দেশ

ঘুষ দুর্নীতির আখড়া রাজাপুর সাব-রেজিস্ট্রার অফিস : ঘুষ ছাড়া সম্পত্তির দলিল হয় না

স্টাফ রিপোর্টার, বরিশাল: 

ঘুষ-দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে রাজাপুর সাব-রেজিস্ট্রার অফিস। দিনের পর দিন অসাধু চক্রের যোগসাজশে নামমাত্র ও ভুয়া কাগজপত্র দাখিল করে মোটা অঙ্কের ঘুষের মাধ্যমে চলছে দলিল রেজিস্ট্রির কাজ। এখানে ঘুষ ছাড়া কোনো দলিল রেজিস্ট্রি করা যায় না বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। স্থায়ী কোনো সাব-রেজিস্ট্রার নেই ২০২১ সাল থেকে। পাশের উপজেলা নলছিটির সাব-রেজিস্ট্রার দিয়ে এখানে দলিল রেজিস্ট্রির কাজ চলছে। এতে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন জমির ক্রেতা-বিক্রেতারা।

 

রাজাপুর সাব-রেজিস্ট্রার অফিস ভবনের ইটেও টাকা চায়। ঘুষ ছাড়া কাজ হয় না। যাঁরা আসেন তাঁরা মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিয়েই আসেন। এখানে যে কেউ দলিল সম্পন্নের জন্য আসলেও টাকা দিতে হবে।ক্ষোভের সঙ্গে এসব কথা বলছিলেন রাজাপুর সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে সেবা নিতে আসা মনিরুল ইসলাম।

 

নিষ্কণ্টক জমি হলে তারপরও সাব-রেজিস্ট্রারসহ অফিস খরচা বাবদ ঘুষ দিতে হয় বহায় মুল্যের শতকরা দুই ভাগ।

 

 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজাপুরে অতিরিক্ত দায়িত্বপালনকারী সাব-রেজিস্ট্রার একেএম সালাহ উদ্দিন এর বিরুদ্ধে সরকার নির্ধারিত রাজস্ব ফাঁকি দিতে জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে দলিল রেজিস্ট্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে। নালার স্থলে পতিত দেখিয়ে মোটা অঙ্কের রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়েছে।

ফলে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারিয়েছে সরকার। সাব-রেজিস্ট্রারের আশীর্বাদপুষ্ট অসাধু একটি দলিল লেখক চক্র যোগসাজশে এ দুর্নীতি করা হয়েছে।

 

সাব-রেজিস্ট্রার একেএম সালাহ উদ্দিন অফিসের কর্মচারীদের মাধ্যমে ঘুষ নিয়ে থাকেন।ক্রেতাদের থেকে দলিল লেখকরা প্রতিটি দলিলের বহায় মুল্যের শতকরা ২ ভাগ ঘুষের টাকা নিয়ে কখনো নকল নবীশ নেহারুন খানম, কখনো মোহরার গোপাল চন্দ্র দাস,কখনো অফিস সহায়ক আবুল কালামকে দেন। এর পরে দিন শেষে দলিল গননা করে ঘুষের টাকা ভাগ-বাটোয়ারা করা হয়। কাগজপত্র ভুল ত্রুটি হলে ঘুষের পার্সেন্টিজও বেড়ে যায় বলে একাধিক দলিল লেখকরা জানিয়েছেন।

 

নলছিটি উপজেলার সাব রেজিষ্ট্রার দিয়ে রাজাপুরে দলিল রেজিস্ট্রির কাজ চলছে। এতে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন জমির ক্রেতা-বিক্রেতারা। দলিল লেখকদের দাবি, প্রতিটি উপজেলায় একজন করে স্থায়ী সাব-রেজিস্ট্রার থাকার কথা। অথচ অজ্ঞাত কারণে স্থায়ীভাবে ২০২১ সাল থেকে সাব-রেজিস্ট্রার দেওয়া হচ্ছে না রাজাপুরে । ইয়াসমিন শিকদার বদলী হওয়ার পরে স্থায়ী কোন সাব রেজিষ্ট্রার দেয়া হয়নি।

 

রাজাপুর উপজেলার রোলা এলাকার ভুক্তভোগী হাসান বলেন, জমি বিক্রি করে বিদেশ যাবো। কিন্তু এখন সাব-রেজিস্ট্রারের জটিলতায় জমি বিক্রি করতে পারছি না। কেওতা এলাকার মিজান নামের একজন বলেন, আমার একটি নালা জমি বিক্রি করে চিকিৎসা নিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সাব-রেজিস্ট্রারের জটিলতায় জমি বিক্রি করতে পারছি না। অতিরিক্ত সাব-রেজিস্ট্রার দিয়ে কার্যক্রম চলায় কয়েক বছর ধরে লোকজন জমি কেনাবেচা করতে পারছেন না।

