Home জাতীয় নিউমার্কেটে ব্যবসায়ী-শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষে প্রাণ গেলো কুরিয়ারকর্মীর।। সাংবাদিক পুলিশসহ আহত শতাধিক

নিউমার্কেটে ব্যবসায়ী-শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষে প্রাণ গেলো কুরিয়ারকর্মীর।। সাংবাদিক পুলিশসহ আহত শতাধিক

55
0
SHARE

সময়ের চিত্র ডেস্ক ॥ রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। সোমবার রাত থেকে শুরু হওয়া এই সংঘর্ষ চলে ভোর রাত সাড়ে ৩টা পর্যন্ত। সেহেরির পর থেকে প্রায় ঘণ্টা ছয়েক বন্ধ থাকার পর মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে ফের শুরু হয়ে চলে দিনব্যাপী। দফায় দফায় চলা এই সংঘর্ষে শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, কর্মচারী, হকার, পুলিশ, সাংবাদিক মিলে শতাধিকের মতো আহত হয়েছেন। আহতরা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসহ আশপাশের বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন। তবে গুরুতর আহত দুজন ঢাকা মেডিক্যালে ভর্তি রয়েছেন। দফায় দফায় চলা সংঘর্ষে দুই পক্ষের ইটপাটকেল নিক্ষেপ, রড, বাঁশ, কাঠ, ককটেল, ফুটপাথের হকারদের চৌকি, মালামালে ও পুলিশের ছোড়া রাবার বুলেট, টিয়ারগ্যাসে পুরো নিউমার্কেট রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। নিউমার্কেটসহ আশপাশের থানা পুলিশ, রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স ও মিরপুর থেকে তিন শতাধিক পুলিশ সদস্য এনে নিউমার্কেট এলাকায় মোতায়েন করা হয়েছে। রাতে ও দিনব্যাপী সংঘর্ষের ফলে ওই এলাকায় সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। এর প্রভাবে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার সড়কে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছে।

সংঘর্ষের ফলে ঢাকা কলেজের উচ্চমাধ্যমিক, অনার্স ও মাস্টার্সের সব ধরনের ক্লাস ও পরীক্ষা বাতিল ঘোষণা করেছে কলেজ কর্তৃপক্ষ। কলেজ কর্তৃপক্ষ ৫ মে পর্যন্ত হলও বন্ধ ঘোষণা করে। তবে শিক্ষার্থীরা তা মানতে নারাজ এবং তারা লাশ হলেও হল ছাড়বেন না বলে জানিয়েছেন। একপর্যায়ে বেলা সাড়ে ৩টার দিকে শিক্ষার্থীরা কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষকে অবরুদ্ধ করে রাখে। এর আগে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় ও সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য ঘটনাস্থলে যান। শিক্ষার্থীরা তাদের ওপরও চড়াও হন। মঙ্গলবার দুই দফায় সংঘর্ষের পর সন্ধ্যার আগে উভয় পক্ষ শান্ত হলেও নিউমার্কেট এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। নিউমার্কেটের কয়েকটি দোকান খুললেও ক্রেতার উপস্থিতি ছিল না বললেই চলে। ওই এলাকা দিয়ে সন্ধ্যার পরপরই যান চলাচল শুরু হয়। তবে দফায় দফায় সংঘর্ষের ফলে ওখানকার সড়ক যেন যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।

সংঘর্ষে আহত নাহিদ (১৭) নামের এক যুবক মঙ্গলবার রাতে ঢামেক হাসপাতালে মারা গেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংঘর্ষে আহতদের সুচিকিৎসার নির্দেশ দিয়েছেন।

আহত যুবকের মৃত্যু ॥ এদিকে রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় ব্যবসায়ী ও ঢাকা কলেজের ছাত্রদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় আহত নাহিদ (১৭) নামে এক যুবক ঢাকা মেডিক্যালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে। মঙ্গলবার রাত ৯টা ৪০ মিনিটে লাইফ সাপোর্টে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন আইসিইউর কর্তব্যরত ডাঃ তৌফিক এলাহী।

