে ভালো ফলন হয়। তিন মিটার পর পর চারা রোপন করতে হয়। বছরের যেকোনো সময়ে চারা রোপন করা যায়। তবে এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে হলে ফলন ভালো হয়। প্রতিটি ফলের ওজন ২’শ থেকে ৬’শ গ্রাম। একটি গাছে সর্বোচ্চ ৮০টি ফল ধরে।

 

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মিঠু চন্দ্র বলেন, সুফলাদের বাগান অন্যদের উৎসাহ দিচ্ছে। কৃষিবিভাগ তার চাষের নজরদারি করছে।

 

বেশকয়েক বছর যাবতই গ্রামীন অর্থনীতি পাল্টে যাচ্ছে। আধুনিকতার ছোঁয়ায় প্রযুক্তিসহ চাষের ধরণ ধারণ পাল্টে গেছে। ফসল নির্বাচনেও কৃষকরা সচেতন হচ্ছে। তারা লাভজনক ফসলের দিকেই ঝুঁকেছেন এখন। সে পথ ধরেই কৃষকদের সামনে ড্রাগন এখন প্রধান অর্থকরী ফসলের একটি হয়ে উঠেছে।

 

ঝালকাঠির রাজাপুরের শুক্তাগড় ইউনিয়নের সাংগর গ্রামে ড্রাগন চাষের জোয়ার লেগেছে। এ গ্রামের মেয়ে আনিসা বেগমের বিয়ে হয়েছিল দশ বছর আগে এগারো বছর বয়সে। আট বছর পর স্বামী মারা যায় হার্টের সমস্যায়। আনিসা ফিরে আসে বাবার বাড়ি। কিছুতো করতে হবে। সেই চিন্তা থেকে ও দশ জনের পরামর্শে ড্রাগন চাষে ঝুঁকে পড়ে। শুরুতেই ঝুঁকি নিয়ে আনিসা বাবার কাছ থেকে পাওয়া দুই বিঘা জমিতে চাষ শুরু করেন। তার সঙ্গে আরো দুজন রয়েছেন। তারা দুই হাজার ড্রাগন চারা রোপন করেন। আনিসা মনে করেন, মাটি ও আবহাওয়া অনুকুল বলে ফলন ভালো হবে।

 

রাজাপুর উপজেলার কৃষিকর্মকর্তা মোহম্মদ রিয়াজ উল্লাহ বাহাদুর বলেন, নতুন অর্থ বছরে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি লাভ হবে বলে তারা আশা করছেন। এখানকার মাটি ফল চাষাবাদের জন্য বেশি উপযোগী বলে, এখানকার কৃষকরা নতুন নতুন ফলের আবাদ করছে। তিনি আরও বলেন, ড্রাগন ফল দেশের চাহিদা মিটিয়ে অচিরেই বিদেশ রপ্তানি করা যাবে। সেই সুদিনের অপেক্ষায় রইলাম আমরা।

 

আফরোজা নাজনীন, সনিয়ির রপর্িোটার, দনৈকি আলোকতি বাংলাদশে।

 

পআিইড-ি শশিু ও নারী উন্নয়নে সচতেনতামূলক যোগাযোগ র্কাযক্রম (৫ম র্পযায়) প্রকল্প র্কাযক্রম।

image_print