Home এক্সক্লুসিভ ভাসানচর রোহিঙ্গাদের স্বপ্নপুরী: ‘মানবতার জননীর’ মহতী উদ্যোগ

ভাসানচর রোহিঙ্গাদের স্বপ্নপুরী: ‘মানবতার জননীর’ মহতী উদ্যোগ

39
0
SHARE

মোতাহার হোসেন।।

মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য নোয়াখালীর ভাসানচরকে সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে প্রস্তুত করা হয়েছে। শহরের সকল সুযোগ সুবিধা  সম্বলিত আধুনিকভাবে জীবন যাপনের আদলে সাজানো হয় ভাসানচরকে। এখানে রোহিঙ্গাদের জন্য রয়েছে বিশুদ্ধ পানীয়জল, উন্নত স্যানিটেশন, ল্যাট্রিন, মসজিদ, মক্তব, মাদ্রাসা, শিশুদের জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সৌরবিদ্যুৎ, রান্নার জন্য জ্বালানি কাঠ, চিকিৎসার জন্য ক্লিনিকের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ২০১৭ সালের ২৫ আগষ্ট রাতের অন্ধকারে আকষ্মিক ভাবে প্রাণ বাঁচাতে মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা দলে দলে বাস্তুচ্যুত হয়ে টেকনাফের নাফ নদী অতিক্রম করে আশ্রয় নেয় কক্সবাজারের বিভিন্ন স্থানে। মিয়ানমারের সামরিক জান্তাদের নির্মম অত্যাচারের হাত থেকে প্রাণে বাঁচতে নিজ বসতভূমি ত্যাগ করে এখানে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়ে মানবিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে বাংলাদেশ। এ জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে, ‘মাদার  অব হিউমিনিটি’ তথা ‘মানতবার জননী’ খেতাবে ভূষিত করা হয়। সরকার বাস্তুচূত রোহিঙ্গাদের উন্নত জীবন যাপনের জন্য  তাদের নিরাপদ আবাসনের ব্যবস্থা করছেন। পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের শিশু সন্তানদের লেখা পড়ার জন্য স্থাপন করা হয়েছে স্কুল, মাদ্রাসা, মক্তব, নামাজের জন্য পর্যাপ্ত মসজিদসহ সকল সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে। সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার ভাসানচরে এক লাখ রোহিঙ্গাকে আবাসন সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। বিশ্বে উদ্ভাস্তু বা শরণার্থীদের বসবাসের জন্য এ ধরনের ব্যাতিক্রম এবং মানবিক উদ্যোগ বাংলাদেশেই প্রথম। বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত সমৃদ্ধ দেশেও এ ভাবে উদ্ভাস্তুদের জন্য আশ্রয় ও বসতি গড়ে দেওয়ার নজির নেই।

 

নোয়াখালীর ‘হাতিয়ার চরঈশ্বর ইউনিয়নের ভাসানচরে এক লাখ রোহিঙ্গার আবাসন এবং তাদের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণে পৃথক পৃথক প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। নির্দিষ্ট সময়ের আগে এ প্রকল্পের বাস্তবায়ন কাজ শেষ করা হয়। নৌবাহিনীর সার্বিক ব্যবস্থাপনায় বাস্তবায়ন করা হয় রোহিঙ্গাদের বসবাসের জন্য এই মহাকর্মযজ্ঞ। এ প্রকল্পের মধ্যে এই সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত ছিল প্রকল্প এলাকার চারপাশে বাঁধ উঁচুকরণ,সাইক্লোন থেকে রক্ষায় ভূমি থেকে ৫ ফুট উঁচু করে বাড়ি নির্মাণ প্রভৃতি। প্রকল্পটির আওতায় ৯ ফুট বাঁধের উচ্চতাকে ২১ ফুট পর্যন্ত বৃদ্ধি,সুরক্ষা বাঁধ সম্প্রসারণ ও মেরিন সুবিধাদি রাখা হয়েছে।  এছাড়া প্রকল্প এলাকার এক হাজার ১০০ একর অব্যবহৃত জায়গা ব্যবহার উপযোগী করে গড়ে তোলা হয়। এ প্রকল্পের আওতায় ভূমি উন্নয়ন ও শোর প্রোটেকশন ওয়ার্ক, বাঁধ নির্মাণ, এক লাখ তিন হাজার ২০০ জনের বসবাসের জন্য ১২০টি গুচ্ছগ্রামে এক হাজার ৪৪০টি ব্যারাক হাউস ও ১২০টি শেল্টার স্টেশন নির্মাণ, উপাসনালয় নির্মাণ, দ্বীপটির নিরাপত্তার জন্য নৌবাহিনীর অফিস ভবন ও বাসভবন, অভ্যন্তরীণ সড়ক, পানি নিষ্কাশন অবকাঠামো, নলকূপ ও পানি সরবরাহ অবকাঠামো নির্মাণ, পেরিমিটার ফেন্সিং ও ওয়াচ টাওয়ার নির্মাণ, বিভিন্ন যানবাহন ক্রয়, গুদামঘর, জ্বালানি ট্যাঙ্ক, হেলিপ্যাড, চ্যানেল মার্কিং ও মুরিং বয়, বোট ল্যান্ডিং সাইট, মোবাইল টাওয়ার, রাডার স্টেশন, সিসি টিভি, সোলার প্যানেল, জেনারেটর ও বৈদ্যুতিক সাবস্টেশন ইত্যাদি নির্মাণ করা হচ্ছে।

