Home মতামত দেশে ক্যান্সার চিকিৎসায় সরকারের এক যুগান্তকারী উদ্যোগ

দেশে ক্যান্সার চিকিৎসায় সরকারের এক যুগান্তকারী উদ্যোগ

79
0
SHARE

মোঃ মাইদুল ইসলাম প্রধান।।

বিষয়টি এখন সবাই জানে, একটি পরিবারে ক্যান্সার আক্রান্ত একজন রোগী থাকা মানেই সেই গোটা পরিবারটিরই চিকিৎসা ব্যয়ভার বহন করতে করতে হত দরিদ্র পরিবারের কাতারে চলে যাওয়া। অনেক ভালো চিকিৎসার পরও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অত্যন্ত দুঃখপিতাভাবে আক্রান্ত ব্যক্তিটি শেষমেশ মারাই যান। আর, আক্রান্ত পরিবারটি একদিকে সীমাহীন পারিবারিক কষ্টে থাকে, অন্যদিকে চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে গোটা পরিবারটিই দিশেহারা ও বেসামাল হয়ে পড়ে।

সত্যিকার অর্থেই চিকিৎসাক্ষেত্রে ক্যান্সার একটি ভীতিপিতা রোগের নাম। এই রোগটি শরীরে বাসা বাঁধলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শেষ পর্যায়ে ধরা পড়ে। একেবারে শেষ পর্যায়ে ধরা পড়ার কারণে বেশিরভাগ রোগীই মারা যান। অথচ আক্রান্ত হবার শুরুতেই যদি পরীক্ষার মাধ্যমে রোগটি নির্ণয় করা সম্ভব হয় তাহলে খুব অল্প খরচে অধিকাংশ রোগীই সুস্থ হতে পারে।

বড়ো একটি সমস্যা হচ্ছে, দেশে মোটামুটি ভালোমানের ক্যান্সার চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয় এরকম হাসপাতাল আছে খুব হাতে গোনা অল্প কিছু। এই হাসপাতালগুলির অধিকাংশই ঢাকা কেন্দ্রিক হওয়ায় দিন দিন রোগীর চাপ বেশি হচ্ছে এবং রোগীরা ক্যান্সার চিকিৎসা করতে বিদেশমুখী হয়ে র্অনৈতিকভাবে নিঃশ্ব হয়ে যাচ্ছেন। দেশে বেসরকারি কিছু হাসপাতালে মানসম্মত ক্যান্সার চিকিৎসা দেওয়া হলেও তা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়ায় দেশের অধিকাংশ মানুষ এসব হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নিতে পারেনা।

অন্যদিকে, পরিসংখ্যান বলছে দিন যতই যাচ্ছে দেশে ক্যান্সারে আক্রান্তের সংখ্যা ততই বেড়ে চলেছে। প্রতিবছর গড়ে দেড় থেকে দুই লাখ মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছেন এবং এদের মধ্যে এক থেকে দেড় লাখ আক্রান্ত মানুষই এই রোগে ধুকে ধুকে মারা যাচ্ছে। অন্যদিকে চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে বছরে বছরে এই বিরাট সংখ্যক পরিবারগুলি নিঃস্ব ও দরিদ্র হয়ে যাচ্ছে।

আর্ন্তজাতকি সংস্থা, ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্স অন ক্যান্সার (আইএআরসি) এর সাম্প্রতকি প্রকাশতি অনুমিত হিসেব অনুযায়ী বাংলাদশে প্রতিবছর এক লাখ পঞ্চাশ হাজার মানুষ নতুন করে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয় এর মধ্যে মারা যায় এক লাখ আট হাজার এবং এই সংখ্যা প্রতিবছর বেড়েইে চলছে। এই সংস্থার মতে বাংলাদশে ক্যান্সার আক্রান্তের হার প্রতি লাখে ১০৫.৭ এবং মৃত্যুহার প্রতি লাখে ৭৭.১।

অনানুষ্ঠানিক অন্য এক জরিপে দেখা গছে, এই অনুমিত ক্যান্সার রোগীদরে এক তৃতীয়াংশ দেশের স্বীকৃত চিকিৎসা সেবার আওতায় আসে। বাকিদরে একটা বড়ো অংশ বিদেশে চিকিৎসা নিচ্ছে কিংবা নানা অবৈজ্ঞানিক ব্যবস্থার আশ্রয় নিচ্ছে। ফলে ক্যান্সার নির্নয় ও চিকিৎসা সেবার বাইরে থেকে যাচ্ছে বিপুল সংখ্যক রোগী। গত দুই দশকে দেশে সরকারি খাতে ক্যান্সার চিকিৎসার আধুনকি যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তরি সন্নিবেশ ঘটেছে লক্ষণীয়ভাব। ঢাকার মহাখালীস্ত জাতীয় ক্যান্সার গবষেণা ইনস্টটিউিট ও হাসপাতালে শয্যা সংখ্যা প্রথমে ৫০ থেকে ৩০০ তে উন্নীত করা হয়েছে এবং এর পর আরো ৫০০ শয্যাসংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়েছে যেখানে রেডিথেরাপির আধুনকি যন্ত্রপাতি সংযুক্ত হয়ছে।

