জাতীয়

আমাদের মিডিয়া পিপল একদম ফ্রি, আমরা কারও কণ্ঠরোধ করি না-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে জানতে চেয়েছে মার্কিন দল

কূটনৈতিক  প্রতিবেদক:

আগামী জাতীয় নির্বাচনে পর্যবেক্ষক পাঠাবে কিনা সেটি যাচাইয়ে বাংলাদেশ সফররত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক-নির্বাচনী পর্যবেক্ষক দল নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, অবাধ নির্বাচন আয়োজনে সরকারের প্রস্তুতি, প্রার্থী ও ভোটারদের নিরাপত্তাসহ যাবতীয় বিষয়ে জানতে চেয়েছে।

নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজনে সক্ষমতা এবং অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের সদিচ্ছার বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের কাছে জানতে চেয়েছে।

একই সঙ্গে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সংশোধন করে সাইবার নিরাপত্তা আইনটি নিয়ে বিস্তারিত জানতে আইনমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন।

বৈঠকে দুটি আইনের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে চেয়েছে প্রতিনিধি দলটি। উভয় বৈঠকেই বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় প্রতিনিধি দলকে খুঁটিনাটি বিষয় উত্থাপন করেছে।

দুপুরে প্রতিনিধি দলের বৈঠকের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সাংবাদিকদের বলেন, ভোট কারচুপি করে কেউ পার পাবে না এবং এ ধরনের মনোবৃত্তি আমাদের রাজনৈতিক দলের নেই বলে মার্কিন প্রাক-নির্বাচনী পর্যবেক্ষক দলকে জানানো হয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমি তাদের (পর্যবেক্ষক দলকে) বলেছি, আমাদের মিডিয়া পিপল একদম ফ্রি। তারা যে কোনো সংবাদ যে কোনো সময় ছাপিয়ে দেন। সেই ব্যাপারে আমরা কারও কণ্ঠরোধ করি না।

এর আগে দুপুর ১টা ৩৫ মিনিটে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে বৈঠক শুরু হয়। মার্কিন প্রাক-নির্বাচন বিষয়ক পর্যবেক্ষক প্রতিনিধি দলের মধ্যে ছিলেনÑ যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের (আইআরআই) প্রতিনিধি বনি গ্লিক, জামিল জাফের, জোহানা কাউ ও কার্ল রিক এবং ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক ইনস্টিটিউটের (এনডিআই) মারিয়া চিন বিনতি আব্দুল্লাহ, মনপ্রিত সিং আনন্দ ও ক্রিগ হলস্টেড।

দুপুর ১টা ৩০ মিনিটে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে উপস্থিত হয় প্রতিনিধির দল। পাঁচ মিনিট পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সভাকক্ষে প্রবেশ করেন তারা।

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে পরিস্থিতি যাচাই করতে গত ৭ অক্টোবর ঢাকায় আসেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক-নির্বাচনী পর্যবেক্ষক দলের সাত সদস্য।

আইআরআই ও এনডিআইয়ের হয়ে যৌথভাবে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ প্রাক-নির্বাচন সমীক্ষা মিশন পরিচালনা করবেন তারা। সাত সদস্যের প্রতিনিধি দল এবং তাদের সহায়তাকারীদের ১৩ অক্টোবর পর্যন্ত বাংলাদেশে অবস্থান করার কথা রয়েছে। দলটি বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন, সরকারি সংস্থা, রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, নারী সমাজ, সুশীল সমাজ, বিভিন্ন সংস্থা এবং বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এবং ঢাকার বিদেশী মিশনের কূটনীতিকদের সঙ্গে কথা বলছে।

বৈঠকের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, আমাদের তিন হাজারেরও বেশি দৈনিক সংবাদপত্র রয়েছে। এরপর রয়েছে সামাজিক মাধ্যম। সেখানে তো বিভিন্ন ধরনের সংবাদ দেওয়া হয়। কাজেই এখানে দুর্নীতি করে কিংবা ভোট কারচুপি করে কেউ পার পাবে বলে আমার মনে হয় না। সেই ধরনের মনোবৃত্তি আমাদের রাজনৈতিক দলের আর নেই।

সবাই মনে করে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। নির্বাচন কমিশন তাদের তত্ত্বাবধানে একটা সুন্দর নির্বাচন উপহার দেবে, এই ছিল কথা, যোগ করেন আসাদুজ্জামান খান কামাল।

মন্ত্রী বলেন, তারা আমাদের কাছে বিভিন্ন বিষয়ে জানতে চেয়েছেন। আমরা বলে দিয়েছি সহিংসতা আমরা অনেক মোকাবিলা করেছি। এখন প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে সহিংসতা ও সন্ত্রাসীমুক্ত এবং শান্তির সুবাতাস দেখছি দেশে। প্রধানমন্ত্রী আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করেছেন। প্রধানমন্ত্রী আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি বলেন, দেশের লোক সবসময় শান্তিপূর্ণ পরিবেশ চায়, কোনো রকম মারামারি দেশের মানুষ পছন্দ করে না। এখানে সহিংসতা হবে বলে আমরা মনে করি না।

এই নির্বাচন কমিশন ৫ হাজার ৩০০টি নির্বাচন করেছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘নির্বাচন আয়োজনের জন্য আমাদের নিরাপত্তা বাহিনী নির্বাচনের দায়িত্বে থাকে। নিরাপত্তা বাহিনী নির্বাচন কমিশনের অধীনে থেকে নির্বাচন সম্পন্ন করেছে। ‘পুলিশ যথেষ্ট প্রশিক্ষিত, কীভাবে নির্বাচন করতে হয় সেই জ্ঞান তাদের রয়েছে।