 

২০১৭ সালের আগস্ট থেকে ব্যাপকহারে মিয়ানমারের নাগরিক রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আসতে শুরু করে। বাংলাদেশে অবস্থানকারী রোহিঙ্গার সংখ্যা ১১ লাখ। তাদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা হলো ৪৮ শতাংশ এবং মহিলা ৫২ শতাংশ। এছাড়া শিশু রয়েছে ৫৫ শতাংশ, এতিম ৩৬ হাজার ৩৭৩ জন। এর মধ্যে ৭ হাজার ৭৭১ জন তাদের মা-বাবাকে হারিয়েছে।

 

এ অবস্থায় এক লাখ রোহিঙ্গার বসবাসের জন্য আশ্রায়ন শীর্ষক একটি প্রকল্প নেয়া হয়। প্রকল্পটি ২০১৭ সালের নভেম্বর থেকে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। এটি বাস্তবায়নে প্রথম থাপে মোট ব্যয় দুই হাজার ৩১২ কোটি ১৫ লাখ টাকা ধরা হয়। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের এক সভায় ভাসানচরের জন্য নেওয়া প্রকল্পের খরচ ৭৮৩ কোটি টাকা বাড়িয়ে তিন হাজার ৯৫ কোটি টাকা করা হয়। নোয়াখালীর হাতিয়া থানাধীন চরঈশ্বর ইউনিয়নের ভাসানচরে এক লাখ বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিকদের বসবাসের উপযোগী পরিবেশ গড়ে তোলা এবং দ্বীপটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ করাই এ প্রকল্পের উদ্দেশ্য।

 

রোহিঙ্গাদের জন্য আধুনিক বাসস্থান ছাড়াও বেসামরিক প্রশাসনের প্রশাসনিক ও আবাসিক ভবন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভবন, মসজিদ, স্কুল, হাসপাতাল, ক্লিনিক ও খেলার মাঠ গড়ে তোলা হয়েছে। এখানে দুটি ২০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল এবং চারটি কমিউনিটি ক্লিনিক তৈরির কাজ শেষ পর্যায়ে। এখানে মহিষ, ভেড়া, হাঁস, কবুতর পালন কর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সরকারি উদ্যোগে এসব করা হচ্ছে। শরণার্থীদের মধ্যে তাদের চাহিদা অনুযায়ী মহিষ, ভেড়া, হাঁস, কবুতর ,গরুর ছাগল প্রভৃতি বিনামূল্যে সরবরাহ করা হচ্ছে। পাশাপাশি আবাদ করা হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি। পরীক্ষামূলকভাবে ধান চাষও করা হচ্ছে। গড়ে তেলা হচ্ছে সবুজ বনায়ন।

 

 

 

-২-

 

