Home প্রধান খবর পাকিস্তানে স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যার কারণ

পাকিস্তানে স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যার কারণ

68
0
SHARE

সময়ের চিত্র ডেস্ক।।

২০২২ সালের জুনের মাঝামাঝি সময় থেকে পাকিস্তান স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যার সম্মুখীন হয়েছে। প্রায় ২২ কোটি জনসংখ্যার এই দক্ষিণ এশিয়ার দেশটির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পানিতে অর্ধনিমজ্জিত অবস্থায় আছে। বিধ্বংসী এই বন্যায় এখন পর্যন্ত ১২ শতাধিক মানুষ মারা গেছে, ১০ লক্ষাধিক বাড়িঘর নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে এবং প্রায় ২,২০০ মাইল রাস্তা ধ্বংস হয়ে গেছে। প্রায় ৫ লক্ষাধিক মানুষ বাস্তুচ্যুত শিবিরে রয়েছে এবং আরও অনেকের কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মতে পাকিস্তানের এই বন্যা জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে এখনি পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সারা বিশ্বের কাছে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বড় সতর্ক সংকেত। পাকিস্তানের এই ভয়াবহ বন্যার নেপথ্যের কারণ নিয়ে আজকের নিবন্ধ।

পাকিস্তানে এই ভয়াবহ বন্যার কারণ

বৈশ্বিক জলবায়ুর সংকট সামগ্রিকভাবে প্রভাব ফেলেছে পাকিস্তানের বন্যায়। আশঙ্কাজনক প্রাণঘাতী অবস্থাকে ক্রমাগত ভয়াবহতার দিকে ঠেলে দেয়ার পেছনে প্রাকৃতিক ও মনুষ্য সৃষ্ট বিপর্যয়গুলো যুগপৎ ভূমিকা রেখেছে।

অতিবৃষ্টি

বন্যার প্রধান কারণ হিসেবে সুস্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হয়েছে পুরো শতাব্দিতে পাকিস্তানের রেকর্ড ভাঙা বৃষ্টিপাত। আট সপ্তাহের বিরতিহীন অতিবৃষ্টি দেশের বিশাল অংশকে পানির নিচে ফেলে দিয়েছে। জুন মাসের শুরু থেকেই সিন্ধু প্রদেশে বৃষ্টিপাত ছিলো সাধারণ গড়পড়তার চেয়ে নয় গুণ বেশি এবং সমগ্র পাকিস্তানে পাঁচ গুণ বেশি। এ যেন সারা দেশ জুড়ে দানবীয় মৌসুমী বৃষ্টির প্রলয় লীলা।

অত্যধিক তাপের দাবদাহ

বৃষ্টিপাতের তীব্রতা বৃদ্ধির মৌলিক কারণ হলো উষ্ণ বাতাসের আর্দ্রতা বেশি থাকা। যে অতিবৃষ্টি বন্যার সৃষ্টি করছে তার পেছনে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন দায়ী। এর আগে পাকিস্তানে প্রাণঘাতী বন্যা হয়েছিলো ২০১০ সালে। সেই সুপারফ্লাড-এর জন্য মুল কারণ ছিলো উত্তাপ বৃদ্ধি, যার ফলে সে বছর প্রচণ্ড বৃষ্টিপাত ঘটিয়েছিল।

আর্কটিকের উষ্ণ মহাসাগরীয় বাতাসও এর সাথে জড়িত ছিল, কারণ এটি জলীয়বাষ্পকে প্রভাবিত করতে পারে। ফলে আকাশে ভাসমান বাতাস অত্যধিক গরম ও ভারী হয়ে যায়। এই জলীয়বাষ্পের বৃহত্তর গতিপথ পাকিস্তানে দীর্ঘায়িত বৃষ্টিপাতের প্রেক্ষাপট তৈরি করে। আর এখন বৈশ্বিক উত্তাপ দক্ষিণ এশিয়ার বৃষ্টিকে আরও তীব্র এবং আরও অনিয়মিত করে তুলছে। বৈশ্বিক তাপমাত্রা প্রতি ১ ডিগ্রী সেলসিয়াস বৃদ্ধির ফলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বাড়ে ৫ শতাংশেরও বেশি।

বন উজাড়

সিন্ধু নদীতে মিশে যাওয়া কাবুল নদীতে বাঁধ ধ্বংস হয়ে যাওয়ার সময় বৃষ্টিপাতের ফলে সৃষ্টি হয় পাহাড়ী ঢল। আর বন উজাড়ের কারণে এই ঢলের গতি আরো বেড়ে যায়। এতে অসহায় মানুষ নিরাপদ অবস্থানে যাওয়ারও সময় পায় না। তাই উচ্চ মৃত্যুর সংখ্যার জন্য আকস্মিক বন্যা ও নদীর বাঁধ ধ্বংসের পাশাপাশি বন উজাড়ও দায়ী। কিছু জায়গা এতটাই খাড়া ছিলো যে, ঢল কোন বাধা ছাড়াই দ্রুত প্রবাহিত হয়ে সমতল ভূমিতে আঘাত করেছে।

প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে তাপমাত্রা ও বাতাসের তারতম্য

এল নিনো–সাউদার্ন অসিলেশন (ইএনএসও) জলবায়ুর এমন একটি সংকটপূর্ণ অবস্থা যেখানে ক্রান্তীয় পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে বায়ু এবং সমুদ্র পৃষ্ঠের তাপমাত্রার অনিয়মিত পরিবর্তন ঘটে। এটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে গ্রীষ্মমন্ডলীয় এবং উপক্রান্তীয় অঞ্চলের জলবায়ুকে প্রভাবিত করে। সমুদ্রের তাপমাত্রার উষ্ণ পর্যায়কে এল নিনো এবং শীতল পর্যায়কে লা নিনা বলা হয়। ইএনএসও এখন লা নিনা পর্যায়ে রয়েছে ঠিক যেমনটি ছিলো ২০১০ সালে। লা নিনার অত্যন্ত দৃঢ় প্রভাব পাকিস্তানের সাধারণ মৌসুমী বৃষ্টিকে দানবীয় অতিবৃষ্টির রূপ দিয়েছে।

শেষাংশ

পাকিস্তানে স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যা শুধু দক্ষিণ এশিয়াই নয়; গোটা পৃথিবীবাসীর জন্য সাবধানবাণী। আকস্মিক বন্যার পাশাপাশি প্রচন্ড তাপের দাবদাহ, দাবানল, মেরু অঞ্চলে ক্রমাগত বরফ গলতে থাকা এখন গোটা বিশ্বকে জলবায়ুর ব্যাপারে গ্রাউন্ড জিরোর দিকে ঠেলে দিয়েছে। আবহাওয়াবিদরা বর্ষা মৌসুমের শেষ ঘনিয়ে আসায় আগামী দিনে আর কোনো উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাতের আশা করছেন না। কিন্তু এটি সৌভাগ্যজনক কোন খবর নয়। আপাত দৃষ্টে এ বছর বেঁচে গেলেও পরের বছরে কি হবে, যেখানে দুর্যোগগুলো প্রতি বছর দ্বিগুণ শক্তি নিয়ে আঘাত হানছে! তাই জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার এখনি সময়।

image_print