একই রকমভাবে বিজিবি, কোস্ট গার্ড, আনসার নির্বাচনে ভূমিকা পালন করে। নির্বাচনে ছয় লাখের ওপর আনসার সদস্য পুলিশের পাশাপাশি মূল ভূমিকা পালন করবে। প্রয়োজন মতো নির্বাচন কমিশন সেনাবাহিনীও সহযোগিতা নেয়, আমরা তাদের সেটিও মনে করিয়ে দিয়েছি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, এই নির্বাচন আয়োজন করতে নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর সক্ষমতা আছে কি না, তারা তা জানতে চেয়েছিলেন। আমরা তাদের বিস্তারিত বলে দিয়েছি। তিনি বলেন, ‘তাদের জানিয়েছি আগে যে রকম সহিংসতা হতো এখন সেই সহিংসতা হবে না। আমরা মনে করি আমাদের উপমহাদেশে নির্বাচন আসলেই উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়।

নির্বাচনে যারা অংশ নেবেন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা তাদের নিরাপত্তা দিতে পারবে কি না এবং বিরোধী দল নির্বাচনে এলে সঠিকভাবে প্রচারণা চালাতে পারবে কি না- স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে এমন প্রশ্ন করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক-নির্বাচন পর্যবেক্ষক দল।

জবাবে মন্ত্রী তাদের বলেন, আমরা বলে দিয়েছি নির্বাচনের সময় রিটার্নিং অফিসার হচ্ছে সর্বময় ক্ষমতাধর ব্যক্তি, তার নেতৃত্বে তার এলাকার নির্বাচন হবে। নির্বাচনের সময় পুলিশ বাহিনী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হয়। ৯৯৯ নম্বরে ফোন করলে পুলিশ বাহিনী তৎপর থাকে। আমাদের নিরাপত্তা বাহিনী প্রশিক্ষিত, এখানে কোনো অসুবিধা হবে বলে আমরা মনে করি না। ’৮০-’৯০ এর দশকে সহিংসতা হতো, এখন আর এগুলো হয় না।

বিএনপি নির্বাচনে না এলে সহিংসতা হবে কি নাÑ জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমি তো মনে করি তারা নির্বাচনে আসবে। আমি মনে করি বাংলাদেশে সরকার বদল করতে হলে ইলেকশনে আসতে হবে। ইলেকশন ছাড়া বাংলাদেশে সরকার বদল করার কোনো উপায় নেই। ইলেকশনে তাদের আসতেই হবে, আমরা এটি মনে করি।

নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠকের পর প্রতিনিধি দলটি আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের কাছে সাইবার নিরাপত্তা আইন নিয়ে জানতে চায়। সম্প্রতি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পরিবর্তন করে সাইবার নিরাপত্তা আইন করেছে সরকার।

এই আইনে কোনো ধরনের পরিবর্তন রয়েছেÑ
সে বিষয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের কাছে জানতে চেয়েছে মার্কিন পর্যবেক্ষক দল।

আনিসুল হক বলেন, প্রতিনিধি দলের সঙ্গে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের পরিবর্তে করা সাইবার নিরাপত্তা আইনের বিষয়ে কথা হয়েছে।

এ ছাড়াও অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের বিষয়েও কথা হয়েছে। আমি ওনাদের বলেছি, শেখ হাসিনার সরকার অবাধ, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন করার ব্যাপারে অঙ্গীকারাবদ্ধ। নির্বাচন অবাধ, নিরপেক্ষ এবং শান্তিপূর্ণ হবে।

এই সরকার অবাধ, নিরপেক্ষ এবং শান্তিপূর্ণ নির্বাচন করার জন্য নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা বজায় রাখার জন্য প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের যে আইন এই উপমহাদেশে নেইÑ এ দেশেও ৫০ বছর ছিল না, সেটি প্রণয়ন করেছে।

তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হওয়ার জন্য আইনের কিছু পরিবর্তন চেয়েছিল। সেই পরিবর্তন করা হয়েছে। আমি বলেছি, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরপরই নির্বাচন সংক্রান্ত যেসব অফিস-আদালত, ডিপার্টমেন্ট আছেÑ সেগুলো নির্বাচন কমিশনের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। এ তিনটি জিনিস দেখেলেই বোঝা যাবে শেখ হাসিনার সরকার বাংলাদেশ অবাধ, নিরপেক্ষ এবং শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক সেটা তারা চায়।

আইনমন্ত্রী বলেন, ‘তাদের (মার্কিন প্রতিনিধি দল) মূল বক্তব্য ছিল ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট এবং সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্টের মধ্যে পার্থক্যটা কোথায়? আমি সেই পার্থক্যের কথা তাদের অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে বলেছি।

নির্বাচন নিয়ে আমাকে কোনো পরামর্শ দেননি তারা, জানতে চেয়েছেন। সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্ট, জুডিসিয়ারি বিষয়ে জানতে চেয়েছেন। আমি জুডিসিয়ারির সম্পূর্ণ ইতিহাস তুলে ধরেছি। মামলাজট বিষয়ে জানতে চেয়েছেন, এজন্য আমরা কী করেছে সেটি বলেছি।

সংলাপের বিষয়ে কিছু বলেছে কি না জানতে চাইলে আনিসুল হক বলেন, সংলাপ হবে কি না জানতে চাননি তারা। কেউ নির্বাচনে আসবে না এমন আশঙ্কা করা হচ্ছে কি না, এটা জিজ্ঞাসা করেছেন। আমি বলেছি, শেখ হাসিনার সরকার চায় সব দল নির্বাচনে আসুক। কিন্তু কে নির্বাচনে আসবে, কে নির্বাচনে আসবে নাÑ সেটা সেই দলের সিদ্ধান্ত।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button