ঢাকা মেডিকেল কলজে ও ঢাকার বাইরে বগুড়াতে শহীদ জয়িাউর রহমান মেডিকেল কলজে হাসপাতালে রেডিওথেরাপির সর্বাধুনিক লিনিয়ার এক্সিলারেটর মেশিন সংযুক্ত হয়ছে।পুরাতন ৮টি বিভাগীয় মেডিকেল কলজে হাসপাতালে র্পুণাঙ্গভাবে সবগুলিতে ক্যান্সার বিকিরণ চিকিৎসা, কেমোথেরাপির ব্যবস্থা চালু নেই। বেসরকারিখাতে কয়েকটি বড়ো হাসপাতালে রেডিওথেরাপিসহ ক্যান্সার চিকিৎসা চালু হয়ছে, যেখানে অনেক স্বচ্ছল রোগী চিকিৎসা নিতে পারছেন যা সাধারণ মানুষের চিকিৎসাপ্রাপ্তির নাগালে বাইরেই রয়ে গেছে। একমাত্র জাতীয় ক্যান্সার গবষেণা ইনসটিটউিট ছাড়া সরকারি-বেসরকারি কোন বিশেষায়িত ক্যান্সার সেবা প্রতষ্ঠিান গড়ে ওঠেনি। এখন র্পযন্ত ক্যান্সার চিকিৎসাব্যবস্থা রাজধানী কেন্দ্রিক। তাই সরকারিভাবে চিকিৎসার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষায় থাকতে হয়। উপরন্তু ক্যান্সার চিকিৎসা ব্যয়বহুল ও দীর্ঘমেয়াদি হওয়ায় ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগী সামর্থ না থাকলেও বাধ্য হয়ে বিদেশি কিংবা বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়ে অনেক পরিবার নিঃশ্ব হয়ে যাচ্ছে। ক্যান্সার নির্নয় ও চিকিৎসা সুবিধা রাজধানী কেন্দ্রিক হওয়ায় এবং ক্যান্সার রোগ সর্ম্পকে জনগণের অজ্ঞতা, অসচতেনতায় রোগ নির্নয় বিলম্বতি হয়, ফলে অনেক ক্ষেত্রেই চিকিৎসায় আশানুরূপ ফল পাওয়া সম্ভব হয় না।

দক্ষিণ র্পূব এশিয়ায় পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ক্যান্সার নির্নয়ের এক বছররে মধ্যে শতকরা প্রায় পঁচাত্তর ভাগ রোগী মারা যায়, কিংবা ভয়াবহ আর্থিক সংকটের মুখোমুখি হয়। এমতাবস্থায়, দেশের অধিকাংশ মানুষের ভৌগলিক ও আর্থিক অবস্থার নাগালের মধ্যে ক্যান্সার সেবা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ প্রয়োজন। ক্যান্সার রোগীর সঠিক পরিসংখ্যান এবং জনগোষ্ঠিভিত্তিক বা পপুলশেনভিত্তিক ক্যান্সার রেজিস্ট্রির মাধ্যমে ক্যান্সারে আক্রান্তের হার, মৃত্যুহারসহ গুরুত্বর্পূণ উপাত্ত পাওয়া সম্ভব, যা সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে সহায়ক ভূমকিা রাখতে পারে। ২০০৪ সালে জাতীয় ক্যান্সার গবষেণা ইনস্টটিউিট হাসপাতালে ও ১৯টি সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ক্যান্সার নিবন্ধন কার্যক্রম স্বল্পপরসিরে শুরু হয়ছে। কিন্তু জনগোষ্ঠীভিত্তিক ক্যান্সার নিবন্ধনের উদ্যোগ নেয়া ছাড়া উল্লিখিত তথ্য-উপাত্ত পাওয়া সম্ভব নয়।