মৃত নাহিদের বাবা নাদিম হোসেন জানান, তাদের বাড়ি কামরাঙ্গীরচর দেওয়ানবাড়ী এলাকায়। এলিফ্যান্ট রোডের বাটা সিগনালে একটি কুরিয়ার সার্ভিস কোম্পানিতে চাকরি করত নাহিদ। সকাল ৮টার দিকে বাসা থেকে বের হয়ে কাজে যায় সে। এরপর দুপুর থেকে তার ফোন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল। বিকেলে ফেসবুকের মাধ্যমে তার আহত হওয়ার ছবি দেখতে পান তারা। এরপরে তাকে হাসপাতালের বিছানায় খুঁজে পাওয়া যায়।

তিনি আরও জানান, নাহিদ ৬ মাস আগে বিয়ে করেছে। তার স্ত্রীর নাম ডালিয়া। তিন ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় ছিল সে।

দুপুরে সংঘর্ষের এই ঘটনায় মোরসালিন (২৬) নামে আরও এক যুবক লাইফ সাপোর্টে চিকিৎসাধীন আছে। তার অবস্থা আশঙ্কাজনক। নিউ সুপার মার্কেটে কাপড়ের দোকানের কর্মচারী সে। সংঘর্ষের সময় তার মাথায় গুরুতর আঘাত পায়। এখন পর্যন্ত হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে মোরসালিনসহ ঢাকা কলেজের দর্শন বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র কানন চৌধুরী (২৩) ও দোকান কর্মচারী ইয়াসিন (১৭)। তাদেরও মাথায় আঘাত। অবস্থা গুরুতর।

সংঘর্ষে আহতদের সুচিকিৎসার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

শিক্ষামন্ত্রী ডাঃ দীপু মনি বলেছেন, নিউ মার্কেট ও ঢাকা কলেজ এলাকায় শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীদের সংঘর্ষের ঘটনায় গুরুতর আহত শিক্ষার্থী মোশাররফ হোসেনের উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

আহত ছাত্র মোশাররফকে দেখতে মঙ্গলবার রাত সাড়ে নয়টায় স্কয়ার হাসপাতালে যান শিক্ষামন্ত্রী। এ সময় মোশাররফের সুচিকিৎসার আশ্বাস দেন তিনি। তিনি মোশাররফের পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন। শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘এ ঘটনায় আহত সব শিক্ষার্থী এবং অন্যদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।’

যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত ॥ ঢাকা কলেজ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনার সূত্রপাত হয় ব্যবসায়ীদের অন্তর্দ্বন্দ্বের কারণেই। অনেক ব্যবসায়ী শিক্ষার্থীদের খাবারের বিল না দেয়ার বিষয়টি সামনে আনলেও ইফতারসামগ্রী বিক্রির জন্য টেবিল বসানোর জায়গা দখলকে কেন্দ্র করে গত শুক্রবার মনোমালিন্য সৃষ্টি হয় একই মালিকের দুই ফাস্টফুড দোকানের মধ্যে। তারাই প্রভাব খাটাতে ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের বেশকিছু সদস্যকে ডেকে আনে। তারা ব্যবসায়ীদের ওপর চড়াও হলেও ব্যবসায়ীরাও তাদের মারধর করে।

এরপর ওই শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে গিয়ে সত্য ঘটনা আড়াল করে বিষয়টি অন্যভাবে উপস্থাপন করলে দফায় দফায় সংঘর্ষ শুরু হয়। এক পর্যায়ে নিউমার্কেটের আশপাশের মার্কেটের ব্যবসায়ীরাও সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। একাধিক ব্যবসায়ী ও শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জনকণ্ঠকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