 

সরে জমিন ঘুরে দেখা গেছে দলিল সম্পাদিত করার জন্য ঘুষের প্রকাশ্য চিত্র। দলিলে উল্লেখিত বহায় মুল্যের শতকরা দুই ভাগ ঘুষের নগদ টাকা দিতে হয় দলিল লেখকদের মাধ্যমে সাব রেজিষ্ট্রার অফিসে। ঘুষের টাকা পাওয়ার পরেই শুরু হয় দলিল সম্পন্নের কাজ। দলিল সম্পাদনের শেষ পর্যায়ে টিপ সইয়ের জন্য দিতে হয় দুইশত থেকে পাচঁশত টাকা। দলিলের টিকেটের জন্য হাওয়ারাবাবদ দিতে হয় দুই থেকে পাচঁ শত টাকা। কেউ ঘুষের টাকা না দিতে চাইলে তাকে হেনস্থা করা হয়। নেয়া হয়না টিপ সই। দেয়া হয়না মুল দলিল পাবার টিকেট (স্লিপ) ও। পদে পদে ঘুষ না দিলে দলিলও হয়না।

 

স্থানীয়রা জানান, রাজাপুর সাব-রেজিস্ট্রার অফিস ঘিরে সক্রিয় একটি চক্র । এ চক্রের কারণে এখানে বেশিদিন থাকতে পারেন না কোনো সাব-রেজিস্ট্রার। তাদের চাপে কর্মকর্তারা দুর্নীতিতে জড়িয়ে যাচ্ছেন।এখানে ঘুষ দুর্নীতি চলে প্রকাশ্যে।

 

ঘুষের টাকা ভাগাভাগি :

দলিল নিবন্ধনে ঘুষ বাবদ আদায় করা অর্থ ভাগ করে নেন সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারী, দলিল লেখক ও সংশ্লিষ্ট দালালেরা। অভিযোগ রয়েছে,রাজাপুর সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে দলিল লেখকেরাই দলিল করার সময় অফিস খরচের অজুহাতে বাড়তি টাকা নেন। জানা যায়, সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের নিয়ন্ত্রণ নেহারুন বেগমের হাতে। ঘুষের ২৫ শতাংশই নেন তিনি। ৫০ শতাংশ দেন সাব-রেজিস্ট্রারকে, বাকি ২৫ শতাংশ ভাগাভাগি হয় অন্যদের মধ্যে।

 

ঘুষ লেনদেন প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত রয়েছেন সাব রেজিষ্ট্রার একেএম সালাহ উদ্দিন, অফিস সহায়ক আবুল কালাম,টিসি মোহরার মহিব্বুল্লাহ,মোহরার গোপাল চন্দ্র দাস ও নকল নবীশ নেহারুন খানম।

 

দলিল লেখকদের বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ:

 

জমির দলিল নিবন্ধনের ক্ষেত্রে দলিল লেখকদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। রাজাপুর সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে নিবন্ধিত দলিল লেখক আছেন। তাঁরা জমির ক্রেতা-বিক্রেতার চাহিদা অনুসারে দলিল লেখেন। এর জন্য নির্ধারিত হারে পারিশ্রমিক নেওয়ার কথা। ১৯৯৪ সালে আইন মন্ত্রণালয় থেকে দলিল লেখকদের পারিশ্রমিকের হার নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। কিন্তু দলিল লেখকেরা সে নির্দেশনা উপেক্ষা করে সেবাগ্রহীতাদের থেকে ইচ্ছেমতো টাকা নেন। না দিলে নানাভাবে হয়রানি করেন। সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের নিয়ন্ত্রকও অনেকটা দলিল লেখকেরাই। রাজাপুর সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের এজলাসে সাব-রেজিস্ট্রারের পাশে দাঁড়িয়ে নিবন্ধন কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করেন দলিল লেখক সমিতির নেতারা। জমির শ্রেণিসহ কাগজে গরমিল থাকলেও ঘুষের বিনিময়ে দ্রুত রেজিস্ট্রির ব্যবস্থা করেন তাঁরা।

 

রাজাপুর সাব রেজিস্ট্রার অফিস সম্পর্কে শিক্ষক খলিলুর রহমান বলেন, সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে অনিয়ম-দুর্নীতি অব্যাহত আছে। এসবের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে না। পুরো প্রক্রিয়া ডিজিটালাইজেশন করা হলে হয়তো দুর্নীতি অনেকটা কমে আসবে।

 

এ বিষয়ে কল করা হলে সাব-রেজিস্ট্রার একেএম সালাহ উদ্দিন জানান, কোন ঘুষ লেনদেন হয়না। তিনি সব অভিযোগ অস্বিকার করেন।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button