Home প্রধান খবর আজ বিশ্ব ভালবাসা দিবস

আজ বিশ্ব ভালবাসা দিবস

264
0
SHARE

সময়ের চিত্র ডেস্ক ॥ এই সুরে কাছে দূরে জলে স্থলেবাজায় বাঁশি/ভালোবাসি, ভালোবাসি…। আজ সেই ‘ভালবাসি’ বলার বিশেষ দিবস। শাশ্বত প্রেমের কাছে নত হওয়ার দিন। ভালবাসার মহা অনুভূতি জাগানিয়া ১৪ ফেব্রুয়ারি আজ। আজ ভ্যালেনটাইন ডে।

যারা চুপি চুপি এতদিন কেবল ভালবেসে গেছেন, আজ বলি, মুখ খুলুন। ভালবাসার মানুষটিকে নির্র্দ্বিধায় জানিয়ে দিন, তার জন্য হৃদয় পুড়ছে আপনার। যখন তখন চোখ জল। কারণে তাকে চাই। অকারণেও। প্রিয় গায়ক কবীর সুমন যেমনটি গেয়েছিলেন, ‘প্রথমত আমি তোমাকে চাই/দ্বিতীয়ত আমি তোমাকে চাই/তৃতীয়ত আমি তোমাকে চাই/শেষ পর্যন্ত তোমাকে চাই।’ চাই যদি আর দেরি কেন? ‘ভালবেসে, সখী, নিভৃতে যতনে/আমার নামটি লিখো- তোমার/মনের মন্দিরে।’ লিখে ফেলুন প্রিয় নাম। তার হাতটি ধরুন। ধরতে দিন। বলুন, ‘নিরাশ্রয় পাঁচটি আঙ্গুল তুমি নির্দ্বিধায়/অলঙ্কার করে নাও, এ আঙ্গুল ছলনা জানে না।’ এভাবে জমে ওঠুক ভালবাসাবাসি। ভালবাসার পায়ের কাছে ঘৃণা বিদ্বেষ সঙ্কীর্ণতার তরবারি রেখে আত্মসমর্পণ করুন। খুশি মনে পরাজয় মেনে নিন। এই সমাজ পৃথিবী পরিশুদ্ধ হোক আপনাদের প্রেমে।

হ্যাঁ, প্রতিবারের মতো এ কথাগুলোই যেন বলতে এসেছে বিশ^ ভালবাসা দিবস। পাশ্চাত্য থেকে আসা। তবে ভালবাসার তো আর দেশ কাল হয় না। সবখানেই এর সমান আবেদন। তাই বিশে^র অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও উদ্যাপিত হয়। প্রথম দিকে একটু ফিসফিস ছিল। এখন বেশ ঘটা করেই উদ্যাপন করতে দেখা যায়। আজও দিবসটি উদ্যাপিত হবে। ভালবাসার শক্তিতে সুন্দর সমাজ প্রেমময় পৃথিবী গড়ার শপথ নেবে মানুষ। বিশেষ করে তরুণ তরুণীদের কাছে দিবসটি স্বতন্ত্র আবেদনের। আবেগের। এই আবেগ নানা ভাবে প্রকাশিত হবে।

কবিগুরু বলেছিলেন, তোমার গোপন কথাটি, সখী রেখো না মনে।/শুধু আমায়, বোলো আমায় গোপনে…। হৃদয়ের একান্ত গোপন কথাটি আজ প্রকাশ করবেন প্রেমিক প্রেমিকারা। পাশ্চাত্যের স্টাইলে প্রিয়জনের সামনে হাঁটু গেড়ে ঠিক বসে পড়বেন। প্রস্তাবাকারে বলবেন, উইল ইউ বি মাই ভ্যালেনটাইন? প্রেমিক-প্রেমিকারা পরস্পরের মধ্যে বিভিন্ন উপহার আদান প্রদান করবেন। মোবাইল ফোন, এসএমএস, ফেসবুক, টুইটারসহ সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো ব্যবহার করে পাঠানো হবে ভালবাসার খুদে বার্তা। প্রেমিকের হাত হয়ে প্রেমিকার সুবিন্যস্ত খোঁপায় উঠবে রক্ত গোলাপ ফুল।

পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন অনুভূতিগুলোর একটি নিঃসন্দেহে ভালবাসা। মানুষ দিন শেষে ভালবাসার কাছেই ফিরেছে। ফিরতে হয়েছে। রজকিনীর প্রেমে পাগল চ-ীদাস টানা বারো বছর বড়শি পেতে পুকুর পাড়ে বসেছিলেন। প্রেমের মাছ তার পর তুলতে পেরেছিলেন তিনি। একই নেশায় বুঁদ হয়ে হাসন রাজা গেয়েছিলেন, ‘নিশা লাগিলরে, বাঁকা দুই নয়নে নিশা লাগিলরে।’ ভাটি বাংলার এই লোককবির নিশা আর কাটেনি কোন দিন। বরং অনলে পুড়েছে ভেতর বাহির। কাউকে বলে তা বোঝাবার নয়। সুনামগঞ্জের অসহায় প্রেমিক কবি তাই সুর তোলেন: ধাক্ ধাক্ কইরা উঠল আগুন ধৈল আমার প্রাণে/সুরমা নদীর জল দিলে নিভে না সে কেনে?’ কে দেবে উত্তর? অন্যদিকে, রাধারমণ গাইছেন, ‘আমি রব না রব না গৃহে বন্ধু বিনে প্রাণ বাঁচে না।’ প্রায় একই উচ্চারণ শাহ আবদুল করিমের। তার বলাটি এরকম: আমি ফুল বন্ধু ফুলের ভ্রমরা/কেমনে ভুলিব আমি বাঁচি না তারে ছাড়া…। মনের মানুষটি ছাড়া সত্যি বাঁচা দায়। ভালবাসাহীন জীবন বিবর্ণ। আর তাই যত আকুলি বিকুলি সব ভালবাসার জন্য।

এবারও ভালবাসা দিবস ঘিরে নতুন করে দেখা দিয়েছে চিত্ত চাঞ্চল্য। রাজপথে, ক্যাম্পাসে, পার্কে, রেস্তরাঁয় প্রকাশ্যে ও গোপনে আজ মিলবে প্রেমিক যুগল। শহর ঘুরে বেড়াবে। আর যারা এখও একলাটি তাদের মনের কথা তুলে ধরে কবিগুরু লিখেছেন, ‘হাজার লোকের মাঝে রয়েছি একেলা যে-/এসো আমার হঠাৎ-আলো, পরাণ চমকি তোলো।’ কারও কারও ভেতরে ভালবাসার সকল অনুভূতি তৈরি হয়ে থাকে। কিন্তু কার জন্য ব্যাকুল মন সেটি আর বোঝা হয় না। কবিগুরুকে তাদের তরজমা করেছেন। লিখেছেন, ‘যদি জানতেন আমার কিসের ব্যথা তোমায় জানাতাম।/কে যে আমায় কাঁদায় আমি কী জানি তার নাম।’ এবং যারা নামটি জানেন কিন্তু তাকে বলতে পারেন না ‘ভালবাসি’ সেই তাদের ব্যথা তুলে ধরে তিনি বলছেন- ‘আমি যে আর সইতে পারি নে।/ সুরে বাজে মনের মাঝে গো, কথা দিয়ে কইতে পারি নে।’ অন্যভাবে বললে, লাগে বুকে সুখে দুখে কত যে ব্যথা,/কেমনে বুঝায়ে কব না জানি কথা…। ভ্যালেনটাইন ডে তে ‘হারানো হিয়ার নিকুঞ্জপথে’ ‘ঝরা ফুল’ও কুড়ান কোন কোন প্রেমিক প্রেমিকা।

অবশ্য এখন স্থূল প্রেমও কম দেখা যায় না। তরুণ-তরুণীরা যখন তখন প্রেমে পড়ে যাচ্ছেন। এবং বিনা কারণে কিংবা সামান্য কারণে বলে দিচ্ছেন- ‘ব্রেকআপ!’ নতুন প্রেমিক কিংবা প্রেমিকাও জুটে যাচ্ছে তৎক্ষণাৎ। শুরু হয়ে যাচ্ছে নকল ভালবাসাবাসি! আবার মন প্রাণ দিয়ে ভালবেসেও অনেকে ব্যর্থ হচ্ছেন। প্রতারিত হচ্ছেন। এ অবস্থায় কী করণীয়? লোক কাহিনী নির্ভর সিনেমা রূপবানের অত্যন্ত জনপ্রিয় গান মন দিয়ে শোনা যেতে পারে, যেখানে তাজেলকে উদ্দেশ করে বলা হচ্ছে: শুনো তাজেল গো, মন না জেনে প্রেমে মইজো না…। হ্যাঁ, মন জানা চাই। ভালবাসার আগে যাকে ভালবাসছেন তার মনটি জানতে হবে। তবেই স্বর্গ সুখের হবে প্রেম। এমন প্রেম করেই তো ইতিহাস গড়েছেন লাইলী-মজনু। শিরি-ফরহাদ। ইউসুফ-জুলেখা। রুমিও-জুলিয়েট।