ব্যবসায়ীরা জানান, নিউমার্কেটের ৪ নাম্বার গেট দিয়ে প্রবেশ করলেই ডান পাশের ২য় দোকানটি ওয়েলকাম ফাস্টফুড এবং সরু গলির বিপরীত পাশেই ক্যাপিটাল ফাস্টফুড। এই দুই দোকানের মালিক নিউমার্কেট থানা বিএনপির সভাপতি এ্যাডভোকেট মকবুল হোসেন সরদার। তার আপন ভাই শহিদুল ক্যাপিটাল ফাস্টফুড ও চাচাত ভাই রফিক ওয়েলকাম ফাস্টফুড পরিচালনা করেন। প্রতিদিন ইফতারের আগে প্রতিটি ফাস্টফুডের দোকানের সামনে চেয়ার-টেবিল বসিয়ে ইফতারি বিক্রি করা হয়। মূলত এই টেবিল বসানোর জায়গা নিয়ে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। শুক্রবার থেকে চলে আসা দ্বন্দ্ব সোমবার সন্ধ্যার পরপর প্রকাশ পায়।

সোমবার সন্ধ্যায় ইফতারির টেবিল বসানো নিয়ে ক্যাপিটাল ফাস্টফুড ও ওয়েলকাম ফাস্টফুডের স্টাফদের মধ্যে তর্কাতর্কি ও হাতাহাতি হয়। পরে ইফতারের পর ওয়েলকাম ফাস্টফুডের স্টাফরা প্রভাব খাটাতে ঢাকা কলেজের ছাত্রলীগের কয়েকজনকে ডাকে। একজন ছাত্রলীগ নেতা ৮-১০ জনকে নিয়ে নিউমার্কেটে প্রবেশ করেই অতর্কিতভাবে ক্যাপিটাল ফাস্টফুডের কর্মচারীদের মারধর করতে থাকেন। ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীরা দোকানে অকারণে হামলা চালিয়েছে ভেবে আশপাশের ব্যবসায়ীরা ওই শিক্ষার্থীদের মারধর করেন। ব্যবসায়ীদের কাছে মারধরের শিকার হয়ে ক্যাম্পাসে ফিরে বিষয়টি অন্যভাবে উপস্থাপন করে ওই শিক্ষার্থীরা। পরে ঢাকা কলেজের ১০০-১৫০ শিক্ষার্থী নিউমার্কেটে হামলা চালায়। পাল্টা হামলা চালায় ব্যবসায়ীরাও। দুই পক্ষের ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার এক পর্যায়ে আশপাশের সব মার্কেটের ব্যবসায়ী ও কর্মচারীরা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এরপর থেকে দফায় দফায় সংঘর্ষ চলতেই থাকে।

ওয়েলকাম ও ক্যাপিটাল ফাস্টফুডের আশপাশের দোকানদাররাও ওই দুই দোকানে ঝামেলা হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তবে ফাস্টফুড দুটির সংশ্লিষ্ট কাউকেই দোকানে পাওয়া যায়নি। অনেকে অভিযোগ করেছেন, ক্যাপিটাল ফাস্টফুডটি বিএনপি নেতা মকবুলের দখলে নেয়া। এটি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের একটি পক্ষকে নিয়মিত চাঁদা দেয়া হয়।

