Home এক্সক্লুসিভ মৎস্য ভাণ্ডারে পরিণত হচ্ছে বরিশাল

মৎস্য ভাণ্ডারে পরিণত হচ্ছে বরিশাল

38
0
SHARE
Spread the love

খোকন হাওলাদার, বরিশাল ॥ 

শস্য ভান্ডারের পর এবার মৎস্য ভান্ডারে পরিনত হচ্ছে বাংলার ভেনিসখ্যাত বরিশাল অঞ্চল। সরকারী ও বেসরকারীভাবে প্রশিক্ষণসহ নানা উদ্যোগ গ্রহণ করায় নদ-নদী, খাল, পুকুর বেস্টিত জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচুর পরিমানে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ চাষ হচ্ছে।

প্রতিবছর এ অঞ্চলের চাহিদা পুরণের সাথে মাছ উৎপাদনে দেশের মৎস্যখাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বরিশাল। ওয়ার্ল্ডফিশ বাংলাদেশের কর্মকর্তারা জানান, বরিশালের বিভিন্ন অঞ্চলে ২০১২ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণের ফলে আগের চেয়ে মাছ উৎপাদন কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। মাছ চাষে আগ্রহ সৃষ্টির লক্ষ্যে সরকারী ও বেসরকারী উদ্যোগে এ অঞ্চলের বেকার যুবক-যুবতীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করায় মাছ চাষে আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে কয়েকগুণ। যেকারণে ওইসব প্রশিক্ষণপ্রাপ্তরা আজ সফল মাছ চাষী হিসেবে সমাজে পরিচিতি পেয়েছেন। সূত্রমতে, এখন পর্যন্ত বরিশাল অঞ্চলের প্রায় ৭০ হাজার বেকার যুবক-যুবতীদের মাছ চাষের ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। যারমধ্যে প্রায় ৫৫ শতাংশই ছিল নারী।

“বেশী বেশী মাছ চাষ করি, বেকারত্ব দূর করি” শ্লোগানকে সামনে রেখে শনিবার (২৮ আগষ্ট) থেকে শুরু হওয়া জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ উদ্যাপন উপলক্ষ্যে ইতোমধ্যে জেলার সর্বত্র ব্যাপক কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। উদ্বোধনী দিনে সড়কপথে বরিশালের প্রবেশদ্বার গৌরনদী উপজেলা প্রশাসন ও মৎস্য অধিদপ্তরের যৌথ উদ্যোগে শনিবার দুপুরে সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার বিপিন চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, দেশীয় প্রজাতির বিভিন্ন মাছ রক্ষা ও বংশ বিস্তারের জন্য গুরুত্বারোপ করে মাছের জন্য প্রাকৃতিক পরিবেশ তৈরী করাসহ অবৈধ কারেন্ট জাল, চায়না জাল বিক্রি, মজুদ ও ব্যবহারের ক্ষেত্র তৈরী না করাসহ বাঁশ কিংবা সুতা দিয়ে গড়া অপসারণের ওপর প্রশাসনের অভিযান পরিচালনার উপর জোর দেয়া হয়েছে। এজন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে মৎস্য সপ্তাহ উপলক্ষে পৌরসদরসহ উপজেলার সাতটি ইউনিয়নে মাইকিংসহ ব্যাপক প্রচার প্রচারনা করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, মাঠপর্যায়ে অভিযান পরিচালনা করে উপরোক্ত নির্দেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি মাছ চাষের ওপর গুরুত্বারোপ করা উপজেলা হচ্ছে বাবুগঞ্জ। জেলা মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ওই উপজেলার প্রায় সব বাড়িতেই রয়েছে ছোট-বড় অসংখ্য পুকুর। একসময় পরিত্যক্ত এসব পুকুরে অনেকেই নির্ভরশীল ছিলেন মৌসুমি মাছ চাষে। কিন্তু এখন সেই চিত্র বদলে গেছে। এসব পুকুরে এখন মাছ চাষ হচ্ছে বাণিজ্যিকভাবে। ফলে আগের চেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছেন প্রান্তিক মাছ চাষীরা।

