Home প্রধান খবর দুর্নীতি প্রতিরোধঃ শুধু আইন নয়, বদলাতে হবে মানসিকতা

দুর্নীতি প্রতিরোধঃ শুধু আইন নয়, বদলাতে হবে মানসিকতা

103
0
SHARE

মোঃ রমজান আলী।।

দুর্নীতি অন্যান্য দেশের ন্যায় বাংলাদেশের অন্যতম একটি সমস্যা।বর্তমান সমাজে দুর্নীতি বিষয়টি সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকসহ অন্যান্য প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে পরিলক্ষিত হচ্ছে। দুর্নীতি যে কোনো দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য বাঁধা । ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশসহ (টিআইবি) বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নির্ভরযোগ্য গবেষণা অনুযায়ী কার্যকর দুর্নীতি পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হলে বাংলাদেশের জাতীয় আয়ের বৃদ্ধির হার আরও ১০ শতাংশের বেশি হতে পারত। দুর্নীতি একটি বৈশ্বিক প্রপঞ্চ এবং বিশ্বায়নের সংস্কৃতিতে বাংলাদেশের সমাজে দুর্নীতির ছাপ দেখা যায়। দেশের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা, আইনের শাসন, গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ, সুশাসন, উন্নয়ন, দারিদ্র্যমোচন ও সার্বিকভাবে ইতিবাচক সমাজ পরিবর্তনের পথে দুর্নীতি এক কঠোর প্রতিবন্ধক। এ থেকে পরিত্রাণের জন্য এখনই কার্যকর ভূমিকা গ্রহণ করা প্রয়োজন। অতীত থেকে দুর্নীতির ক্রমাগত ধারা বহমান এবং একাডেমিকভাবে দুর্নীতি বিষয়টিকে আলাদাভাবে গুরুত্ব দিয়ে গবেষণা করা হয়।

সাধারণভাবে অনৈতিক সুবিধা গ্রহণের প্রত্যাশায় ক্ষমতার অপব্যবহারকেই দুর্নীতি বলা হয়। অর্থাৎ ঘুস, চাঁদাবাজি, অপহরণ, প্রতারণা, জালিয়াতি ইত্যাদি দুর্নীতি হিসেবে পরিগণিত হয়। দুর্নীতি ঐ ব্যক্তিকেই দিয়ে হবে যার রাজনৈতিক পদমর্যাদা, দাপ্তরিক স্ট্যাটাস ও সামাজিক অবস্থান সুসংহত হওয়ায় প্রভাব খাটিয়ে ব্যক্তিগত ও সংগঠনের সুবিধার্থে অবৈধ কার্যক্রম সম্পন্ন করে থাকে। কাজেই দুর্নীতির পরিধি ব্যাপক এবং এর সঙ্গে নানাবিধ প্রক্রিয়া ও পদ্ধতিও জড়িত। জবাবদিহি ও দায়িত্ববোধের সুস্পষ্ট লঙ্ঘনের কারণেই স্বাভাবিকভাবে দুর্নীতির ছায়া সবখানেই ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের এক ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘একাত্তরের মতো প্রতিটি ঘরে দুর্নীতির বিরুদ্ধে দুর্গ গড়ে তুলতে হবে।’ যেখানে তিনি আরও বলেন ‘দুর্নীতিবিরোধী আইনের কথা, দুর্নীতিবাজ কাউকে ছাড় না দেওয়ার কথা, প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতার কথা, রাজনৈতিক সদিচ্ছার কথা এবং ছাত্র, তরুণ বুদ্ধিজীবীসহ সবনাগরিকের সংঘবদ্ধ গণ-আন্দোলনের কথা।’ কিন্তু তাঁর সে প্রত্যয় বাস্তবায়নের আগেই তাঁকে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে।