ঈদ উপলক্ষে গভীর রাত পর্যন্ত নিউমার্কেট এলাকায় বেচাকেনা চলে। তাই সোমবার রাত ১১টায়ও খোলা ছিল পুরো নিউমার্কেট। শিক্ষার্থীদের মারধরের বিষয়টি ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়লে রাত প্রায় সাড়ে ১১টার দিকে শতাধিক শিক্ষার্থী নিউমার্কেটে হামলা চালায়। তখন ব্যবসায়ী, কর্মচারী ও ফুটপাথের হকাররা শিক্ষার্থীদের হামলা করে। দুই পক্ষের সংঘর্ষের খবরে রাতেই সেখানে পৌঁছে নিউমার্কেট থানা পুলিশ। এরপর সংঘর্ষ বাড়তে থাকলে আশপাশের থানা পুলিশ, রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স ও মিরপুর রিজার্ভ থেকে তিন শতাধিক পুলিশ সদস্য সেখানে মোতায়েন করা হয়। পুলিশের রমনা বিভাগের উপ-কমিশনার সাজ্জাদ হোসেন, ধানম-ি জোনের এডিসি এহসানুল ফেরদৌস, নিউমার্কেট জোনের এসি শরীফুজ্জামান ফারুকের নেতৃত্বে পুলিশ সদস্যরা ব্যবসায়ী ও শিক্ষার্থীদের নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেন। নেয়া হয় সাঁজোয়া যান, জল কামান। হকার, ব্যবসায়ীরা পুলিশের সঙ্গে একত্রিত হয়ে শিক্ষার্থীদের ধাওয়া করতে থাকে। পুলিশ সাঁজোয়া যান থেকে টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। একপর্যায়ে রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে পুলিশ। এতে কয়েকজন শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হয়। রাতের এ ঘটনায় আরও ফুঁসে ওঠে শিক্ষার্থীরা। তারা অভিযোগ করতে থাকেন, পুলিশ ব্যবসায়ীদের শেল্টার দিচ্ছে। অন্যদিকে তাদের ওপর টিয়ারগ্যাস ও রাবার বুলেট ছুড়ছে। শিক্ষার্থীরা এমন ক্ষোভে রাত ২টার দিকে ফের ক্যাম্পাস থেকে বের হয়। তখন আবারও সংঘর্ষ বাঁধে। তখন একটি মোটরসাইকেলে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। পরে পুলিশের টিয়ারগ্যাসে টিকতে না পেরে শিক্ষার্থীরা রাস্তায় ঢুকে পড়েন। রাত প্রায় আড়াইটার দিকে ঢাকা কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ প্রফেসর এটিএম মইনুল হোসেন এসে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন। তখন শিক্ষার্থীরা অধ্যক্ষকে অবরুদ্ধ করে রাখেন এবং বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। হ্যান্ড মাইকে অধ্যক্ষ শিক্ষার্থীদের বোঝানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। পরে অধ্যক্ষসহ কয়েকজন শিক্ষক রাত ৩টার দিকে নিউমার্কেট ৪ নং গেটে থাকা পুলিশ সদস্যের সঙ্গে কথা বলেন। শিক্ষকরা উর্ধতন কর্মকর্তাদের পুলিশ সদস্যদের সরিয়ে নিতে বলেন এবং ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ না করতে নিষেধ করেন। তখন পুলিশ সাঁজোয়া যান কিছুটা সরিয়ে নেয় এবং তারাও কিছুটা সরে যান। সেখানে দীর্ঘক্ষণ স্লোগান দিতে থাকেন শিক্ষার্থীরা। এরপর ক্যাম্পাসের ভেতরে পুলিশের ছোড়া টিয়ারগ্যাসের অসংখ্য খোসা এনে সংবাদকর্মীদের দেখান। রাবার বুলেটে কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হওয়ায় তারা আরও ফুঁসে ওঠেন। পরে সেখান ৩০ মিনিটের মতো স্লোগান দিয়ে সেহেরি খেতে চলে যান শিক্ষার্থীরা। তখন রাত সাড়ে ৩টা।

