Home উপ-সম্পাদকীয় রোহিঙ্গা শরণার্থী ইস্যুতে সরকারের মানবিকতা

রোহিঙ্গা শরণার্থী ইস্যুতে সরকারের মানবিকতা

75
0
SHARE

মো. জাহাঙ্গীর আলম।।

 

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর পররাষ্ট্রনীতিতে বিশ্বের নির্যাতিত ও নিপীড়িত মানুষের পাশে থাকার অঙ্গীকার করেছিলেন। আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা সমগ্র বিশ্বের শরণার্থী তথা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য যে মানবিকতা দেখিয়েছেন তা বিশ্ববাসীর কাছে একটি উদাহরণ হয়ে থাকবে। আজ বিশ্ব দরবারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘মাদার অব হিউমানিটি’ বা ‘মানবতার মা’ হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছেন। নেদারল্যান্ডের নামকরা ডিপ্লোম্যাট ম্যাগাজিন সাময়িকী তাদের প্রচ্ছদ প্রতিবেদনের শিরোনাম করেছিলো ‘শেখ হাসিনা: মাদার অব হিউম্যানিটি’। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে জোরপূর্বক বাস্তচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিকদের আশ্রয় দিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের সীমান্ত খুলে দেওয়ার সিন্ধান্ত নিয়ে লাখ লাখ নির্যাতিত মানুষের জীবন রক্ষা করেছেন। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য সরকার মানবিক সাহায্য সহায়তা কার্যক্রম অব্যাহত করাসহ তাদেরকে প্রত্যাবাসনের জন্য কূটনৈতিক কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোহিঙ্গা সংকট নিরসনসহ স্থায়ী সমাধানে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭২তম অধিবেশনে পাঁচ দফা এবং ৭৪তম অধিবেশনে চার দফা প্রস্তাব রাখেন। সম্প্রতি, এক লাখের অধিক রোহিঙ্গা শরণার্থীর জন্য ভাসানচরে তৈরি করা হয়েছে সবচেয়ে বড়ো আধুনিক অস্থায়ীভিত্তিতে আবাসন ব্যবস্থা।

 

কোনোভাবেই শরণার্থীর সংখ্যা কমছে না বরং নানা কারণেই সারাবিশ্বে দিন দিন শরণার্থীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। নিজ বাড়ি-ঘর ছেড়ে পালানো জনগোষ্ঠীর মধ্যে শরণার্থীর সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। এসব শরণার্থীরাই বিভিন্ন ক্যাম্পে খোলা আকাশে মানবেতর জীবনযাপন করছে। এখনও যুদ্ধ-বিগ্রহ, সীমান্ত নীতি, গৃহযুদ্ধ ও জাতিগত বৈষম্যর ঘটনা নিয়ত ঘটছে। আর এসব সহিংসতার শিকার হয়ে অনেক মানুষ শরণার্থী হচ্ছে। আধুনিক এই বিশ্ব সভ্যতার ইতিহাসের সবচেয়ে করুণ বিষয় হলো বিশাল সংখ্যাক একটি জনগোষ্ঠী নিজ ঘর-বাড়ি, দেশ ছেড়ে অন্য কোনো দেশে শরণার্থী জীবনযাপন করছে। আর এই শরণার্থীরাই  সবচেয়ে বেশি সংকটে ভুগছে। বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে রাজনৈতিক, সামরিক, জাতিগত ও মতাদর্শের নানা সংকট মানুষের কাছ থেকে কেড়ে নিচ্ছে জাতি পরিচয়, বেঁচে থাকার অধিকার। ইউনাইটেড নেশনস হাই কমিশনার ফর রিফিউজিস (ইউএনএইচসিআর) এর মতে বর্তমানে প্রায় ৮ কোটি মানুষ নিজ ঘর, বাড়ি ছেড়েছে, এমনকি দেশ ছেড়েছে । শরণার্থী পরিচয় মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে প্রায় ২ কোটি ৬০ লাখ মানুষ। এসব শরণার্থীর অধিকাংশই বয়স ১৮ বছরের নীচে। এখনও ১ কোটি মানুষের কোনো পরিচয় নেই। কোনো দেশই এদের নাগরিক অধিকার ও স্বীকৃতি দিচ্ছে না। তারা যেন এই পৃথিবী নামক গ্রহের কেউ নয়। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। কেননা এই সকল শরণার্থীদের মানবাধিকার রক্ষা করা না গেলে প্রকৃত টেকসই উন্নয়ন কঠিন হয়ে পড়বে।