বাবুগঞ্জ উপজেলার মাধবপাশা ইউনিয়নের গজালীয় গ্রামের বাসিন্দা ফাতেমা বেগমের স্বামী মারা গেছেন ২০১৪ সালে। স্বামীর মৃত্যুর পর তিনটি সন্তান নিয়ে ফাতেমা হতাশ হয়ে পরেছিলেন। পরবর্তীতে মৎস্য চাষের প্রশিক্ষণ পাওয়ার পর নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখেন ফাতেমা। তিনি বলেন, ২০১৫ সালে ৬ লাখ ২৫ হাজার টাকার বিভিন্ন প্রজাতির মাছের পোনা বিক্রি করেছি। সর্বসাকুল্যে তার খরচ হয়েছে ২ লাখ ৭১ হাজার টাকা। প্রথম বছরেই তার প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা লাভ হয়েছে। এরপর থেকে আর অভাব তাকে (ফাতেমা) ছুঁতে পারেনি। এ পর্যন্ত তিনি বাড়ির পুকুরে মাছ চাষ ও পারে সবজি চাষ ব্যবস্থাপনার বিষয়ে শতাধিক নারী-পুরুষকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। বর্তমানে ফাতেমা একজন সফল উদ্যোক্তা হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করায় স্বীকৃতি হিসেবে উপজেলা পর্যায়ে তিনি পুরস্কার অর্জন করেছেন।

উপজেলার রাবেয়া মৎস্য উৎপাদন কেন্দ্রে (হ্যাচারি) গিয়ে দেখা যায়, সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে হ্যাচারিটি পরিচালিত হচ্ছে। অনেক আগে থেকে হ্যাচারিটি মৎস্য চাষের সঙ্গে জড়িত হলেও ২০১৩ সাল থেকে বৈজ্ঞানিকভাবে এখানে মাছ চাষ হচ্ছে। এ অঞ্চলের বিভিন্ন ধরনের মাছের পোনা সরবরাহে বেশ সুনাম অর্জন করেছে হ্যাচারিটি। হ্যাচারির তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে থাকা কামরুল আহসান রাসেল বলেন, ২০১৩ সালে ওয়ার্ল্ডফিশ বাংলাদেশ কর্তৃক বাস্তবায়িত ইউএসএআইডি অ্যাকুয়াকালচার ফর ইনকাম অ্যান্ড নিউট্রিশন (ইউএসএআইডি-এআইএন) প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বৈজ্ঞানিকভাবে মাছ চাষে আগ্রহ হয়। তিনি আরও জানান, বর্তমানে হ্যাচারিতে আটটি পুকুর রয়েছে, যার আয়তন প্রায় ১০ একর। ২৪ হাজার গ্যালন ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন ওভারহেড ট্যাংক ও ৩২টি হ্যাচিং জার নিয়ে কার্পজাতীয় মাছের পোনা উৎপাদন করা হচ্ছে।

মাছ চাষে মোবাইল অ্যাপ : পুকুরে মাছ চাষ সহজ করা, দ্রুত সেবা প্রদান, সময়মতো তথ্য-উপাত্ত সহায়তা এবং চাষীদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদান করতে ব্যবহার করা হচ্ছে মোবাইল অ্যাপ। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোঃ আসাদুজ্জামান জানান, সরকারের কঠোর নির্দেশে চাষীদের দেখভাল করা, প্রশিক্ষণ, পরামর্শ প্রদান ও সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রাখার কারণেই শস্য ভান্ডারের পর এবার মৎস্য ভান্ডারে পরিনত হয়েছে বরিশাল। তিনি আরও জানান, চাষীদের পুকুর প্রস্তুতির সময়ক্ষণ, কীভাবে করবে, কী কী প্রজাতির মাছ ও সংখ্যা, প্রাকৃতিক দুর্যোগে করণীয়, মাছের পোনার আকার, উন্নত জাতের পোনার প্রাপ্তিস্থান, উচ্চ মূল্যের মাছ চাষের (শিং, মাগুর, পাবদা) খাদ্য ব্যবস্থাপনা, পুকুর ব্যবস্থাপনা, রোগের পরামর্শ সম্পর্কে চাষীদের প্রশিক্ষণ প্রদানসহ সার্বক্ষনিক সহায়তা করা হচ্ছে।