ঘটনাস্থলে রাত সাড়ে ৩টায় পুলিশের রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার সাজ্জাদ হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ঢাকা কলেজের কয়েকজন শিক্ষার্থী নিউমার্কেটে খেতে এলে যেকোন কারণে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ঝামেলা হয়। বিষয়টি ক্যাম্পাসে জানাজানি হলে শিক্ষার্থীরা উত্তপ্ত হয় এবং শিক্ষার্থী-ব্যবসায়ী সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এতে পুলিশ সদস্য, শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীদের কয়েকজন আহত হন। পুলিশ অত্যন্ত ধৈর্য ধরে ঘটনাটি মোকাবেলা করে। এক প্রশ্নে ডিসি বলেন, পুলিশ ক্যাম্পাসে টিয়ারগ্যাস ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করেনি। শিক্ষার্থীদের এ অভিযোগ সত্য নয়। আমাদের কারণে কোন শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হয়ে থাকলে সেটি খোঁজ নেয়া হবে। এ বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও রাতে জানিয়েছেন তিনি।

রাত সাড়ে ৩টার দিকে ঢাকা কলেজ প্রশাসন কলেজের ফেসবুক পেজে মঙ্গলবার উচ্চমাধ্যমিক, অনার্স-মাস্টার্সের ক্লাস ও অনার্স-মাস্টার্সের পরীক্ষা স্থগিত রাখার ঘোষণা দেয়া হয়। মঙ্গলবার সকালে আবার সংশ্লিষ্ট বিভাগের শিক্ষকরা ছাত্রদের ক্লাস বন্ধের বিষয়টি হোয়াটসএ্যাপে গ্রুপসহ বিভিন্নভাবে জানিয়ে দেন।

সোমবার রাত সাড়ে ৩টার দিকে সংঘর্ষ বন্ধ হওয়ার প্রায় ৬ ঘণ্টা পর মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টায় ব্যবসায়ী, কর্মচারী ও হকাররা মার্কেটে আসেন। তখন শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসের সামনে আন্দোলনের ঘোষণা দেন। এ সময় আতর্কিত সংঘর্ষ বেঁধে যায়। তখনও ব্যবসায়ীরা দোকানপাট খোলেননি। দেখা যায়, সকালের দিকে হকার ও কর্মচারীরা রোগীবাহী দুটি এ্যাম্বুলেন্স ভাংচুর করেন। রিক্সাযোগে যাত্রী যাওয়ার সময় তাদের পথ আটকান। এক যাত্রী তার পেটের অপারেশনের দাগ দেখিয়ে কর্মচারীদের রোষানল থেকে মুক্তি পান। প্রায় ১১টার দিকে নিউমার্কেট ফুটওভার ব্রিজের নিচে লাইভ চলাকালীন দীপ্ত টিভির রিপোর্টার আসিফ সুমিতকে এলোপাতাড়ি পেটাতে থাকে হকার ও কর্মচারীরা। এ সময় তাকে রক্ষা করতে এগিয়ে গেলে আরও কয়েকজন সংবাদকর্মী ব্যবসায়ী ও কর্মচারীদের হামলার শিকার হন। অন্যদিকে শিক্ষার্থীরা সোমবার রাতের মতো মঙ্গলবার সকালেও ক্যাম্পাসের ১০তলা ভবনের ওপরে উঠে ব্যবসায়ী, হকার ও পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকেন। নূরজাহান মার্কেটের কয়েকজন কর্মচারী দুই শিক্ষার্থীকে ব্যাপক মারধর করেন। কিছুক্ষণ পর আবার শিক্ষার্থীরা তিনজন কর্মচারীকে ধরে ক্যাম্পাসে নিয়ে মারধর করে। এরমধ্যে দুজনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান সহকর্মীরা। দুপুর সোয়া ১টার দিকে নূরজাহান মার্কেটের নিচ তলায় আগুন ধরিয়ে দেয় আন্দোলনকারীরা। পরে পুলিশের সাঁজোয়া যান সেখানে গিয়ে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে ক্যাম্পাসে ও ছাদে টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ করে। ফলে শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসের ভেতর ঢুকে যান। অন্যদিকে ব্যবসায়ী, কর্মচারী ও হকাররা পুলিশের সঙ্গে স্লোগান দিয়ে ঢাকা কলেজের মেইন গেটে গিয়ে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে। কিছুক্ষণ ইটপাটকেল নিক্ষেপ করার ঘটনা চলার পর শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে ব্যবসায়ীদের ধাওয়া দেন। ব্যবসায়ীরা নীলক্ষেতের দিকে পিছু হটেন। আবার কিছুক্ষণ পর পুলিশের সঙ্গে সঙ্গে গিয়ে ব্যবসায়ীরা শিক্ষার্থীদের ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণের শব্দও পাওয়া যায়। এভাবে চলতে থাকে বেলা ৩টা পর্যন্ত।