আইনের বাস্তবায়ন ও সম্প্রসারণের লক্ষ্যে সরকারকে সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকের দুর্নীতি, জালিয়াতি ও আর্থিক কেলেঙ্কারির সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিবর্গকে বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান; বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থায় পেশাদারি উৎকর্ষ ও কার্যকারিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সমন্বিত ও পরিপূরক কৌশল গ্রহণ; সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান ও সদস্যদের নিয়োগে যোগ্যতার মাপকাঠি নির্ধারণ এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নিয়োগদান; তথ্য অধিকার আইনে ব্যবসায়, রাজনৈতিক দল ও গণমাধ্যমকে অন্তর্ভুক্তিকরণ; তথ্য প্রকাশকারী ও তথ্যের আবেদনকারী উভয় ক্ষেত্রে সক্ষমতা বৃদ্ধিকরণ এবং নেতৃত্ব পর্যায়ে সৎ সাহস, দৃঢ়তা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে। দুর্নীতি প্রতিরোধ করতে হলে প্রথমেই দরকার শুদ্ধাচারের যথাযথ বাস্তবায়ন। এটা হলে সরকারি কর্মকর্তাদের কাজের স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে এবং স্বেচ্ছাচারিতা বন্ধ হবে। এ ব্যাপারে সরকারের নীতিনির্ধারক এবং দুর্নীতিদমন কমিশনের কঠোর নজরদারি বৃদ্ধি করতে হবে। দ্বিতীয়ত যারা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত, আয়ের সঙ্গে সংগতিহীন অর্থসম্পদ যাদের পাওয়া যাবে, তাঁদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে কেউ যেন দলীয় বা রাজনৈতিক আনুকূল্য না পান, তা নিশ্চিত করতে হবে। এই দুটি পদক্ষেপ নিলেই পরিস্থিতির অনেক উন্নতি হবে এবং অন্যরা তখন দমে যাবে।

দুর্নীতির প্রতিরোধ ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণের অপরিহার্যতার স্বীকৃতি পাওয়া যায় বর্তমান সরকারের প্রতিশ্রুতি, নির্বাচনি ইশতেহার, সরকারের বাৎসরিক বাজেট বক্তৃতা, বাৎসরিক উন্নয়ন কর্মসূচি, পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, দীর্ঘমেয়াদি ভিশন ও জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশলের মতো গুরুত্বপূর্ণ দলিলে যেখানে, সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতি প্রতিরোধের সুস্পষ্ট অঙ্গীকার লিপিবদ্ধ আছে। এসবেরই সমর্থনে ও সহায়ক ভূমিকার প্রয়াসে গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ ও বেসরকারি সংস্থার পক্ষ থেকে দুর্নীতিবিষয়ক তথ্য-উপাত্ত ও বিশ্লেষণ উপস্থাপন বা প্রকাশ করে থাকে। বাংলাদেশ জাতিসংঘের দুর্নীতিবিরোধী কনভেনশনের সদস্যভুক্ত হওয়া, তথ্য অধিকার আইন , তথ্য প্রকাশকারীর সুরক্ষা আইন ও জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল দুর্নীতিদমনে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পেরেছে। এসবের ফলে বাংলাদেশের দুর্নীতি কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়েছে, এমনটি বলা যাবে না। তবে যে সংস্কারগুলো হয়েছে তার প্রয়োগ ও চর্চা নিশ্চিত করতে পারলে কার্যকর দুর্নীতি প্রতিরোধ মোটেই অসম্ভব নয়।