শুরুর কথা ॥ আজ যে ভালবাসা দিবসের কথা বলা হচ্ছে সে দিবসের সঙ্গেও মিশে আছে অমর প্রেম কাহিনী। যতদূর তথ্য, এই ভ্যালেন্টাইন ডে উদ্যাপনের শুরুটা প্রাচীন রোমে। তখন ১৪ ফেব্রুয়ারি ছিল বিয়ের দেবী জুনোকে সম্মান জানানোর পবিত্র দিন। দিবসটি অনুসরণ করে পরের দিন ১৫ ফেব্রুয়ারি উদ্যাপন করা হতো লুপারকেলিয়া উৎসব। সে সময় তরুণ-তরুণীদের খোলামেলা দেখাসাক্ষাতের তেমন সুযোগ ছিল না। জীবনসঙ্গী নির্বাচনে তাদের জন্য ছিল লটারির মতো একটি আয়োজন। উৎসবের সন্ধ্যায় বেশ কিছু কাগজের টুকরোয় তরুণীদের নাম লিখে একটি পাত্রে রাখা হতো। একটি করে কাগজের টুকরো তুলত তরুণরা। কাগজের গায়ে যার নাম লেখা থাকত তাকে সঙ্গী হিসেবে পেত তরুণটি। কখনও কখনও ওই দু’জনের মিলনের ক্ষণ এক বছর স্থায়ী হতো। কখনও কখনও তা গড়াত বিয়েতে। অপর গল্পটি এরকমÑ সম্রাট ক্লদিয়াসের শাসনামলে রোম কয়েকটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লিপ্ত হয়। কিন্তু তার সেনাবাহিনীতে সৈন্য সংখ্যা কম ভর্তি হওয়ায় ক্লদিয়াস উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন। তিনি ধারণা করতেন, পরিবার ও ভালবাসার বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার কারণেই যুদ্ধে যেতে রাজি হতো না পুরুষরা। ফলে ক্লদিয়াস সমগ্র রোমে সব ধরনের বিয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। সে সময় রোমে ধর্মযাজকের দায়িত্ব পালন করছিলেন সেন্ট ভ্যালেন্টাইন। তিনি এবং সেন্ট ম্যারিয়াস খ্রীস্টান ধর্মাবলম্বী তরুণ-তরুণীদের গোপনে বিয়ের ব্যবস্থা করে দিতেন। বিবাহিত যুগলদের সহযোগিতা করতেন। এ অপরাধে রোমের ম্যাজিস্ট্রেট তাকে গ্রেফতার করে করাগারে নিক্ষেপ করেন। বন্দী থাকা অবস্থায় অনেক তরুণ তাকে দেখতে যেত। জানালা দিয়ে তার উদ্দেশে চিরকুট ও ফুল ছুড়ে দিত। হাত নেড়ে জানান দিত, তারা যুদ্ধ নয়, ভালবাসায় বিশ্বাস রাখে। এদের মধ্যে একজন আবার ছিল কারারক্ষীর মেয়ে। তার বাবা তাকে ভ্যালেন্টাইনের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ করে দিতেন। এক পর্যায়ে তারা একে অপরের বন্ধু হয়ে যান। ভ্যালেন্টাইন মেয়েটির উদ্দেশে একটি চিরকুট লিখে রেখে যান। এতে লেখা ছিল ‘লাভ ফ্রম ইয়োর ভ্যালেন্টাইন’। বিচারকের নির্দেশ অনুসারে সে দিনই ভ্যালেনটাইনকে হত্যা করা হয়। সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের এই আত্মত্যাগের দিনটি ছিল ২৬৯ খ্রীস্টাব্দের ১৪ ফেব্রুয়ারি। কালের ধারাবাহিকতায় আজ ১৪ ফেব্রুয়ারি ভ্যালেন্টাইন ডে হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। এর কেন্দ্রীয় চরিত্রটি হয়ে ওঠেন সেন্ট ভ্যালেন্টাইন।

image_print