মঙ্গলবার সকাল থেকে দফায় দফায় সংঘর্ষ থামাতে বিকেল সাড়ে ৩টায় ঘটনাস্থলে যান ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় ও সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য। পরিস্থিতিতে উভয় পক্ষকেই শান্ত থাকতে বলা হয়েছে উল্লেখ করে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য বলেন, আমরা ঘটনাস্থলে এসেছি এবং উভয় পক্ষকেই শান্ত হওয়ার জন্য বলেছি। সার্বিকভাবে আমরা চাই কোন ধরনের সংঘাত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যেন তৈরি না হয়। যারা আহত হয়েছেন তাদের সব ধরনের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। আশা করছি, দ্রুত সমস্যার সমাধান হবে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার পর দোকান মালিক সমিতি ও ছাত্র প্রতিনিধি যারা আছে সবাই একসঙ্গে বসে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার পদক্ষেপ নেয়া হবে।

বেলা আড়াইটার দিকে ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট এসে নূরজাহান মার্কেটের আগুন নেভান। তবে এর আগেই পুড়ে যায় কয়েকটি দোকান। ঢাকা কলেজের সামনে, নিউমার্কেট ফুটওভার ব্রিজের নিচে কয়েক জায়গায় ছোট ছোট টেবিল, চৌকি, কাঠ, বাঁশ ও ফুটপাথে থাকা হকারদের প্লাস্টিকের কাগজসহ মালামালে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। সংঘর্ষের ফলে নিউ সুপার মার্কেট, চন্দ্রিমা, নূরজাহান, গাউছিয়া, ধানম-ি হকার্স মার্কেট, নিউমার্কেট, রাফীন প্লাজা, নীলক্ষেত বইয়ের দোকানসহ প্রায় নিউমার্কেট এলাকায় ২০-২২টি মার্কেট বন্ধ ছিল। এতে কয়েক কোটি টাকার বেচাকেনা বন্ধ ছিল ব্যবসায়ীদের।

৭৫ শিক্ষার্থীসহ আহত প্রায় শতাধিক ॥ সংঘর্ষের ঘটনায় ব্যবসায়ী, হকার, কর্মচারীর ইটপাটকেল ও পুলিশের টিয়ারগ্যাসে ঢাকা কলেজের ৭৫ শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে অনেকে গুলিবিদ্ধও হয়েছেন। দুজন শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হয়ে ঢাকা মেডিক্যালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন বলে মেডিক্যাল সূত্রে জানা গেছে। ঢাকা মেডিক্যাল ছাড়াও পপুলারে, ইবনে সিনা, স্কয়ার হাসপাতাল ও আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন অন্তত ৭৫ জন শিক্ষার্থী। শিক্ষার্থীদের অধিকাংশই পুলিশের ছোড়া রাবার বুলেট, কাঁদানে গ্যাস ও ইটের আঘাতে আহত হয়েছেন।

ঢাকা কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ অবরুদ্ধ ॥ এদিকে শিক্ষার্থীরা সংঘর্ষের ঘটনায় ঢাকা কলেজ প্রশাসনের দুর্বলতাকে দায়ী করছে। এই অভিযোগ এনে বিকেল সোয়া ৩টার দিকে শিক্ষার্থীরা কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ প্রফেসর এটিএম মইনুল হোসেনকে অবরুদ্ধ করে বিক্ষোভ করছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