প্রকল্পটি মূলত ক্লাস্টার হাউস, শেল্টার স্টেশন বা গুচ্ছগ্রামকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। মোট ১২০টি গুচ্ছগ্রামে ঘরের সংখ্যা এক হাজার ৪৪০টি। প্রতিটি ঘরে ১৬টি করে কক্ষ রয়েছে। এগুলো মাটি থেকে পাঁচ ফুট উঁচু করে নির্মাণ করা হয়েছে। এ ছাড়া, আনুমানিক ঘণ্টায় ২৬০ কিলোমিটার বেগের ঘূর্ণিঝড় সহনীয় একটি শেল্টার স্টেশন রয়েছে। কিন্তু এখানে রেহিঙ্গাদের না আসতে প্রকাশ্যে অপ্রকাশ্যে ষড়যন্ত্র করে দেশি বিদেশি কিছু এনজিও ও আন্তর্জাতিক কিছু স্বার্থানেষী মহল। এমনি অবস্থায় ভাসানচরের সামগ্রিক উন্নয়ন,বসতির উপযোগীতা, পারিপাশ্বিক অবস্থা দেখতে ২২টি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার (এনজিও) প্রতিনিধি দল  এবং ২০ সদস্যের রোহিঙ্গা প্রতিনিধিদল ভাসানচর পরিদর্শনে এসে সামগ্রীক অবস্থা দেখে তারা সন্তোষ প্রকাশ করেন। তারা জানান, উন্নতমানের একটি আবাসিক এলাকায় যে ধরনের সুযোগ-সুবিধা থাকার কথা, তার সবই রয়েছে ভাসানচরে। এমনি অবস্থায় কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে আশ্রয় নেয়া ৩৪টি শরণার্থী শিবিরের ১১ লাখ রোহিঙ্গা থেকে স্বেচ্ছায় ভাসানচরে যেতে ইচ্ছুক রোহিঙ্গাদের তালিকা প্রস্তুত করা হয়। সে অনুযায়ী অবশেষে গত ৩ঠা ডিসেম্ভর উখিয়া ডিগ্রি কলেজ মাঠে অস্থায়ী ট্রানজিট পয়েন্ট স্থাপন করা হয়েছে। রোহিঙ্গাদের পরিবহণের জন্য চট্টগ্রামে নৌ-বাহিনীর ১৪টি জাহাজ এনে রাখা হয়েছে এবং মজুত করা হয়েছে ৬৬ টন খাদ্যসামগ্রী। প্রথম দুই মাস তাদের রান্না করা খাবার সরবরাহ করা হবে। এরপর নিজ বাসস্থানেই তারা রান্না করতে পারবেন। প্রথম দফায় প্রায় সাড়ে ১৬’শ রোহিঙ্গাকে আনা হয় ভাসানচরে। পর্যায়ক্রমে আরো রোহিঙ্গা শরণার্থীরা এখানে আসবে। যারা এখানে এসেছেন তাদের অনুভূতি ব্যক্ত করে বলেন,“কক্সবাজারের রোঙ্গিহা ক্যাম্পের নরক থেকে এখানে স্বর্গে এসেছি। তাদের আশাবাদ কক্সবাজারে থাকা অপর রোহিঙ্গারাও ভাসানচর আসবে। বেসরকারি সংস্থার কর্মকর্তা জানান, বর্ষা মৌসুমে এমনিতেই কক্সবাজারে ভূমিধ্বস হয়। তাদের ভাসানচরে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত যুক্তিযুক্ত হয়েছে। রোহিঙ্গা শরণাথীদের জন্য ভাসানচরে সুন্দর পরিবেশে স্থানান্তরের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে ‘মানবতার জননী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার’ আরেকটি মহতী উদ্যোগ। প্রত্যাশা থাকবে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ভাসানচরে স্থানান্তর নিয়ে আন্তর্জাতিক মহল সরকারকে সহযোগিতা করবে। একই সাথে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরতে সব ধরনের প্রচেষ্টা এবং মিয়ানমারের উপর চাপ অব্যাহত রাখবে।

১৪.১২.২০২০                                      পিআইডি ফিচার

 

লেখক : সাংবাদিক, সাধারণ সম্পাদক-বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জা জার্নালিস্ট ফোরাম।