বাংলাদেশে দুর্নীতির কারণ ও অন্যান্য বিষয় বিবেচনায় নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে রাষ্ট্র নিরপেক্ষভাবে অপরাধীদের জন্য উপযুক্ত বিচারের ব্যবস্থা করেছে। প্রেক্ষিতে দুর্নীতিবাজরা আইনের মুখোমুখি হচ্ছে এবং আদালতে বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি পাচ্ছে, মানিলন্ডারিং ও অর্থায়নের সাথে জড়িতদের আইনের মুখোমুখি করে বিচার করা হচ্ছে। ফলে দেখা যাচ্ছে, শাস্তির ভয়ে নতুন করে দুর্নীতির মতো ঘৃণ্য ও জঘন্য অপরাধের সাথে খুবই কম সংখ্যক সম্পৃক্ত হচ্ছে এবং দুর্নীতিবাজদের জন্য উদ্ভূত নানাপরিস্থিতিকে প্রতিকার ও প্রতিরোধের মাধ্যমে বর্তমান প্রজন্মকে সন্ত্রাসবাদে নিরুৎসাহী করে তুলেছে সরকার।সাম্প্রতিক সময়ে সরকার দুর্নীতি নিয়ে বেশ সরগরম অবস্থায় চলছে। চলমান পরিস্থিতিতে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপকে সকল পক্ষের লোকজন সাধুবাদ জানিয়েছে এবং অনেকেই আশার আলো দেখছেন। মন্ত্রী পরিষদের সকল সদস্য অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে সরকারের গ্রহণীয় পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছেন। সকলেই এক বাক্যে স্বীকার করেছেন, অভিযুক্ত ব্যক্তি যে দল থেকেই আসুক না কেন, অপরাধী অপরাধীই; তাঁর কোনো দলীয় পরিচয় থাকতে পারে না, সন্ত্রাসবাদের ন্যায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণের কৌশলই দুর্নীতি প্রতিরোধে সরকার সফল হচ্ছে। বর্তমান সরকার থেকে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলা হচ্ছে উপযুক্ত তথ্যপ্রমাণ পেলে যে কারোর বিরুদ্ধে দুর্নীতিবিরোধী চলমান গ্রেফতার কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে। এ প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে কেউ দুর্নীতি করার পূর্বে অন্তত কয়েকবার চিন্তা ভাবনা করেই দুর্নীতি না করার সিদ্ধান্ত নিবে।

পরিস্থিতি বিবেচনাপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণ, তদারকি, জনগণকে সচেতন করার মাধ্যমে বর্তমান সরকার দুর্নীতির অভিশাপ থেকে রাষ্ট্রকে মুক্তি দিতে বদ্ধপরিকর। সাম্প্রতিক সময়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের যে অবস্থান তা যথাযথভাবে কার্যকর করা সম্ভব হলে কেউই আর দুর্নীতি করতে সাহস পাবে না কিংবা কেউই অনুপ্রেরণা তথা মদদ যোগাবে না। দেশপ্রেমের মহিমা ও বিবেকবোধের মেলবন্ধন ব্যতীত দুর্নীতি প্রতিরোধ কখনোই সম্ভব নয়। উপর্যুক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, দুর্নীতি একটি সামাজিক ব্যধি। কাজেই দুর্নীতিকে সমাজ থেকে সমূলে উৎখাতের জন্য সরকার গৃহীত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহায়তা করতে হবে। দুর্নীতির সংজ্ঞা আমরা নিজেদের মতো করে পাল্টে নিয়েছি। সমাজের প্রতিটি স্তরেই যার যেটুকু ক্ষমতা আছে, সেটি ব্যবহার করেই অবৈধ অর্থ বা সুবিধা অর্জনকে আমরা রীতিমতো অধিকার বলে মানছি। যার যতদূর ক্ষমতা আছে, তার জোরেই আইন বা প্রশাসনকে অবজ্ঞা করে চলছে অবৈধ পথে উপার্জন। শুধু আইন প্রয়োগ করে বা শাস্তি দিয়ে দুর্নীতির এই পাহাড়কে টলানো যাবে না। দুর্নীতি দূর করতে হলে এই সংস্কৃতির পরিবর্তন দরকার, প্রয়োজন আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন আর নিজের সুবিধা অনুযায়ী ন্যায়অন্যায়ের সংজ্ঞা ঠিক না করে ভেজাল, দুর্নীতি ও ঘুসসহ সবধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া। এই জটিল ইস্যু থেকে উত্তরণে শীর্ষ হতে তৃণমূল পর্যন্ত জবাবদিহির চর্চা লালন ও পালন করতে হবে। সুতরাং আমাদের স্ব স্ব কর্মস্থলে ব্যক্তিগত পর্যায়ে সদিচ্ছা, দায়িত্ববোধ ও জবাবদিহি থাকলে দুর্নীতি প্রতিরোধ কোনো ক্রমেই অসম্ভব নয়।

-পিআইডি ফিচার

 

image_print