ক্রমান্বয়ে ক্যান্সার চিকিৎসায় একদিকে ঢাকার উপর ক্রমবর্ধমান চাপ কমানোর তাগিদ, অন্যদিকে এই ক্যান্সার চিকিৎসায় সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে দরিদ্র হয়ে যাওয়া ঠেকানোর বিষয়টি সরকারের মাথাব্যাথা হয়ে দেখা দেয়। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী জাহিদ মালেক ২০১৮ সালে বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে তুলে ধরলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্যান্সার চিকিৎসায় দেশব্যাপী চিকিৎসাসেবা ছড়িয়ে দেবার উদ্যোগ গ্রহণ করতে নির্দেশনা দেন। মুহূর্তেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে উঠেপড়ে লাগে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। ক্যান্সার চিকিৎসায় গুরুত্ব অনুধাবন করে দেশের ৮টি বিভাগেই ৮টি ১৫ তলা বিশিষ্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পূর্ণাঙ্গ ক্যান্সার ইউনিট স্থাপনের পরিকল্পনা নেয়া হয়। ক্যান্সারের পাশাপাশি সেখানে কিডনি, লিভার এবং ডায়ালাইসিস সুবিধা রাখার জন্যও আলাদা ব্যবস্থা রাখার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ক্যান্সার চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি অবশেষে জুলাই, ২০১৯ থেকে প্রকল্প আকারে বাস্তবায়ন করতে কাজ শুরু হয়। কাজ শেষ করা বা লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের সময় নির্ধারণ করা হয় জুন ২০২২ পর্যন্ত। প্রকল্পটি গত ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দ তারিখে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় অনুমোদিত হয় এবং ১১ নভেম্বর, ২০১৯ তারিখে প্রকল্পটি প্রশাসনিক অনুমোদন লাভ করে। প্রকল্পটির সার্বিক উদ্দেশ্যে হচ্ছে-সারা দেশে ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত বিশাল জনগোষ্ঠীকে চিকিৎসা সেবার আওতায় আনা;সূচনাতেই ক্যান্সার রোগ নির্ণয় এবং সময়মত ক্যান্সার রোগীদের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা; ক্যান্সার চিকিৎসা সেবা সম্প্রসারণ ও বিকেন্দ্রীয়করণরে মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে চিকিৎসা সেবার আওতায় আনা;ক্যান্সার চিকিৎসা সেবায় বৈদেশিক নির্ভরতা কমিয়ে আনা, পক্ষান্তরে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় করা;ক্যান্সার চিকিৎসার ক্ষেত্রে Out of Pocket Expenditure দেশে ক্যান্সার চিকিৎসা সেবা আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা।

সর্বোপরি আট বিভাগে ৮টি উন্নত মানের ক্যান্সার, কিডনী, লিভার চিকিৎসা হাসপাতাল নির্মাণ নিঃসন্দেহে সরকারের একটি সূদুরপ্রসারি ও ফলপ্রসূ চিন্তার ফসল হয়ে দেখা দিবে বলে দেশের বিজ্ঞজনেরা মনে করছেন। হাসপাতালগুলি নির্মাণ কাজের অগ্রগতি এখন একেবারে শেষ পর্যায়ে রয়েছে। আজ ৯ জানুয়ারি, ২০২২ তারিখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হাসপাতালগুলির ভিত্তিপ্রস্তর উদ্বোধন করেছেন। আশা করা যাচ্ছে, নির্ধারিত সময়েই হাসপাতালগুলি কার্যক্ষম হয়ে উঠবে। হাসপাতালগুলির প্রতিটিতেই প্রথম অবস্থায় অন্তত ১০০টি করে ক্যান্সার শয্যার মাধ্যমে চিকিৎসা সেবারব্যাবস্থা থাকবে। এর পাশাপাশি সমহারে কিডনি, লিভার চিকিৎসার জন্যও শয্যা থাকবে। এগুলি প্রস্তুত হয়ে গেলে ক্যান্সার চিকিৎসায় ঢাকার উপর চাপ অনেকাংশই কমে যাবে বলে বিশেষজ্ঞগণ মনে করছেন। সাধারণ মানুষজন ঢাকায় এসে চিকিৎসা করাতে অতিরিক্ত টাকা খরচ করার পাশাপাশি চিকিৎসা সংক্রান্ত ভোগান্তির হাত থেকেও বেঁচে যাবেন। হাসপাতালগুলি চালু হলে একদিকে দ্রুততার সাথে রোগটিকে প্রথম পর্যায়েই নির্ণয় করা যেমন সহজ হবে, অন্যদিকে চিকিৎসা সেবায় জটিল ও ভীতির এই রোগটির চিকিৎসায় দেশের প্রান্তিক মানুষ অনেকটাই স্বস্থির শ্বাস নিতে শুরু করবে।

লেখক- জ্যেষ্ঠ তথ্য কর্মকর্তা, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়

১৩.০২.২০২২ পিআইডি ফিচার

image_print