 

পৃথিবীর অন্যতম অত্যাচারিত এবং নিপীড়িত একটি জাতিসত্তার নাম রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নিধন কোনো নতুন বিষয় না। বিগত চার দশকের বেশি সময় ধরে রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার সেনাদের  পরিকল্পিত আক্রমণ বিশ্ববাসীর অজানা নয়। ১৯৭৮ সাল প্রথম মিয়ানমার থেকে সে দেশের সেনাবাহিনী কর্তৃক নির্যাতিত হয়ে রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আসতে শুরু করে এবং আশ্রয় নেয়। তবে সে সময় বিষয়টি সাময়িক মনে করা হলেও এখন তা স্থায়ী সমস্যা হিসেবে বিরাট আকার ধারণ করেছে। সর্বশেষ ২০১৬ সালের অক্টোবর ও ২০১৭ সালের আগস্ট মাস থেকে আবার নতুন করে রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণের উদ্দেশ্যে অনুপ্রবেশ করে। বাংলাদেশের কক্সবাজার জেলার উখিয়া, কুতুপালং ও টেকনাফ উপজেলাসহ বিভিন্ন জায়গায় প্রায় ১১ লাখের অধিক রোহিঙ্গা শরণার্থী অবস্থান করছে। এ সকল রোহিঙ্গা স্থায়ী ও অস্থায়ী ক্যাম্পে অবস্থান করছে দীর্ঘ ৪ দশক ধরে। এমনকি সারাদেশে রোহিঙ্গারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে অবস্থান করছে বলে বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও গবেষণায় এসেছে। বিভিন্ন সময় মিয়ানমারের জাতিগত সহিংসতার কারণে এখনও রোহিঙ্গারা আসছে এদেশে।

 

যদিও বাংলাদেশ ১৯৫১ সালের জাতিসংঘের শরণার্থী কনভেনশনে স্বাক্ষরকারীর দেশ নয়, তা সত্ত্বেও বিশ্বের অত্যাচারিত, নির্যাতিত ও নিপীড়িত এইসব মানুষের পাশে সবসময় আছে। যার অন্যতম উদাহরণ আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাংলাদেশ সরকার অব্যাহত রেখেছে তার মানবিক সাহায্য সহায়তা আর প্রত্যাবাসনের জন্য

 

কূটনৈতিক প্রচেষ্টা। বর্তমানে কক্সবাজার জেলার উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার দশ হাজার একরের অধিক গভীর বনাঞ্চলের ৩৪টি ক্যাম্প শিবিরে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা বসবাস করছে। বাংলাদেশ সরকার এবং ইউএনএইচসিআর এর তত্ত্বাবধানে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এসব শরণার্থীদের খাদ্য ও চিকিৎসাসহ বিভিন্ন মানবিক সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয়, কক্সবাজারে ৩৪টি রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরের প্রশাসনিক ও নিরাপত্তাসহ সার্বিক সহায়তা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের অনুপ্রবেশের পর বাংলাদেশ সরকার প্রথমে মিয়ানমারেরর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেয়। ইতিমধ্যে কয়েক দফা তারিখ দিয়ে প্রত্যাবাসনের চেষ্টা চালিয়েও রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন করা সম্ভব হয়নি। তাছাড়া কোভিড-১৯ মহামারির মধ্যে রোহিঙ্গাদের স্বদেশ প্রত্যাবাসন সম্ভব হয়নি।

 