মিরপুর সড়কে যান চলাচল বন্ধ ॥ সোমবার রাত থেকে চলতে থাকা সংঘর্ষের ফলে ওই রুটে যান চলাচল একদম বন্ধ হয়ে যায়। ওখানকার সড়কজুড়ে ইটের খোয়া, বাঁশ, কাঠ, লোহার রড, আগুনে পুড়িয়ে দেয়া বিভিন্ন মালামালের পোড়া অংশ, ছাইয়ে রাস্তা ছেয়ে যায়। একটি রিক্সাও ওই এলাকা দিয়ে চলতে দেখা যায়নি। নীলক্ষেত মোড়ে পুলিশ ব্যারিকেট দিয়ে রেখেছে। ফলে নিউমার্কেট ও ঢাকা কলেজের দিকে কোন গাড়ি, রিক্সাসহ কোন যান ঢুকতে পারেনি। অন্যদিকে সায়েন্সল্যাব থেকেও নিউমার্কেটের দিকে কোন গাড়ি ঢুকতে পারেনি।

 

সংঘর্ষ জিইয়ে রাখার অভিযোগ ॥ সোমবার রাতে যখন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়, তখন পুলিশ সদস্যদের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন পুলিশের রমনা বিভাগের ধানম-ি জোনের এডিসি এহসানুল ফেরদৌস। পরে অবশ্যই রমনা বিভাগের ডিসি সাজ্জাদ হোসেন ঘটনাস্থলে আসেন। তবে এর আগে সংঘর্ষে নিউমার্কেট ব্যবসায়ী, হকার ও কর্মচারীদের উস্কে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে এডিসি এহসানুল ফেরদৌসের বিরুদ্ধে।

স্ট্যান্ড উইথ ঢাকা কলেজ’ ক্যাম্পেন ॥ এদিকে শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশ ও ব্যবসায়ীদের হামলার প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছেন সারাদেশের শিক্ষার্থীরা। সহমর্মিতা জানিয়েছেন সব শ্রেণী-পেশার মানুষ। ফেসবুকে হ্যাশট্যাগ দিয়ে চলছে ‘স্ট্যান্ড উইথ ঢাকা কলেজ’ ক্যাম্পেন। এদিকে ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত সরকারী সাত কলেজসহ দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তারা ‘শেম পুলিশ’, ‘বয়কট নিউ মার্কেট’ ক্যাম্পেন চালাচ্ছেন।

মঙ্গলবার দুপুরের পর থেকে ইডেন কলেজ, আলিয়া মাদ্রাসা, তিতুমীর কলেজ, কবি নজরুল কলেজসহ বেশ কয়েকটি কলেজের শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে নীলক্ষেত যান এবং ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন।

ঢাকা কলেজ বন্ধ ঘোষণা ॥ সংঘর্ষের ঘটনার প্রেক্ষাপটে ঢাকা কলেজ আগামী ৫ মে পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করেন কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ (উপাধ্যক্ষ) এ টি এম মইনুল হোসেন। একই সঙ্গে মঙ্গলবার বিকেলের মধ্যে ছাত্রদের আবাসিক ছাত্রাবাস ছাড়ার নির্দেশও দেন তিনি।

তবে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে হল-ক্যাম্পাস বন্ধের সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করেছেন ঢাকা কলেজের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। তারা বলছেন, যেকোন মূল্যে হল-ক্যাম্পাসে অবস্থান করবেন। বিকেল সোয়া চারটায় ঢাকা কলেজের শহীদ আনম নজিব উদ্দিন খান খুররম অডিটরিয়ামে সম্মিলিতভাবে সাধারণ শিক্ষার্থী ও ছাত্রনেতারা প্রশাসনের সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যানের কথা জানান।

এ সময় শিক্ষার্থীরা ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষের অপসারণসহ ছাত্রদের ওপর পুলিশের গুলি চালানোর ঘটনার বিচারের দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দেন।

 

image_print