রোহিঙ্গা শরণার্থী ব্যবস্থাপনায় দেশের সরকারি জনবল ব্যবহার হচ্ছে, সার্বিক পরিবেশের ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে, স্থানীয় জনগোষ্ঠী তাদের সুযোগ-সুবিধা হারাচ্ছে। সরকার সামাজিক নিরাপত্তাসহ অন্যান্য মানবিক সাহায্যে খরচ করছে। সরকার তার বাজেটের একটি অংশ রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মানবিক কল্যাণে খরচ করছে। যদিও এই শরণার্থীদের মানবিক সহায়তা কর্মসূচিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় অর্থ প্রদান করছে, তারপরও সরকার তার নিজস্ব তহবিল থেকেও ব্যয় নির্বাহ করছে। সরকার রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবাসনের জন্য অব্যাহত রেখেছে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা। মিয়ানমার থেকে বিভিন্ন সময়ে পালিয়ে আসা বিশাল সংখ্যক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে বাংলাদেশ সরকার আশ্রয় ও মানবিক সাহায্য সহায়তা প্রদান অব্যাহত রেখেছে। সরকারের বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থা এসব শরণার্থীদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রয়োজীয় মানবিক সাহায্য সহায়তা প্রদান অব্যাহত রেখেছে। সরকারের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয় সরকারের বিভিন্ন দপ্তর/সংস্থা এসব কার্যক্রমে সমন্বয় করে। রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির ক্যাম্পে আশ্রয়প্রার্থী এতিম শিশুর সংখ্যা চল্লিশ হাজারের অধিক, এদের প্রায় নয় হাজার শিশুর মা-বাবা কেউ নেই। এইসব এতিম শিশুদের তত্বাবধান ও সুরক্ষার জন্য সমাজসেবা অধিদপ্তর ও ইউনিসেফ এর যৌথ উদ্যেগে এতিম শিশুদের লালনপালনকারী পরিবারকে নগদ সহায়তা কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।

 

সরকার আশ্রয়ণ-৩ প্রকল্পের আওতায় এক লাখের অধিক রোহিঙ্গা শরণার্থীদের অস্থায়ীভিত্তিতে আবাসন ব্যবস্থা করেন ভাসানচরে। নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার চরইশ্বর ইউনিয়নের ভাসানচরের এ প্রকল্পের থাকছে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিরাপদ আবাসন, স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনযাপনের পাশাপাশি থাকছে জীবিকার নির্বাহে সুবিধাসহ আধুনিক সকল সুযোগ-সুবিধাদি। প্রায় তিন হাজার ৯৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় এক লাখের বেশি রোহিঙ্গার জীবন-জীবিকার জন্য তৈরি করা হয়েছে ভাসানচর আশ্রয়ণ-৩ প্রকল্প। ভাসানচর বসবাসের উপযোগী করার জন্য অবকাঠামো উন্নয়ন, বনায়ন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রায় ১৩ হাজার বর্গকিলোমিটারের এই দ্বীপের ছয় হাজার ৪২৭ একর ব্যবহারের উপযোগী ভূমির মধ্যে এক হাজার ৭০২ একর ভূমিতে রোহিঙ্গাদের অস্থায়ীভাবে বসানোর জন্য আবাসন প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়। আমাদের সরকার রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মানবিক সাহায্য কার্যক্রম প্রদানে সাধ্যমত চেষ্টা করছে।

 

বিশ্ব শরণার্থী দিবস-২০২১ এর এবারের প্রতিপাদ্য: Togther we heal, learn and shine. করোনা মহামারির এই সময় বিশ্বের সকল শরণার্থী সুস্বাস্থ্য ও সুরক্ষা থাকবে, আর একদিন তারাও ফিরে পাবে তাদের সেই স্বাভাবিক স্বাধীন জীবন এইটাই আমাদের কামনা। বিশ্বের শরণার্থীদের ন্যায্য অধিকার ফিরিয়ে দিতে উন্নত ও প্রভাবশালী রাষ্ট্রসমূহ আরো দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে এইটাই এ বিশ্ব শরণার্থী দিবসের প্রত্যাশা আমাদের। আমরা প্রতিজ্ঞা করবো বিশ্বের সকল শরণার্থীদের প্রতি আমরা আরো মানবিক হবো আর ভাববো তারাও আমাদের পরিবারের কেউ। খোলা আকাশে বসবাস করা ৮ কোটি শরণার্থীদের মানবিক অধিকার রক্ষা এবং সুস্বাস্থ্য স্বাভাবিক জীবনযাপনের প্রত্যাশা করি আজকের এই দিনে।

 

লেখক : সিনিয়র তথ্য অফিসার, তথ্য অধিদফতর।